ফোডেন লাল কার্ড পেলেন কেন, কেনই বা বহাল হালান্ডের গোল?

১৯৯তম ম্যানচেস্টার ডার্বিতে অধিকাংশ সময় ১০ জন নিয়ে খেলেও ম্যানচেস্টার সিটি ১-০ গোলে হারিয়েছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে। তবে রবিবার ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে পুরো ম্যাচের রেষ ঢাকা পড়ে গেছে ভিডিও রেফারির দুটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তকে ঘিরে—ফিল ফোডেনের লাল কার্ড এবং আরলিং হালান্ডের জয়সূচক গোল।

আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি মেনেই সিদ্ধান্ত দুটি নেওয়া হয়েছিল। তবে মাঠের মূল উত্তাপ ও বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে এই আইনগুলোর প্রয়োগ কতটা মানানসই, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেছে।

কেন লাল কার্ড দেখানো হলো ফিল ফোডেনকে?

ম্যাচের ২৩তম মিনিটে ঘটে প্রথম বড় ঘটনাটি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেস সিটির ফিল ফোডেনকে ফাউল করে কড়া ধাক্কায় মাটিতে ফেলে দেন এবং তার ওপর কিছুটা আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে চড়াও হন। ফোডেনের পেছনে ব্রুনোকে লাথি মারতে দেখা যায়। 

মাটিতে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই ফোডেন মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারেননি—তিনি দু-পা উপরের দিকে তুলে বুটের তলার অংশ দিয়ে ব্রুনোর পেটে লাথি মেরে বসেন।

রেফারি মাইকেল অলিভার সঙ্গে সঙ্গে ফোডেনকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। ম্যাচ চলাকালীন যোগাযোগে তার স্পষ্ট কথা ছিল: ‘ফিল ফোডেনকে লাল কার্ড—তিনি ব্রুনোর শরীরে লাথি চালিয়েছেন।’

ভিডিও রেফারি খুব দ্রুতই ঘটনাটি পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখে মূল রেফারির সিদ্ধান্তেই সায় দেন।

তাদের মতে, ‘এটি পরিষ্কার লাল কার্ডের ঘটনা। এখানে একটি অতিরিক্ত বা দ্বিতীয় ধাক্কা দেখা গেছে। সিটির ৪৭ নম্বর খেলোয়ারের লাল কার্ড বহাল রাখা হলো।’

এখানে মূল বিষয় ছিল খেলোয়াড়ের ‘অতিরিক্ত নড়াচড়া’। ফুটবলের ১২ নম্বর আইন অনুযায়ী, বল দখলের লড়াই ছাড়া প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের ওপর অতিরিক্ত বল প্রয়োগ বা হিংস্র আচরণ করাটাই গুরুতর অপরাধ। রেফারির দৃষ্টিতে, খেলোয়াড়ের অনিচ্ছাকৃত পড়ে যাওয়া আর ইচ্ছাকৃত প্রতিশোধমূলক আচরণের তফাত তৈরি করে দেয় এই অতিরিক্ত নড়াচড়াটি।

ফোডেন মাটিতে পড়ার সময় যে স্বাভাবিক গতি ছিল, লাথি মারার ঘটনাটি তার অংশ ছিল না; বরং পড়ে যাওয়ার পর তিনি আলাদাভাবে পা চালিয়েছেন। তখন বলের লড়াই শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং তার বুটের তলা সরাসরি গিয়ে লাগে ব্রুনোর পেটে। তাই ভিডিও রেফারির পক্ষে প্রধান রেফারির সিদ্ধান্ত বাতিলের কোনো সুযোগই ছিল না। নিয়মের কড়াকড়িতে ফোডেনের লাল কার্ড একেবারেই সঠিক।

তবে সিটির ক্ষোভের জায়গা ছিল অন্য জায়গায়। ঘটনাটি যিনি উসকে দিলেন, সেই ব্রুনো ফার্নান্দেস কিন্তু কোনো শাস্তি না পেয়েই পার পেয়ে গেলেন।

