এ বছর আউশের ভালো ফলন হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই স্বস্তিতে থাকার কথা কৃষকের। কিন্তু নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার উত্তরগ্রাম গ্রামের রাসেল হিসাব করছেন তার লোকসানের।
এ বছর প্রায় ১১ বিঘা জমিতে আউশ ধান চাষ করেছেন রাসেল। প্রতি বিঘায় তার খরচ হয়েছে ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় ফলন হয়েছে ১২ থেকে ১৬ মণ। (১ মণ = ৩৭ দশমিক ৩২ কেজি।)
বর্তমানে প্রতি মণ ধানের গড় বাজারদর ৭২৫ টাকা। সেই হিসাবে প্রতি বিঘায় তার আয় প্রায় ১১ হাজার টাকা।
রাসেল বলেন, ‘এই দামে ধান বিক্রি করলে প্রতি বিঘায় ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা লোকসান হবে।’
রাসেলের মতো সারা দেশের অনেক আউশ ধানচাষি ভালো ফলনের পরও লোকসানের মুখে পড়েছেন। এক বছর আগের তুলনায় এবার ধানের দাম প্রতি মণে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কমেছে। অথচ উৎপাদন খরচ বেড়েছে।
কৃষকরা বলছেন, কম দামে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে। সার, কীটনাশক ও সেচের জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে অনেকে ভেজা ধানও অর্ধেক দামে বিক্রি করছেন।
চালকল মালিকদের মতে, বাজারে চাহিদা কমার মূল কারণ হলো ধানের বড় মজুত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অতিরিক্ত চাল আমদানির পর এই মজুত তৈরি হয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর দেশে খাদ্যশস্যের মজুত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৪১ লাখ টনে। এক বছর আগে একই সময়ে মজুত ছিল ১৮ দশমিক ৬৭ লাখ টন।
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ১২ দশমিক ৬৮ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে।
নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে আউশ ধান প্রতি মণ ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ গত বছরের একই সময়ে দাম ছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা।
মহাদেবপুরের মৌসুমি ধান ব্যবসায়ী শামসুর রহমান বলেন, ‘গত বছর আউশ ধানের দাম ছিল প্রতি মণ ১ হাজার টাকা। পরে দাম বেড়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। আর এ বছর মাত্র ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা মণ দরে ধান কিনছি।’
কম দামের কারণ ব্যাখ্যা করে শামসুর বলেন, ‘বড় মিল মালিকেরা এখন ধান কিনছেন না। এ কারণেই দাম কমে যাচ্ছে।’
বগুড়ার শেরপুর উপজেলা থেকে মহাদেবপুরে আসা চালকল মালিক নুরুল ইসলাম জানান, তার গুদামেও এখনো বিপুল পরিমাণ ধান অবিক্রীত আছে।
তিনি আরও বলেন, ‘এ ছাড়া, পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় ধান শুকাতেও সমস্যা হচ্ছে।’
উৎপাদন খরচ বেশি ও বাজারদর কম, এই পরিস্থিতির কথা স্বীকার করে নওগাঁ জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সোহাগ সরকার বলেন, এ বছর আউশ ধানের উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি ২৬ থেকে ২৭ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। ফলে বর্তমান বাজারদরে কৃষক লোকসানের মুখে পড়ছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা উৎপাদন খরচের তথ্য সরকারকে জানাই এবং প্রতি সপ্তাহে বাজারদরের তথ্যও পাঠাই। সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া স্থানীয় বাজারে আমরা নিজেরা দাম নির্ধারণ করতে পারি না।’
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার কৃষক সুকান্ত পাল বলেন, ‘প্রতি মণ আউশ ধান উৎপাদন করতে অন্তত ১ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, অথচ ধান বিক্রি করতে হচ্ছে প্রতি মণ ৯৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা দরে।’
তিনি বলেন, বেশি দামে সার কেনা, অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সেচের বাড়তি খরচ তার মতো কৃষকের জন্য বড় সমস্যা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এ বছর আউশ চাষ করে কৃষক খুব বেশি লাভ করতে পারছেন না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে সারা দেশে আউশ চাষ হয়েছিল ১১ দশমিক ৫৯ লাখ হেক্টর জমিতে। ওই বছর ধান উৎপাদন হয়েছিল ৪৫ লাখ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আউশ চাষের জমির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৬১ লাখ হেক্টরে। ওই বছর উৎপাদন হয় ৪৩ দশমিক ৫ লাখ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আউশ চাষের জমির পরিমাণ আরও কমে ৯ লাখ ৫৯ হাজার হেক্টরে দাঁড়ায়। ওই বছর উৎপাদন হয় ৪১ দশমিক ৯১ লাখ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আউশ চাষের জমির পরিমাণ আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টরে। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪০ লাখ টন।
গত পাঁচ বছরে দেশে আউশ চাষের জমির পরিমাণ কমেছে ২ লাখ ১৪ হাজার হেক্টর। এর ফলে উৎপাদন কমেছে ৫ লাখ টন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে আউশের প্রধান জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রি ধান-৪৮, ব্রি ধান-৫৬, ব্রি ধান-৬৫ এবং বিনা ধান-১৯। এসব জাতের গড় ফলন প্রতি হেক্টরে ৩ দশমিক ১৫ টন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, সরকারের শস্য আমদানির ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরীণ ফসল উৎপাদনের সময় ও বাজারের সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতিবিদ আবদুল বায়েস বলেন, উৎপাদন খরচ বেশি, বাজারে চাহিদা সীমিত এবং ফলন কম হওয়ায় দেশে আউশ ধানের উৎপাদন বাড়ানো কঠিন। তবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে আউশের চাষ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত বোরো চাষের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো এলাকায় এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে।’
আউশ চাষিদের জন্য সরকারকে একটি সরকারি ক্রয়মূল্য নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথাও বলেছেন।
(এই প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন আমাদের রংপুর সংবাদদাতা এস দিলীপ রায় ও ঝিনাইদহ সংবাদদাতা ওমর আলী সোহাগ।)

