ফোনে অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করার ৬ সহজ উপায়

রাত একটা। মাত্র চোখ দুটো বন্ধ করেছেন তানভীর (ছদ্মনাম)। ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠল—‘টুং!’ ‘জরুরি কোনো ইমেইল এল বুঝি?’—ভেবে লাফিয়ে উঠে ফোন হাতে নিলেন তিনি।

স্ক্রিন আলো করে ভেসে উঠল নোটিফিকেশন—’…বিরিয়ানিতে ২০% ছাড়!’ তারপরই আরও কয়েকটি—ফেসবুকে বন্ধুর ছবি আপলোড, শপিং অ্যাপের ছাড় আর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের একশ মেসেজ।

সারাদিন খবরের পেছনে দৌড়ে রাতে একটু শান্তিতে ঘুমানোর উপায় নেই। তানভীর মনে মনে বললেন—কাজের কাজের কিছু নয়, অনর্থক এই নোটিফিকেশনের ডিজিটাল মশাগুলো যেন সারাক্ষণ কানের কাছে ভনভন করছে।

খুব বিরক্ত হলেন তানভীর। সরাসরি ফোনের সেটিংসে গিয়ে জরুরি দু-একটা কাজের অ্যাপ ছাড়া ফেসবুক, ফুড ডেলিভারি, শপিং অ্যাপ—সবগুলোর নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিলেন। মনটা এক নিমেষে হালকা হয়ে গেল তানভীরের।

২০২৬ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ১৫ কোটি ৯১ লাখের বেশি মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে।

অধিকাংশ মানুষই জীবনের প্রায় সব ধরনের হিসাব-নিকাশ বা নজরদারির জন্য ফোনের ওপর নির্ভর করেন। আর তার জন্য দিনভর অসংখ্য অ্যালার্ট ও এসএমএস সামলাতে হয় তাকে।

তবে প্রশ্ন হলো, এসব নোটিফিকেশন ও এসএমএসের মধ্যে আসলে কতগুলো প্রয়োজনীয়?

সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, কাজের ইমেইল বা বন্ধুদের টেক্সটের মতো দরকারি নোটিফিকেশনের পাশাপাশি আমরা প্রচুর অহেতুক আপডেটও পেতে থাকি—যেমন নতুন ভিডিও, খাবারের ডিসকাউন্ট কোড কিংবা ইনস্টাগ্রাম লাইকের নোটিফিকেশন।

ফোনে ঘনঘন এসব ভাইব্রেশন একদিকে যেমন মনোযোগ নষ্ট করে, অন্যদিকে বিরক্তিকর ‘অ্যালার্ট ক্লান্তি’ তৈরি করে। এ অবস্থায় ফোন একদম ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ মোডে দিয়ে সব নোটিফিকেশন বন্ধ করে দেওয়াটাই প্রথম উপায় মনে হতে পারে, তবে কিছু সেটিংস পরিবর্তনের মাধ্যমে আরও সচেতনভাবে দিনটিকে শান্তিময় করে তোলা সম্ভব।

আইফোন বা অ্যান্ড্রয়েড—যেটাই ব্যবহার করুন না কেন, এই ৬টি টিপস আপনাকে নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং কেবল প্রয়োজনীয় অ্যালার্টগুলো দেখতে সাহায্য করবে।

নোটিফিকেশন সেটিংস পরিবর্তন করার আগে ফোনের অ্যাপগুলোর দিকে নজর দিন এবং যেসব অ্যাপ আর ব্যবহার করা হয় না সেগুলো আনইনস্টল করে দিন। এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নোটিফিকেশনের সংখ্যা কমে যাবে এবং পরবর্তীতে সেটিংস কাস্টমাইজ করা সহজ হবে।

সাধারণত অ্যাপ আইকনের ওপর চেপে ধরে রেখে (লং প্রেস) তা রিমুভ বা আনইনস্টল করা হয়।

ফোনটি যদি উপুড় করে রাখা না থাকে বা হাতের নাগালের বাইরে না থাকে, তবে স্ক্রিনের আলো জ্বলে উঠলেই চোখ সেদিকে যাবেই। তবে নোটিফিকেশন দেখানোর ধরণ বদলে দিয়ে আপনি এই মনোযোগ ভঙ্গের হার কমাতে পারেন।

