দুই বছরের অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে বাড়ির কাছের কলিমহর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে এসেছিলেন তাছলিমা আক্তার। কিন্তু সেখানে চিকিৎসক না থাকায় তাকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হচ্ছে।
তাছলিমা আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাড়ির পাশের এই হাসপাতালে যদি চিকিৎসাসেবা পেতাম, তাহলে আমাদের দূরে যেতে হতো না। এখন অসুস্থ বাচ্চাকে নিয়ে দূরে উপজেলা সদরে যেতে হবে।’
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার কলিমহর ইউনিয়নের কলিমহর গ্রামে প্রায় নয় বছর আগে উদ্বোধন করা হয় ১০ শয্যার এই মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। তিনতলা ভবন, অপারেশন থিয়েটার, আলট্রাসনোগ্রাম কক্ষ, প্রসব কক্ষ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক কোয়ার্টারসহ প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামোই এখানে আছে। তবে নেই প্রয়োজনীয় জনবল, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম। ফলে কেন্দ্রটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি।
২৪ ঘণ্টা মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে সপ্তাহে মাত্র দুদিন একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার সেখানে রোগী দেখেন। ফলে সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনাটি পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে পাংশা ও পাশের কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষও কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ভবন আছে, নেই চিকিৎসা সরঞ্জাম
রাজবাড়ী স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ৫০ শতক জমির ওপর ৩ কোটি ৭৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। ২০১৭ সালের ২০ নভেম্বর তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. জিল্লুল হাকিম কেন্দ্রটির উদ্বোধন করেন।
তিনতলা ভবনে ১০ শয্যার হাসপাতাল, চিকিৎসকদের কক্ষ, আলট্রাসনোগ্রাম কক্ষ ও অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জন্য ছয়টি পরিবারের আবাসিক কোয়ার্টারও নির্মাণ করা হয়েছে।
কেন্দ্রটিতে গর্ভবতী মায়েদের সেবা, স্বাভাবিক ও জটিল প্রসব, সিজারিয়ান অপারেশন, প্রসব-পরবর্তী সেবা, এমআর সেবা, গর্ভপাতজনিত চিকিৎসা, নবজাতকের সেবা এবং জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক শনাক্তকরণসহ পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন সেবা দেওয়ার কথা।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রটির প্রধান ফটক বন্ধ। পরে নিরাপত্তা প্রহরী সানোয়ার হোসেনের সঙ্গে হাসপাতাল ভবনে ঢুকে দেখা যায়, নিচতলায় ফার্মেসি থাকলেও সেখানে কোনো ওষুধ নেই।
আলট্রাসনোগ্রাম কক্ষেও কোনো যন্ত্র নেই। চিকিৎসকের কক্ষ থাকলেও নিয়মিত কোনো চিকিৎসক সেখানে দায়িত্ব পালন করেন না। অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মো. আবুজার সপ্তাহে শনিবার ও মঙ্গলবার রোগী দেখেন।
দ্বিতীয় তলায় আছে প্রসব কক্ষ ও রোগীদের থাকার কক্ষ। প্রসব কক্ষে প্রয়োজনীয় কোনো যন্ত্রপাতি নেই। সেখানে দুটো টেবিল ও কয়েকটা কাঁচি পড়ে থাকতে দেখা যায়। তৃতীয় তলার রোগীদের থাকার কক্ষে রয়েছে মাত্র চারটি বেড।
প্রয়োজনের তুলনায় জনবলও নেই
পাংশা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিস সূত্রে জানা যায়, কেন্দ্রটিতে দুজন মেডিকেল অফিসার, চারজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, একজন ফার্মাসিস্ট, একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, একজন অফিস সহকারী, একজন নিরাপত্তা প্রহরী, একজন ওয়ার্ডবয়, একজন আয়া ও একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ছয়জন। তাদের বেশির ভাগই অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন।