আধুনিক রেফারিংয়ের ধারা এমন যে, ঘটনার সূত্রপাত করা খেলোয়াড়ের আচরণকে হিংস্র না ধরে কেবল ‘অসাবধানতা’ হিসেবে দেখা হয়। অথচ জবাবে প্রতিপক্ষ যিনি প্রতিক্রিয়া জানান, তার ওপরই সব দায় এসে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে ভিডিও রেফারিংয়ের অন্যতম বড় সমালোচনা কিন্তু এটিই।

হালান্ডের গোল কেন বৈধ ঘোষণা করা হলো?

খেলার এক ঘণ্টার মাথায় ঘটে দ্বিতীয় ও সবচেয়ে বড় বিতর্কের ঘটনা, যেখান থেকে ম্যাচের জয়সূচক গোলটি পান হালান্ড।

ইউনাইটেড সীমানায় সিটি বল বাড়ালে এনজো ফার্নান্দেস ডাইভ দিয়ে হেডের চেষ্টা করেন। তিনি বল স্পর্শ করতে না পারলেও সুযোগটি কাজে লাগিয়ে বল জালে পাঠান হালান্ড। সীমানা রেখা দেখার দায়িত্বে থাকা রেফারি শুরুতে অফসাইডের বাঁশি বাজিয়ে গোল বাতিল করেছিলেন, কিন্তু ভিডিও রেফারি সেই সিদ্ধান্ত বদলে দেন।

স্বয়ংক্রিয় অফসাইড প্রযুক্তিতে দেখা যায়, হালান্ড অফসাইডে ছিলেন না। প্রতিপক্ষের শেষ রক্ষণের খেলোয়ারের পেছনের পায়ের কারণে তিনি সামান্য ব্যবধানে বৈধ পজিশনেই ছিলেন।

তাহলে মূল প্রশ্ন দাঁড়াল—এনজো ফার্নান্দেস কি খেলায় অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলেছিলেন?

হেড করার চেষ্টার সময় এনজো নিজে অফসাইড পজিশনে ছিলেন। কিন্তু ফুটবলের ১১ নম্বর আইন অনুযায়ী, কেবল অফসাইড পজিশনে থাকলেই তো আর ফাউল হয়ে যায় না।

অফসাইডে থাকা কোনো খেলোয়াড়কে তখনই দোষী ধরা হবে, যদি তিনি প্রতিপক্ষের খেলায় বাধা দেন, কাছাকাছি থাকা বল নিয়ে খেলার চেষ্টা করে প্রতিপক্ষকে প্রভাবিত করেন, কিংবা তার স্পষ্ট কোনো নড়াচড়া প্রতিপক্ষের বল সামলানোর ক্ষমতায় প্রভাব ফেলে।

এনজোর ডাইভ দেখে মনে হয়েছিল তিনি শেষের দুটি শর্তই পূরণ করেছেন। তিনি কাছাকাছি থাকা বলে মাথা ছোঁয়ানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং তার সেই চেষ্টার কারণে ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয়েছিল। পেছনে থাকা মার্তিনেসকে এনজোর নড়াচড়া দেখে নিজের শরীরের গতি সামলাতে হয়েছিল, দৌড়ের গতি বদলাতে হয়েছিল এবং বল দূর করার প্রস্তুতি নিতে হয়েছিল।

কিন্তু ভিডিও রেফারি বিষয়টিকে আরও সংকীর্ণ দৃষ্টিতে দেখেছে। এনজো বলে স্পর্শ করেননি, মার্তিনেসকে আঘাত করেননি বা গোলরক্ষকের চোখের সামনে বাধাও হননি। ফলে কর্মকর্তাদের মতে, মার্তিনেস এখনও বল দূর করার সুযোগ পাচ্ছিলেন এবং এনজো এমন কোনো বড় বাধা তৈরি করেননি যার জন্য গোল বাতিল করা যায়।

