ক্যারিয়ারের প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেছে। ৩৬ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে বিরাট কোহলির ঝুলিতে এমন সব অর্জন, যার অনেকটাই হয়তো একজন ব্যাটারের স্বপ্ন। কিন্তু এত কিছুর পরও থেমে যেতে চান না ভারতের তারকা ব্যাটার। বরং ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে নিজেকেই দিয়েছেন নতুন চ্যালেঞ্জ, খেলাটাকে আরও উঁচু গিয়ারে নিয়ে যাওয়া। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিরুবনন্তপুরমে তার ১৩৯ রানের অপরাজিত ইনিংস যেন সেই চ্যালেঞ্জেরই উত্তর।
‘ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে নিজেকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলাম, খেলাটাকে আরও উঁচু গিয়ারে নিয়ে যাব। এটা নিয়ে কাজ করাটা আমার কাছে রোমাঞ্চকর ছিল,’ ম্যাচ শেষে বলেছেন কোহলি। তার কাছে এখন লক্ষ্য শুধু রান বা মাইলফলক নয়, বরং নিজের ব্যাটিংয়ের আরেকটি নতুন সংস্করণ খুঁজে বের করা।
সেই পরিবর্তনের ফলও দেখা যাচ্ছে মাঠে। রোববার ওয়েস্ট ইন্ডিজের ২৯৬ রান ৫০ বল হাতে রেখেই ৮ উইকেটে পেরিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ভারত। ৮৮ বলে অপরাজিত ১৩৯ রানের ইনিংসে কোহলি মেরেছেন ১০টি চার ও ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ৯টি ছক্কা। ওয়ানডেতে এটি তার ৫৫তম শতক এবং ফরম্যাটটিতে তৃতীয় দ্রুততম শতক।
একই ইনিংসে শচীন টেন্ডুলকারের পর মাত্র দ্বিতীয় ব্যাটার হিসেবে ওয়ানডেতে ১৫ হাজার রানও পূর্ণ করেন কোহলি। ২৯তম ওভারে টানা তিনটি বাউন্ডারি মেরে মাইলফলকে পৌঁছান তিনি। তবে ম্যাচের পরও সংখ্যাগুলোকে নিজের মূল প্রেরণা হিসেবে মানতে চাননি ভারতের তারকা।
‘আমার মনোযোগ কখনোই এসব মাইলফলকের দিকে ছিল না। ম্যাচের পরিস্থিতি বোঝা এবং দলের জন্য নিজের কাজটা করে যাওয়াই আমার লক্ষ্য। অর্জন তো আসবেই। এত দিন খেলতে পেরে এবং এই জায়গায় থাকতে পেরে আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ ও নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি,’ বলেছেন তিনি।
কোহলির নতুন চ্যালেঞ্জের সবচেয়ে বড় প্রকাশ তার ব্যাটিংয়ের ধরনে। ক্যারিয়ারের বড় একটা সময় তিনি ঝুঁকি সামলে ইনিংস গড়েছেন, ক্রিজে থিতু হওয়ার পর গতি বাড়িয়েছেন। এখন সেট হওয়ার পর থেকেই রান তোলার সুযোগ আরও বেশি কাজে লাগাতে চাইছেন। চলতি বছর ওয়ানডেতে ৫২৩ রান করে এই ফরম্যাটে সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহকদের তালিকায় তৃতীয় তিনি। তার স্ট্রাইক রেট ১১৬.৭৪, শীর্ষ ৫০ রানসংগ্রাহকের মধ্যে মাত্র তিনজনের এই হার বা এর চেয়ে বেশি।
তবে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেললেও সীমাটা অতিক্রম করতে চান না কোহলি, ‘আমি নিজেকে কথা দিয়েছি, যেহেতু পারি, তাই ইতিবাচক ক্রিকেট খেলব। সেটাই করে যেতে চাই। তবে বেপরোয়া হতে চাই না। একজন পেশাদার ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড় হিসেবে আমার এমনভাবে খেলতে পারার সক্ষমতা থাকা উচিত, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ শট না খেলে দলকে ম্যাচে পার করে দিতে পারি।’
এই নতুন ধরনে খেলার স্বাধীনতার পেছনে নিজের ফিটনেসকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন কোহলি, ‘মুক্ত মনে খেলতে হলে শরীরকে ফিট রাখতে হয়। আমি শারীরিকভাবে ফিট থাকি, আর তখনই যেভাবে খেলতে চাই, সেভাবে ম্যাচটাকে কল্পনা করতে পারি।’
মানসিক সতেজতাকেও একইভাবে গুরুত্ব দেন এই ব্যাটার, ‘খেলাটা কমবেশি মনের মধ্যেই। আমি কখনো খুব বেশি অনুশীলন করার মানুষ ছিলাম না। আমার জন্য তাই মানসিকভাবে সতেজ থাকা, বর্তমান মুহূর্তে থাকা এবং নিজেকে প্রকাশ করাই গুরুত্বপূর্ণ।’
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে কোহলির এই ইনিংসের মঞ্চ অবশ্য তৈরি করে দিয়েছিলেন শুভমান গিল। রোহিত শর্মার সঙ্গে প্রথম উইকেটে ৭৪ রান যোগ করার পর রোহিত ফিরলে গিল একাই আক্রমণ চালিয়ে যান। ১০৮ বলে ১১০ রান করে ওয়ানডেতে নিজের দশম শতক তুলে নেন তিনি। পরে গিলের সঙ্গে ১৩২ বলে ১৫১ রানের জুটি গড়ে ভারতের জয় সহজ করে দেন কোহলি।
এর আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসে জাস্টিন গ্রিভস ও জন ক্যাম্পবেল ১৩৫ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়েছিলেন। গ্রিভস পেয়েছিলেন ওয়ানডেতে নিজের প্রথম শতক। তবে কুলদীপ যাদবের ৪০ রানে ৪ উইকেট এবং প্রসিদ্ধ কৃষ্ণের চাপে ১৭৬ রানে ১ উইকেট থেকে ১৯৮ রানে ৫ উইকেটে নেমে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শেষ দিকে আমির জাঙ্গুর ৪৩ বলে ৫৮ রানের ইনিংসে ২৯৫ রান পর্যন্ত যেতে পারে তারা।
তবে সব হিসাব-নিকাশের পরও কোহলির কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় নিজের দীর্ঘ যাত্রা। ছোটবেলার ক্রিকেটার থেকে ১৫ হাজার ওয়ানডে রানের মালিক, এই পথটাকে ফিরে দেখলে তার মনে আসে কৃতজ্ঞতাই।
‘ছোটবেলায় যেদিন শুরু করেছিলেন, সেখান থেকে আজকের এই জায়গায় এসে দাঁড়ানোর পুরো যাত্রার দিকে তাকালে শুধু কৃতজ্ঞতাই অনুভব হয়। ভারতের হয়ে যখনই মাঠে থাকি, প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করি। কারণ আমি জানি, এমনও হতে পারত যে আজ আমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকতাম না,’ বলেন কোহলি।

