সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে এখন আশির দশকের ট্রেন্ড। এআইয়ের তৈরি ছবিতে ফিরছে সেই সময়ের পোশাক, চুলের স্টাইল, সাজসজ্জা ও লুক। নতুন প্রজন্মের কাছে পুরোনো সেই নান্দনিকতাই হয়ে উঠেছে ‘ভিনটেজ কুল’। এই ট্রেন্ডের পেছনে যদি আশির দশকের সিনেমার প্রভাব থাকে, তাহলে ফিরে দেখা যাক ঢাকাই সিনেমার সেই সোনালি সময়।
আশির দশক ছিল ঢাকাই সিনেমার বৈচিত্র্যময় এক অধ্যায়। এ সময় একদিকে নির্মিত হয়েছে বাণিজ্যিক, ফোক ও অ্যাকশনধর্মী সিনেমা, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে বাস্তবধর্মী ও সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র। নায়করাজ রাজ্জাক, শাবানা, ববিতা, কবরী, আলমগীর, সোহেল রানা, জাফর ইকবাল, রোজিনা, ওয়াসিম, ইলিয়াস কাঞ্চন, অলিভিয়া, বুলবুল আহমেদ, সুচরিতা, অঞ্জু ঘোষ ও রুবেলের মতো তারকারা ছিলেন এ সময়ের জনপ্রিয় মুখ। পাশাপাশি বিকল্পধারার সিনেমায় আফজাল হোসেন, হুমায়ুন ফরীদি, রাইসুল ইসলাম আসাদ ও সুবর্ণা মুস্তাফার মতো শিল্পীরাও নিজেদের জায়গা করে নেন।

১৯৮০ সালে মুক্তি পায় আবদুল্লাহ আল মামুন পরিচালিত ‘সখী তুমি কার’। ত্রিভুজ প্রেমের গল্পের এই সিনেমায় অভিনয় করেন রাজ্জাক, শাবানা ও ফারুক।
একই বছর মুক্তি পায় আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘কসাই’। এতে অভিনয় করেন আলমগীর, ববিতা ও রোজিনা। সিনেমাটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে।
সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী পরিচালিত ‘ঘুড্ডি’ মুক্তি পায় ১৯৮০ সালে। অভিনয় করেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, সুবর্ণা মুস্তাফা ও তারিক আনাম খান। এই সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় সুবর্ণা মুস্তাফার। সে সময় আধুনিক ধারার সিনেমা হিসেবে এটি আলোচিত হয়েছিল। হ্যাপী আখন্দ ও লাকী আখন্দের কালজয়ী গান ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ এই সিনেমারই গান।

১৯৮০ সালের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সিনেমা আবদুল্লাহ আল মামুন পরিচালিত ‘এখনই সময়’। এতে অভিনয় করেন ববিতা, উজ্জ্বল ও আবুল খায়ের। সিনেমাটির জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান আবদুল্লাহ আল মামুন।
১৯৮১ সালে মুক্তি পায় আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’। এতে অভিনয় করেন বুলবুল আহমেদ, ববিতা, আনোয়ারা, প্রবীর মিত্র ও সুমিতা দেবী।
১৯৮২ সালে মুক্তি পাওয়া সাহিত্যনির্ভর সিনেমার মধ্যে অন্যতম ‘দেবদাস’। চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনের এই সিনেমায় দেবদাস চরিত্রে অভিনয় করেন বুলবুল আহমেদ। পার্বতী চরিত্রে কবরী এবং চন্দ্রমুখী চরিত্রে আনোয়ারা।
একই বছরে মুক্তি পায় ‘বড় ভালো লোক ছিল’। মোহাম্মদ মহিউদ্দিন পরিচালিত সিনেমাটিতে অভিনয় করেন রাজ্জাক, প্রবীর মিত্র, অঞ্জু ঘোষ ও সাইফুদ্দিন।

১৯৮২ সালের আরেক আলোচিত সিনেমা আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘দুই পয়সার আলতা’। এতে অভিনয় করেন শাবানা, রাজ্জাক, নূতন ও আনোয়ারা। সিনেমাটি চারটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে।
একই বছরে মুক্তি পাওয়া ‘রজনীগন্ধা’ পরিচালনা করেন কামাল আহমেদ। অভিনয় করেন রাজ্জাক, শাবানা, অঞ্জনা রহমান ও আলমগীর।

