যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি নির্দিষ্ট লাইসেন্সপ্রাপ্ত ওষুধ ও কাঁচামালের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। কোন কোন পণ্য এর আওতায় পড়বে তার তালিকাও প্রকাশ করেছে।
নতুন এই শুল্ক হলো পণ্যের মূল্যের নির্দিষ্ট শতাংশ হিসেবে ধার্য করা আমদানি শুল্ক।
ঘোষণায় বলা হয়, যেসব কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রে এসব নির্দিষ্ট ওষুধ ও কাঁচামাল উৎপাদনের পরিকল্পনা করবে তাদের ক্ষেত্রে এই শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ ধার্য করা হবে।
আর যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়ন নিয়ে চুক্তি বা আলোচনায় থাকলে ওইসব দেশের বা কোম্পানির পেটেন্ট করা ওষুধে শুল্ক বসাবে না ট্রাম্প প্রশাসন।
একইসঙ্গে জেনেরিক ওষুধ ও সংশ্লিষ্ট কাঁচামালসহ সুনির্দিষ্ট কিছু ওষুধেও শূন্য শুল্ক বহাল রেখেছে দেশটি।
যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশ, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, গুয়াতেমালা, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, জর্ডান, মালয়েশিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইজারল্যান্ড ও লিশটেনস্টাইন, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও ভিয়েতনাম এই শুল্ক ছাড়ের সুবিধা পাওয়ার তালিকায় রয়েছে।
শুল্ক সমন্বয়ের আওতায় এসব দেশ থেকে আমদানি করা নির্দিষ্ট ওষুধ ও সংশ্লিষ্ট কাঁচামালের ওপর শুল্ক প্রযোজ্য হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণায় বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে কিছু নতুন সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা দেখা দিলেও তাৎক্ষণিকভাবে এর সুফল সীমিত বলে মনে করছেন এ খাতের শীর্ষ ব্যবসায়িক নেতারা।
কারণ, শুল্ক ছাড়ের আওতায় থাকা বিশেষায়িত ওষুধের অনেকগুলোই বাংলাদেশে বর্তমানে তৈরি হয় না বলে জানান তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ছাড়ের আওতায় থাকা পণ্যের মধ্যে রয়েছে ‘অরফান’ ড্রাগ। যা মূলত বিরল রোগের চিকিৎসা, প্রতিরোধ বা রোগ নির্ণয়ের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ওষুধ। এছাড়া নিউক্লিয়ার মেডিসিন, বন্ধ্যত্বের চিকিৎসার ওষুধ, সেল থেরাপি, জিন থেরাপি এবং অ্যান্টিবডি-ড্রাগ কনজুগেট।
এছাড়া রাসায়নিক, জৈবিক, তেজস্ক্রিয় ও পারমাণবিক হুমকি মোকাবিলায় ব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ এবং নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে প্রাণী চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধও এই ছাড়ের তালিকায় রয়েছে।
তবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই শুল্ক ছাড়ের অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ রপ্তানি বাড়াতে পারবে। কারণ, স্থানীয় কোম্পানিগুলোর এসব বিশেষায়িত ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা সীমিত।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক শওকত হায়দার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বাংলাদেশ এই শুল্ক সমন্বয় থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো সুবিধা পাবে না, কারণ এ ধরনের বিশেষায়িত ওষুধ আমরা তৈরি করি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘জটিল এসব ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা এখনো বাংলাদেশের নেই। এই সক্ষমতা তৈরি করতে প্রযুক্তি, গবেষণা ও উন্নয়ন, উৎপাদন অবকাঠামো এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পূরণে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন।’
তবে প্রাণী চিকিৎসার জন্য ওষুধ উৎপাদনকারী কিছু প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের রয়েছে উল্লেখ করে শওকত হায়দার বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মতো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত বাজারে প্রয়োজনীয় মান পূরণের মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা এখনো এসব প্রতিষ্ঠানের তৈরি হয়নি।’
শওকত হায়দারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধের বাজারে প্রবেশ করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন। কারণ ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশের প্রতিষ্ঠিত ওষুধ প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোকে।
অন্যদিকে ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) সভাপতি আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন এ ধরনের ওষুধ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে না। তবে শুল্ক সমন্বয় ভবিষ্যতে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে এই শুল্ক সমন্বয় বাংলাদেশের জন্য কিছু সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে কোন পণ্যে কী ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে, তা চিহ্নিত করে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।’
তার মতে, বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের মান এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করবে আগামীতে সুফল কেমন হবে।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোন কোন পণ্য রপ্তানি করতে পারবে বা সুযোগ রয়েছে তা চিহ্নিত করতে পণ্যভিত্তিক মূল্যায়নের ওপর জোর দেন ইনসেপটার চেয়ারম্যান আবদুল মুক্তাদির।

