বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ এমটি নিমেনিয়া শনিবার সৌদি আরব থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। প্রায় এক লাখ টন তেল নিয়ে জাহাজটি সুয়েজ খাল, ভূমধ্যসাগর ও জিব্রাল্টার প্রণালি পেরিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে বাংলাদেশে এসেছে।
হামলার ঝুঁকি এড়াতে নিয়মিত পথ এড়িয়ে এই বিকল্প রুটে আসতে জাহাজটির সময় লেগেছে ৫০ দিন। এতে অতিরিক্ত খরচ হয়েছে ৬৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। বাব আল-মানদেব হয়ে বাংলাদেশে এলে ১৬ দিনের মতো সময় লাগত। খরচও এত বেশি হতো না।
ট্যাংকারটির স্থানীয় একজন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, জাহাজটি যদি ইয়ানবু থেকে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব হয়ে ভারত মহাসাগর পেরিয়ে বাংলাদেশে আসত, তাহলে ইয়ানবু থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছাতে প্রায় ১৩ থেকে ১৫ দিন সময় লাগত।
ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশ লোহিত সাগরভিত্তিক নৌপথের ওপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করেছিল।
কিন্তু ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের মুখে অবস্থিত সরু নৌপথ বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করায় মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহনের এই বিকল্প পথেও এখন ঝুঁকি বেড়েছে।
এর ফলে, সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকে বাংলাদেশের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে পথ অনেক দীর্ঘ হচ্ছে এবং পরিবহন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সৌদি আরব অপরিশোধিত তেল, ইউরিয়া, ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এবং মিথানলের একটি প্রধান উৎস।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে ২১ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা মূল্যের ২৯ লাখ ৯৮ হাজার টন পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ লাখ ৪১ হাজার টন, যার মূল্য ২৫ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম আড়াই মাসে সৌদি আরব থেকে প্রায় ৫ লাখ ২৬ হাজার টন পণ্য আমদানি হয়েছে, যার মূল্য ৫ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে আমদানি করা ৩০ লাখ ৪১ হাজার টন পণ্যের মধ্যে অপরিশোধিত তেল ছিল ১৩ লাখ টন, ইউরিয়া ৬ লাখ ৭ হাজার টন এবং ডিএপি ৩ লাখ ২৭ হাজার টন।
জ্বালানি সরবরাহে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নেই
অপরিশোধিত তেল আমদানিতে বাংলাদেশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর নির্ভরশীল। তবে পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা খুবই কম।
সরকার-টু-সরকার চুক্তি ও আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে এখন চীন, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত ও ওমানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ডিজেল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করা হচ্ছে। অন্যদিকে অপরিশোধিত তেল আমদানি মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতনির্ভর।
সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির আওতায় সৌদি আরব থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে মুরবান অপরিশোধিত তেল আমদানি করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
জ্বালানি সংক্রান্ত বিষয় দেখভালের দায়িত্বে থাকা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, দেশে বর্তমানে জ্বালানি সরবরাহে তাৎক্ষণিক কোনো ঝুঁকি নেই। মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে এবং বিকল্প উৎস থেকে পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য স্বাভাবিকভাবেই আসছে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন পেট্রোলিয়াম পণ্যের চাহিদা রয়েছে। আর ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে, যার পুরোটাই আমদানি করা হয়।
মনির বলেন, ‘আমাদের মজুত পর্যাপ্ত। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমাদের অন্তত ৩৫ দিনের ডিজেল মজুত আছে। এখন পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থায় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি এবং কোনো সরবরাহকারীও জানায়নি যে তারা পণ্য দিতে পারবে না।’
তিনি বলেন, পরিশোধিত জ্বালানি তেলের জন্য বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর খুব একটা নির্ভরশীল নয়, যে কারণে বাব আল-মানদেব প্রণালির অস্থিরতার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে খুব একটা পড়ার সম্ভাবনা নেই। তবে অপরিশোধিত তেল নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, কারণ বাংলাদেশ এ অঞ্চলের দেশগুলো থেকেই অপরিশোধিত তেল আমদানি করে।
অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হলে পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে কি না, জানতে চাইলে মনির বলেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাড়তি এই ব্যয় বহন করতে হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের বাড়তি ব্যয় হতে পারে। তবে যতক্ষণ সরবরাহব্যবস্থা নিরাপদ থাকবে, ততক্ষণ আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।’
এমটি নিমেনিয়া ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর থেকে প্রায় ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে আরেকটি ট্যাংকার ১৪-১৫ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করে ২৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, জাহাজটিকে বাব আল-মানদেব প্রণালি পাড়ি দিতে হবে না। ফলে নির্ধারিত সময়েই এটি পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে থাকায় এর সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে কর্মকর্তাদের উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
সারে আবারও চাপ বাড়ার আশঙ্কা
বাব আল-মানদেব প্রণালিতে সৃষ্ট সংকট সারের আমদানিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ইউরিয়া ও ডিএপি সারের ক্ষেত্রে সৌদি আরবের ওপর বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১৪ লাখ ৭৯ হাজার টন ইউরিয়া আমদানি করেছে। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে এসেছে ৬ লাখ ৬ হাজার টন। একই সময়ে ৭ লাখ ৮১ হাজার টন ডিএপি সার আমদানি করা হয়, যার মধ্যে সৌদি আরব থেকে এসেছে ৩ লাখ ২৭ হাজার টন।
বাব আল-মানদেব এড়িয়ে দীর্ঘ পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে হলে সারের পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহে দেরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন বলেন, ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলজুড়ে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকলে বাব আল-মান্দেব দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়ে সারের সরবরাহে আবারও চাপ তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমরা রপ্তানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছি।’
মোশাররফ বলেন, সামনে রবি মৌসুম হওয়ায় আলু, ভুট্টা, তিসি, তেলবীজ, পেঁয়াজ ও রসুনসহ বিভিন্ন ফসলের জন্য পর্যাপ্ত সারের প্রয়োজন হবে। তাই সার আমদানি দ্রুত করতে হবে।
তার মতে, রবি মৌসুমে সারের সরবরাহে কোনো বিঘ্ন বা দেরি হলে কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
খাদ্যপণ্য রপ্তানিতেও প্রভাব
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান খান চৌধুরী বলেন, প্রতিবছর সৌদি আরবে প্রায় ২০ কোটি ডলারের প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, সৌদি আরবে প্রাণ অনেক ধরনের পণ্য রপ্তানি করে। ফলে পণ্য পরিবহনে কোনো বিঘ্ন বা দেরি হলে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি মনে করি সংকট দীর্ঘায়িত হবে না।’

