জিদানের হাতে ফ্রান্সের নতুন যুগের শুরু

একসময় ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছেন, পরে রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে জিতেছেন ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব। এবার নিজের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত দায়িত্বে অভিষেক হতে যাচ্ছে জিনেদিন জিদানের। দিদিয়ের দেশমের ১৪ বছরের অধ্যায় শেষ হওয়ার পর শুক্রবার তুরস্কের বিপক্ষে নেশন্স লিগের ম্যাচ দিয়ে ফ্রান্সের কোচ হিসেবে নতুন যুগের সূচনা করবেন দেশটির কিংবদন্তি।

জাতীয় দলের কোচ হওয়ার অপেক্ষায় চার-পাঁচ বছর ধরে ছিলেন জিদান। অবশেষে গত জুলাইয়ে সেই দায়িত্ব পাওয়ার পর নিজের আবেগ লুকাননি ৫৪ বছর বয়সী এই ফরাসি। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এই দিনের জন্য চার-পাঁচ বছর অপেক্ষা করেছি। আমি আবেগে ভাসছি, সত্যিই রোমাঞ্চিত। আমি খুশি। এটা আমার জন্য বিশাল ব্যাপার।’

জিদান ফ্রান্সের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। মিশেল প্লাতিনির সঙ্গে একই কাতারে উচ্চারিত হয় তার নাম। ১৯৯৮ সালে নিজেদের মাটিতে ফ্রান্সের প্রথম বিশ্বকাপ জয় এবং ২০০০ সালের ইউরো শিরোপায় ছিল তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সেই বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক ছিলেন দিদিয়ের দেশম। তবে মাঠে ফ্রান্সের সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন জিদান, দুর্দান্ত বল নিয়ন্ত্রণ, সৃজনশীলতা এবং প্রয়োজনে কঠোর হয়ে ওঠার ক্ষমতায় যিনি ছিলেন অনন্য।

ফ্রান্সের জার্সিতে জিদানের শেষ ম্যাচটিও তাই ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। ২০ বছর আগে জার্মানির বার্লিনে বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে মার্কো মাতেরাজ্জিকে মাথা দিয়ে আঘাত করে লাল কার্ড দেখেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউটে ফ্রান্স হেরে যায়। সেটিই ছিল আলজেরীয় বংশোদ্ভূত মার্সেইয়ে জন্ম নেওয়া জিদানের জাতীয় দলের হয়ে ১০৮তম ও শেষ ম্যাচ।

এর আগেই ২৪ বছর বয়সে ফ্রান্স ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন জিদান। বোর্দো থেকে যোগ দিয়েছিলেন ইতালির জুভেন্টাসে। সেখানে পাঁচ বছর কাটানোর পর রিয়াল মাদ্রিদে খেলোয়াড় হিসেবে ক্যারিয়ারের সেরা সময় পার করেন। পরে স্প্যানিশ ক্লাবটির কোচও হন দুই দফায়। তার অধীনে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতে রিয়াল মাদ্রিদ।

২০২১ সালে রিয়ালে দ্বিতীয় মেয়াদের কোচের দায়িত্ব ছাড়ার পর থেকে আর কোনো ক্লাবের ডাগআউটে দেখা যায়নি জিদানকে। অপেক্ষায় ছিলেন ফ্রান্সের ডাকের। এবার সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে।

জিদানের নিয়োগের পর কিলিয়ান এমবাপে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘ঘরে স্বাগতম।’ এখন সেই এমবাপেই জিদানের ফ্রান্সের অধিনায়ক। শুক্রবার দল ঘোষণার সময় নতুন কোচের স্কোয়াডে ছিল বেশ কয়েকটি নতুন মুখ। দেশমের সময়ের তুলনায় আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলানোর ইঙ্গিতও দিয়েছেন জিদান।

‘আপনারা দেখতে পাবেন, আমি ফুটবলকে কীভাবে দেখি। ভালো ফুটবল খেলাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়। দলের মধ্যে সবসময় ভারসাম্য থাকবে। তবে আমি চাই আমরা খেলি। আর আমার মনে হয়, সেটা করার মতো দল আমাদের আছে,’ বলেছেন তিনি।

দেশমের সময়ে ফ্রান্স অনেক সময় ফলনির্ভর ও নিয়ন্ত্রিত ফুটবলের দিকে ঝুঁকেছে। তবু তার ১৪ বছরের মেয়াদে এসেছে ২০১৮ বিশ্বকাপের শিরোপা। উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত সর্বশেষ বিশ্বকাপেও ফ্রান্স সেমিফাইনাল পর্যন্ত গিয়েছিল। সেখানে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নেয় তারা। এমবাপে ১০ গোল করে আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন, মাইকেল ওলিসে ছিলেন দুর্দান্ত। গত বছরের ব্যালন ডি’অরজয়ী উসমান দেম্বেলেও মাঝেমধ্যে আলো ছড়িয়েছেন।

এই তিনজনই জিদানের প্রথম স্কোয়াডে আছেন। এমবাপেকে অধিনায়ক রাখার সিদ্ধান্তও নিশ্চিত করেছেন নতুন কোচ। তবে চোটের কারণে আর্সেনালের উইলিয়াম সালিবা ও রিয়াল মাদ্রিদের অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি দলে নেই। নতুন মুখ হিসেবে লিভারপুলের হয়ে মৌসুমের শুরুতে নজর কাড়া সেন্টারব্যাক জেরেমি জাকে, কোমোর মিডফিল্ডার লুকা দা কুনহা ও গত মৌসুমে লিগ ওয়ানে সর্বোচ্চ গোল করা রেনের স্ট্রাইকার এস্তেবান লেপলও সুযোগ পেয়েছেন।

জিদানের সহকারী হিসেবে থাকছেন রিয়ালে তাঁর সঙ্গে কাজ করা দাভিদ বেতোনি। গোলরক্ষক কোচের দায়িত্ব পেয়েছেন জিদানের বিশ্বকাপজয়ী সতীর্থ ফাবিয়েন বার্তেজ।

নতুন কোচের প্রথম বড় লক্ষ্য ২০২৮ সালের ইউরো, যা অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডে। এরপর ২০৩০ বিশ্বকাপ, যার আয়োজক মরক্কো, স্পেন ও পর্তুগাল।

তবে দায়িত্ব নেওয়ার পরই জিদানের সামনে বড় কোনো টুর্নামেন্টের চাপ নেই। শুরুটা হচ্ছে নেশন্স লিগ দিয়ে। প্রথম দুই ম্যাচেই তুরস্ক ও বেলজিয়ামের মাঠে খেলবে ফ্রান্স। এরপর ২ অক্টোবর ইতালির বিপক্ষে স্তাদ দ্য ফ্রঁসে ঘরের মাঠে প্রথম ম্যাচ খেলবেন জিদান।
 

Related Articles

Latest Posts