আইফোনে নোটিফিকেশন দেখানোর পদ্ধতি কাস্টমাইজ করার একাধিক উপায় রয়েছে। যেমন, কোন অ্যাপের নোটিফিকেশন চান, লক স্ক্রিন বা হোম স্ক্রিনে সেগুলো কীভাবে দেখাবে, প্রিভিউ দেখাবে কি না ইত্যাদি।

সবচেয়ে সাধারণ ও সহজ উপায়ের জন্য—সেটিংস > নোটিফিকেশন > ডিসপ্লে অ্যাজ (এস) এরপর ‘কাউন্ট’ অপশনটি নির্বাচন করুন।

এতে সব নোটিফিকেশনের লম্বা তালিকার বদলে স্ক্রিনের নিচে কেবল মোট নোটিফিকেশনের সংখ্যাটি দেখাবে। আলাদাভাবে কোনো নোটিফিকেশন দেখতে চাইলে লক স্ক্রিন থেকে সোয়াইপ আপ করে নেওয়া যাবে।

অ্যান্ড্রয়েডের ক্ষেত্রে ফোনভেদে ধাপগুলো কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।

সেটিংস অ্যাপে গিয়ে ‘লক স্ক্রিন’ লিখে সার্চ করুন।

পিক্সেল ফোনে এটি ‘ডিসপ্লে এন্ড টাচ’ এর অধীনে থাকে। আর স্যামসাং ফোনে পাবেন সেটিং > নোটিফিকেশন।

সেখানে লক স্ক্রিনে নোটিফিকেশন কীভাবে দেখাবে বা একেবারেই দেখাবে কি না তা নির্ধারণ করে দিতে পারবেন।

কাজের ব্যাঘাত ঘটানো বন্ধ করার আরেকটি উপায় হলো নোটিফিকেশনগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে সারসংক্ষেপ হিসেবে পাওয়ার ব্যবস্থা করা। এর মাধ্যমে সারাদিন ধরে একটি একটি করে নোটিফিকেশন এসে বিরক্ত করার বদলে নির্দিষ্ট সময়ে সব নোটিফিকেশন একসঙ্গে পাওয়া যায়।

আইফোনে সেটিংস > নোটিফিকেশন > সিডিউলড সামারিতে গিয়ে সিডিউলড সামারি অপশনটি চালু করুন।

তারপর কোন কোন অ্যাপের নোটিফিকেশন ওই সারসংক্ষেপে যুক্ত করবেন এবং কখন তা চান, তা নির্বাচন করুন।

তালিকায় পছন্দের অ্যাপ না থাকলে সেটিংস > অ্যাপসে গিয়ে নির্দিষ্ট অ্যাপটি নির্বাচন করে অ্যালাউ নোটিফিকেশন চালু করে দিন। এই নোটিফিকেশনগুলো আপনার ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী সাজানো থাকবে।

গুগল পিক্সেল ফোনে নোটিফিকেশন অরগানাইজার ফিচারটি চালু করা যায়, যা এআই ব্যবহার করে কম গুরুত্বপূর্ণ অ্যালার্টগুলোকে একসঙ্গে করে সাইলেন্ট করে দেয়।

আর স্যামসাং গ্যালাক্সি ফোনে সেটিংস > নোটিফিকেশন > সর্ট এন্ড ফিল্টার > সর্ট নোটিফিকেশন এ গিয়ে ‘বাই পায়োরিটি’ নির্বাচন করুন।

আপনি যদি আইফোন ব্যবহারকারী হন এবং এক ক্লিকেই সব নোটিফিকেশন ও অ্যালার্ট বন্ধ করে রাখতে চান, তবে ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ ফিচারটি চালু করুন।

তবে এর পাশাপাশি কাজ, ঘুম এবং গাড়ি চালানোর সময় প্রিসেটগুলো ব্যবহার করতে পারেন, যাতে ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ মোড চালু থাকা সত্ত্বেও কেবল নির্দিষ্ট কিছু নোটিফিকেশন আসবে।

সাধারণত প্রতিটি অপশনে নোটিফিকেশন শূন্য করা থাকে, তবে আপনি চাইলে নির্দিষ্ট কিছু অ্যাপ বা কন্টাক্টকে ছাড়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন। যেমন, ‘স্লিপ মোডে’ জরুরি প্রয়োজনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু মানুষের কল আসার অনুমতি দিয়ে রাখা যায়। আবার ‘ওয়ার্ক মোডে’ শুধু জিমেইলের মতো অ্যাপের নোটিফিকেশন চালু রেখে বাকি সব সাইলেন্ট রাখা সম্ভব।