ভিডিও রেফারির আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ছিল: ‘রেফারির দেওয়া অফসাইডের সিদ্ধান্ত পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। হালান্ড সঠিক পজিশনেই ছিলেন নিশ্চিত হয়ে গোলটি বহাল রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অফসাইডে থাকা এনজো বলে স্পর্শ করেননি বলেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’

সীমানা রেফারির সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়া নিয়ে টেলিভিশন ধারাভাষ্যকার ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক রক্ষণভাগের তারকা গ্যারি নেভিল তীব্র সমালোচনা করেন।

তিনি সরাসরি বলেন, ‘আমাকে নতুন করে অফসাইডের নিয়ম বোঝাতে হবে, কারণ এই সিদ্ধান্তের কোনো মাথামুণ্ডু আমি খুঁজে পাচ্ছি না। পরে যখন তারা ঘটনাটি ফের দেখবে, তখন অবশ্যই নিজেদের ভুল বুঝতে পারবে।’

নেভিলের যুক্তি ছিল, মাঠের পরিস্থিতি অনুযায়ী একজন রক্ষণভাগের খেলোয়ার কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়—আইনের এই ব্যাখ্যায় তা একেবারেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

কোনো আক্রমণভাগের খেলোয়াড় যদি বলের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে, কোনো রক্ষণের খেলোয়ারই তাকে উপেক্ষা করতে পারে না। গায়ে স্পর্শ না লাগলেও প্রতিপক্ষের সেই চটজলদি নড়াচড়ার কারণে রক্ষণের খেলোয়ারের গতির ভারসাম্য নষ্ট হয়, দাঁড়ানোর পজিশন ও টাইমিং বদলে যায়।

ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ইউনাইটেড ডিফেন্ডার মার্তিনেসও বেশ ক্ষুব্ধ ছিলেন। ম্যাচ শেষে এই আর্জেন্টাইন বলেন, ‘প্রতিটি মৌসুমের শুরুতে এসে তারা নিয়মকানুন বুঝিয়ে যায়, আর মাঠে এসে এই ধরনের ভুল করে। এটা স্পষ্ট অন্যায়।’

নিয়ম বনাম মাঠের বাস্তবতা

আইনের অক্ষরে অক্ষরে ব্যাখ্যা করলে দুটি সিদ্ধান্তেরই যৌক্তিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়।

ফোডেনের লাথিটি ছিল স্পষ্ট গুরুতর অপরাধ, কারণ ব্রুনোর সঙ্গে প্রাথমিক সংঘর্ষ শেষ হওয়ার পর তিনি আলাদাভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পা চালিয়েছিলেন।

অন্যদিকে, এনজো অফসাইড পজিশনে থাকা সত্ত্বেও মার্তিনেসকে বল খেলার ক্ষেত্রে সেই মাত্রায় বাধা দেননি যা ১১ নম্বর আইন অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

আইনগুলো তৈরি করা হয়েছে রেফারিদের যেন সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়। কিন্তু ফুটবল খেলাটা তো কেবল নিয়মের খাতায় চলে না—এখানে জড়িয়ে থাকে খেলোয়াড়দের সহজাত প্রবৃত্তি, গতি আর চোখের পলকে নেওয়া প্রতিক্রিয়া।

ফোডেনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি শুধু শেষ মুহূর্তের লাথির ওপর জোর দিয়েছে, পেছনের মূল সংঘাতটি এড়িয়ে গেছে। আবার হালান্ডের গোলের সময় এনজোর চালচলন মার্তিনেসকে কতটা বিভ্রান্ত করল তা না দেখে, শারীরিকভাবে এনজো বাধা দিয়েছেন কি না—কেবল সেটুকুই হিসাব করা হয়েছে।

ম্যানচেস্টার ডার্বির এই ঘটনাগুলো ফুটবল আইনের যান্ত্রিক ব্যাখ্যা আর মাঠের বাস্তবতায় ফুটবলারদের অনুভূতির মধ্যকার চিরাচরিত দ্বন্দ্বকে আবারও সামনে এনে দিল।

 

Related Articles

Latest Posts