১৯৮৩ সালে মুক্তি পায় আবদুল লতিফ বাচ্চু পরিচালিত ‘নতুন বউ’। এতে আফজাল হোসেনের বিপরীতে অভিনয় করেন ববিতা। আরও ছিলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ ও সুবর্ণা মুস্তাফা।
১৯৮৪ সালে আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘ভাত দে’ মুক্তি পায়। এতে অভিনয় করেন শাবানা, আলমগীর, রাজীব ও আনোয়ার হোসেন। শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন আঁখি আলমগীর। সিনেমাটি নয়টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত প্রথম বাংলাদেশি সিনেমা হিসেবেও এটি পরিচিত।

একই বছর মুক্তি পায় বেলাল আহমেদ পরিচালিত ‘নয়নের আলো’। ত্রিভুজ প্রেমের গল্পের এই সিনেমায় অভিনয় করেন জাফর ইকবাল, কাজরী ও সুবর্ণা মুস্তাফা।
১৯৮৫ সালে মুক্তি পায় শিবলী সাদিক পরিচালিত ‘তিন কন্যা’। এতে সুচন্দা, ববিতা ও চম্পা বাস্তব জীবনের তিন বোনের চরিত্রে অভিনয় করেন।
একই বছর মুক্তি পাওয়া ‘প্রেমিক’ পরিচালনা করেন মঈনুল হোসেন। এতে অভিনয় করেন ববিতা, জাফর ইকবাল, অঞ্জনা ও নূতন। জাফর ইকবাল ও ববিতার জুটি সিনেমাটিতে দর্শকের নজর কাড়ে।

১৯৮৬ সালে মুক্তি পায় শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘লড়াকু’। এই সিনেমার মাধ্যমে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন রুবেল। বাংলাদেশের সিনেমায় অ্যাকশন ও কারাতেনির্ভর সিনেমার নতুন ধারা তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একই বছরে মুক্তি পায় মমতাজ আলী পরিচালিত ‘উসিলা’। এতে অভিনয় করেন শাবানা, উজ্জ্বল, জাফর ইকবাল, দিতি ও সুনেত্রা।
১৯৮৭ সালে মুক্তি পায় দিলীপ বিশ্বাস পরিচালিত ‘অপেক্ষা’। এতে অভিনয় করেন আলমগীর, শাবানা, জাফর ইকবাল ও সুচরিতা।

১৯৮৮ সালে মুক্তি পায় আবদুল্লাহ আল মামুন পরিচালিত ‘দুই জীবন’। এতে অভিনয় করেন বুলবুল আহমেদ, কবরী, আফজাল হোসেন ও দিতি। সিনেমাটি ছয়টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে।
একই বছর মুক্তি পাওয়া ‘ভেজা চোখ’ পরিচালনা করেন শিবলী সাদিক। এতে অভিনয় করেন ইলিয়াস কাঞ্চন, চম্পা, মিঠুন, নীপা ও মোনালিসা।

১৯৮৯ সালে মুক্তি পায় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ব্যবসাসফল সিনেমা ‘বেদের মেয়ে জোসনা’। তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত সিনেমাটিতে অভিনয় করেন ইলিয়াস কাঞ্চন ও অঞ্জু ঘোষ।
আশির দশকের উল্লেখযোগ্য আরও কিছু সিনেমার মধ্যে রয়েছে আজিজুর রহমানের ‘ছুটির ঘণ্টা’, বাদল রহমানের ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’, রাজ্জাকের ‘অভিযান’, শেখ নিয়ামত আলীর ‘দহন’ এবং সাহিত্যনির্ভর ‘পরিণীতা’, ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’ ও ‘শুভদা’।

আশির দশকের সিনেমার দিকে ফিরে তাকালে শুধু সিনেমার গল্প নয়, ফিরে আসে একটি সময়ও। সেই সময়ের নায়ক-নায়িকার পোশাক, চুলের স্টাইল, সংলাপ, গান ও পোস্টার—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল আলাদা এক সাংস্কৃতিক আবহ। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে; কিন্তু আশির দশকের সেই নান্দনিকতা ও সিনেমার প্রতি মানুষের নস্টালজিয়া এখনো অটুট। আজকের ‘ভিনটেজ কুল’-এর মধ্যেও তাই ফিরে আসে সোনালি দিনের ঢাকাই সিনেমার রং, গন্ধ ও গল্প।