এই প্রিসেটগুলোতে কাজ না হলে নিজের পছন্দ মতো ‘ফোকাস মোড’ তৈরি করে নিতে পারেন।

আইফোনের ডানপাশের ওপর থেকে নিচে সোয়াইপ করে ফোকাস মোডে ট্যাপ করুন এবং প্লাস (+) চিহ্নে চাপ দিন। সেখান থেকে আপনি নির্ধারণ করতে পারবেন কোন নোটিফিকেশন সাইলেন্ট থাকবে, কখন তা চালু হবে এবং অ্যাপ, ফোন কল বা মেসেজের ক্ষেত্রে নিয়মগুলো কী হবে।

অ্যান্ড্রয়েড ফোনেও এর নিজস্ব সংস্করণ রয়েছে।

গুগল পিক্সেল ফোনে সেটিংস > ডিজিটাল ওয়েলবিয়িংসে গিয়ে ফোকাস নির্বাচন করে সময় ও অ্যাপ নির্ধারণ করা যায়।

অন্যান্য অ্যান্ড্রয়েড ফোনে সেটিংসে ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ লিখে সার্চ দিলেই এই কাস্টমাইজেশন সুবিধা পাওয়া যাবে।

বিভিন্ন কোম্পানি প্রমোশনাল পুশ নোটিফিকেশন পাঠাতে ভালোবাসে, যার বেশিরভাগই অপ্রয়োজনীয় এবং কেবল অ্যাপে প্রবেশ করানোর উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। তবে আপনি চাইলে কোন অ্যাপ থেকে নোটিফিকেশন আসবে আর কোনটিতে বন্ধ থাকবে, তা নির্ধারণ করে দিতে পারেন।

আইফোনে সেটিংস > নোটিফিকেশনে গিয়ে নিচের দিকে নোটিফিকেশন স্টাইল অংশে ফোনে থাকা সব অ্যাপের তালিকা দেখতে পাবেন। 

 

যে অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ করতে চান সেটিতে ট্যাপ করে অ্যালাউ নোটিফিকেশন অপশনটি বন্ধ করে দিন।

অ্যান্ড্রয়েড ফোনে সেটিংস > নোটিফিকেশন > অ্যাপ নোটিফিকেশনে (পিক্সেল ফোনে অল অ্যাপস) গিয়ে যে কোনো অ্যাপের নোটিফিকেশন সুবিধামতো বন্ধ করে দিতে পারেন।

একবারে সব সেটিংস বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। যদি সিদ্ধান্ত নিতে কষ্ট হয় যে কোন অ্যাপগুলো দিয়ে শুরু করবেন, তবে ধীরে ধীরে শুরু করতে পারেন। কোনো নোটিফিকেশন আসার পর সরাসরি লক স্ক্রিন থেকেই এর সেটিংস ঠিক করা সম্ভব।

আইফোনে আসা নোটিফিকেশনের ওপর ডানদিকে সোয়াইপ করে অপশনে ট্যাপ করুন এবং ‘মিউট ফর ওয়ান আওয়ার’ অথবা ‘মিউট ফর টুডে’ বেছে নিন। এতে স্থায়ীভাবে বন্ধ না হয়ে সাময়িকভাবে সেটিংস পরিবর্তন হবে।

আর যদি পুরোপুরি বন্ধ করতে চান, তবে সেখান থেকেই ‘টার্ন অফ’ চাপুন।

গুগল পিক্সেল ফোনে ‘নোটিফিকেশন কুলডাউন’ নামে একটি ফিচার রয়েছে।

এটি যখন দেখে যে অল্প সময়ের মধ্যে অনেকগুলো নোটিফিকেশন আসছে, তখন এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নোটিফিকেশনের সাউন্ড কমিয়ে দেয় এবং অ্যালার্টগুলোকে মিনিমাইজ করে ফেলে।

আপনি চাইলে স্ক্রিনের ওপর থেকে নোটিফিকেশন মেনু নামিয়ে সেগুলো দেখে নিতে পারেন।

এটি চালু করতে সেটিংস > নোটিফিকেশনসে গিয়ে ‘জেনারেল’ ট্যাবের অধীনে থাকা ‘নোটিফিকেশন কুলডাউন’ অপশনটি অন করুন।

Related Articles

Latest Posts