বাংলাদেশে সাইবার স্ক্যাম ঘিরে মানবপাচারের ঝুঁকি: ইউএনওডিসি

সাইবার স্ক্যাম কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ এখন দ্বিমুখী ঝুঁকির মুখে। একদিকে বাংলাদেশিদের পাচার করে বিদেশের স্ক্যাম সেন্টারে নিয়ে জোরপূর্বক প্রতারণামূলক কাজে বাধ্য করা হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরেও পরিচালিত হচ্ছে এসব স্ক্যাম সেন্টার। ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ, আর্থিক তদন্ত এবং আন্তঃদেশীয় সহযোগিতার ঘাটতি এই ঝুঁকি মোকাবিলাকে আরও কঠিন করে তুলছে।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) প্রকাশিত ‘ট্র্যাফিকড টু স্ক্যাম: সাউথ এশিয়ান রেসপন্সেস টু ট্র্যাফিকিং ইন পারসন্স ফর দ্য পারপাস অব ফোর্সড ক্রিমিনালিটি ইন স্ক্যাম অপারেশনস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার ঢাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইউএনওডিসির যৌথ আয়োজনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশের স্ক্যাম সেন্টারে লোক পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত বেশ কিছু সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক শনাক্ত করেছে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। একইসঙ্গে বাংলাদেশেও স্ক্যাম সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে। তবে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মানবপাচার কতটা জড়িত, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

এছাড়া, প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, প্রতারণা ও অর্থপাচারের সঙ্গে যুক্ত কিছু অনলাইন জুয়া পরিচালনাকারী চক্রও বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা করেছে।

সাধারণত ভুয়া অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এসব কাজের জনবল সংগ্রহ করা হয়। পরে তাদের আটকে রেখে অনলাইন প্রতারণা ও জালিয়াতির মতো কাজ করতে বাধ্য করা হয়।

প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশ ছাড়াও ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য এই প্রতিবেদনটি সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। সাইবার স্ক্যামের মতো অপরাধমূলক কাজে জোরপূর্বক বাধ্য করা ও মানবপাচার মোকাবিলায় জাতীয় নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও কার্যক্রমের অগ্রাধিকার আরও শক্তিশালী করতে এতে বাস্তবভিত্তিক সুপারিশ দেওয়া হয়েছে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশের স্ক্যাম আস্তানা থেকে দেশে ফিরে আসা বাংলাদেশিরা সম্ভাব্য মানবপাচারের শিকার কি না, তা নিয়মিতভাবে যাচাই করা হয় না। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয় রেফারেল মেকানিজম ও ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ নির্দেশিকা চালু করলেও সেগুলোর প্রয়োগ এখনো ধারাবাহিক নয়। ভুক্তভোগী শনাক্তকরণের সক্ষমতাও বিভিন্ন জায়গায় অসম এবং খুব অল্পসংখ্যক ঘটনাই সুরক্ষা সেবার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো হয়।

এতে আরও বলা হয়েছে, কয়েকটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ ও পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি থাকলেও মানবপাচার মোকাবিলায় বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণ করে না। কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা প্রক্রিয়া ধীর ও আমলাতান্ত্রিক বলে বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় অর্থ ও অন্যান্য সম্পদও পর্যাপ্ত নয়।

আর্থিক তদন্তের ক্ষেত্রেও দুর্বলতার কথা তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। অর্থপাচার এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংশ্লিষ্ট লেনদেন তদন্তে সীমিত সক্ষমতার কারণে স্ক্যাম কার্যক্রমের পেছনে থাকা প্রভাবশালী অপরাধী ও এসব কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত অর্থের পূর্ণ চিত্র বের করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত পাঁচটি দেশের মধ্যে শুধু বাংলাদেশের মানবপাচার আইনে ‘জোরপূর্বক অপরাধে বাধ্য করা’কে শোষণের একটি ধরন হিসেবে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল গৃহীত 
মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে প্রতারণার মতো অপরাধ সংঘটনে কাউকে বাধ্য করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশি ভুক্তভোগীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় দেশের বাইরেও আইন প্রয়োগের এখতিয়ারও রাখা হয়েছে।

প্রতিবেদনে ভুক্তভোগী ও অপরাধীর মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের জটিলতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। স্ক্যাম কার্যক্রমে কর্মরত ব্যক্তিরা প্রতারণা বা জোরপূর্বক পরিস্থিতির শিকার হয়ে অপরাধ করতে বাধ্য হয়ে থাকতে পারেন। তাই প্রত্যেক ব্যক্তির আলাদাভাবে যাচাই, যথাযথভাবে সংশ্লিষ্ট সেবা ও সুরক্ষা ব্যবস্থায় পাঠানো এবং মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের জোর করে করানো বেআইনি কর্মকাণ্ডের জন্য শাস্তি না দেওয়ার নীতি প্রয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ায় সাইবার স্ক্যাম কার্যক্রম ক্রমেই ছোট ও বিচ্ছিন্ন স্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। ভিলা, হোটেল, ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্ট ও বিভিন্ন অফিসও এসব কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে স্ক্যাম চক্র শনাক্তকরণ ও সেখানে থাকা সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের চিহ্নিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রতিবেদনের তথ্য ও সুপারিশগুলো জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন ইউএনওডিসির দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রতিনিধি ক্রিস্টিয়ান হোলগে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রেবেকা খান জাতীয় পর্যায়ে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন।

ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ এবং ডিজিটাল ও আর্থিক প্রমাণ সংগ্রহকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন বিশেষ রেসপন্স ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি রেজাউল করিম ও সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোশাররফ হোসেন। মানবাধিকারভিত্তিক ও ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেজনিয়াক।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনের মূল তথ্য ও সুপারিশ উপস্থাপন করেন ইউএনওডিসির উপ-প্রকল্প সমন্বয়কারী এবং আইন ও নীতিবিষয়ক কর্মকর্তা জি এ লি।

Related Articles

Latest Posts