নিরাপত্তা প্রহরী সানোয়ার হোসেন জানান, তিনি ও ওয়ার্ডবয় মাহফুজুর রহমান হাসপাতালের কোয়ার্টারে থাকেন। মাছপাড়া ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে কর্মরত উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মো. আবুজার সপ্তাহে দুদিন এখানে আসেন।
পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে আছেন জাকিয়া সুলতানা। এছাড়া পরিচ্ছন্নতাকর্মী শহিদুল ইসলাম ও আয়া লতা রাণী রয়েছেন।
হাজিরা খাতায়ও অনুপস্থিতি
কেন্দ্রটির হাজিরা খাতা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে জাকিয়া সুলতানা ও লতা রাণীর নামের ঘরে কোনো দিনের উপস্থিতির স্বাক্ষর নেই। পরিচ্ছন্নতাকর্মী শহিদুল ইসলামের স্বাক্ষর রয়েছে মাত্র তিন দিনের।
পাংশা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সানোয়ার হোসেন বলেন, জাকিয়া সুলতানা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন এবং চলতি মাসে কয়েক দিন প্রশিক্ষণে ছিলেন। অন্য দিনগুলোতে উপজেলা কার্যালয়ের মিটিংয়ে থাকায় তিনি স্বাক্ষর করেননি।
উপজেলা কার্যালয়ে জনবল সংকট থাকায় লতা রাণীকে সেখানে রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে শহিদুল ইসলাম নিয়মিত কাজে আসেন না। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানান, শহিদুল ইসলাম ২৭ মাস ধরে বেতন পাননি।
সানোয়ার হোসেন বলেন, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কেন্দ্রটিতে একজন নিরাপত্তা প্রহরী, একজন ওয়ার্ডবয়, একজন আয়া ও একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে নিরাপত্তা প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বেতন বন্ধ রয়েছে।
সপ্তাহে দুদিন সেবা
বর্তমানে সপ্তাহে মাত্র দুদিন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মো. আবুজার ও একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা সেখানে দায়িত্ব পালন করেন।
মো. আবুজার বলেন, আমার মূল পোস্টিং মাছপাড়া ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে। সেখান থেকে সপ্তাহে দুদিন এখানে সেবা দিতে আসি। তবে এই কেন্দ্রে দুই বছরের বেশি সময় ধরে কোনো ওষুধ নেই। তাই মানুষও তেমন সেবা নিতে আসে না।
স্থানীয় বাসিন্দা অনিক মল্লিক বলেন, রাতে কোনো মায়ের প্রসবব্যথা উঠলে তাকে ২০ কিলোমিটার দূরে নিয়ে যেতে হবে। এজন্যই এই হাসপাতালটি করা হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতাল আছে ঠিকই, নেই চিকিৎসক, নেই ওষুধ। ফলে হাসপাতালের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এলাকাবাসী। দ্রুত চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের দাবি জানান অনিক।
কলিমহর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিলকিস মোছা. বিলকিস বানু বলেন, গর্ভবতী মায়েদের সেবা, স্বাভাবিক ও জটিল প্রসব, সিজারিয়ান অপারেশন, প্রসব-পরবর্তী সেবা, নবজাতকের সেবা ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে এসব সেবার কোনোটিই পাওয়া যাচ্ছে না।
পাংশা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সানোয়ার হোসেন বলেন, নির্মাণের পর থেকেই বিভিন্ন সমস্যার কারণে কেন্দ্রটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, প্রত্যন্ত এলাকায় হওয়ায় এখানে চিকিৎসক থাকতে চান না। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও ওষুধও সরবরাহ করা হয়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, সমস্যাগুলোর সমাধান করে কেন্দ্রটি আবার পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা যাবে।
রাজবাড়ী জেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক খোন্দকার সফিকুল ইসলাম বলেন, কেন্দ্রটির আওতাধীন এলাকায় রোগীর সংখ্যা ভালো। জনবল না থাকায় দিন দিন কেন্দ্রটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। এটি শুধু আমাদের এখানকার সমস্যা নয়, সারা দেশে এ ধরনের কেন্দ্রগুলোর একই অবস্থা।

