ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের (এফএসআইবিএল) তোপখানা রোড শাখার গ্রাহক আহসানুল হক তানভীর। গত দেড় বছরে নিজের জমানো ৪৮ লাখ টাকা তুলতে ব্যাংকে বারবার গিয়েছেন তিনি। কিন্তু প্রতিবারই তাকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে।
অবশেষে গতকাল সোমবার তার সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে। সঞ্চয়ী হিসাব থেকে পুরো টাকাই তুলতে পেরেছেন তিনি।
টাকা হাতে পাওয়ার পর দ্য ডেইলি স্টারকে তানভীর বলেন, আজ নিজের টাকা ফেরত পাওয়াটা যেন পুরস্কার জেতার মতো লাগছে। ব্যাংকে টাকা থাকার পরও গত দেড় বছর সংসার চালাতে আমাকে ধার করতে হয়েছে।
তানভীরের মতোই স্বস্তি ফিরেছে আরও ৫ হাজার ৫৩১ আমানতকারীর জীবনে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু করেছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক।
গত বছর সংকটে থাকা এই পাঁচ ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠন করা হয় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে ৫ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার একদিন পর গতকাল সোমবার থেকে আমানত ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করে ব্যাংকটি।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবেদুর রহমান সিকদার জানান, প্রথম দিন গ্রাহকদের প্রায় ২৫৪ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে এই পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা নিজেদের টাকা তুলতে পারছিলেন না। দুই বছরের বেশি সময় ধরে টাকা ফেরতের দাবিতে তারা বিভিন্ন সময় বিক্ষোভও করেছেন।
গত ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ঘোষণা দেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তিগত আমানতকারীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী আমানতের মূল টাকা তুলতে পারবেন।
এরপর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা তোলার আবেদন নেওয়া শুরু করে। রোববার পর্যন্ত সেই প্রক্রিয়া চলে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, এর মধ্যে প্রায় ৭৫ হাজার গ্রাহক টাকা তোলার আবেদন করেছেন। তারা মোট ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা ফেরত চেয়েছেন।
তবে সোমবার শুধু ১ সেপ্টেম্বর আবেদন করা গ্রাহকেরাই টাকা তুলতে পেরেছেন। পরে যারা আবেদন করেছেন, তাদের ধাপে ধাপে টাকা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
গ্রাহকদের টাকা পরিশোধের জন্য রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে ৫ হাজার কোটি টাকা দেয়।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, দু-একটি শাখা ছাড়া দেশের প্রায় সব শাখাতেই গ্রাহকেরা নির্বিঘ্নে টাকা তুলতে পেরেছেন।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবেদুর রহমান বলেন, টাকা তোলার জন্য আবেদন করা সব গ্রাহককে ফোন করে শাখায় আসতে বলা হয়েছিল।
তিনি বলেন, সবাই টাকা তুলতে আসেননি। এটাই প্রমাণ করে যে ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে।
তবে সোমবার কতজন গ্রাহক টাকা তুলেছেন এবং মোট কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, সে তথ্য তিনি তাৎক্ষণিকভাবে দিতে পারেননি।
দ্য ডেইলি স্টার রাজধানীর পাঁচ একীভূত ব্যাংকের কয়েকটি শাখা ঘুরে দেখেছে, সেখানে গ্রাহকদের খুব বেশি ভিড় ছিল না।
দুপুরের দিকে মতিঝিলে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের করপোরেট শাখায় মাত্র পাঁচ থেকে ছয়জন গ্রাহককে দেখা যায়। তাদের কেউ এসেছেন নিয়মিত ব্যাংকিং কাজে, আবার কেউ আগে তুলতে না পারা আমানতের টাকা তুলতে বা টাকা তোলার আবেদন করতে এসেছেন।
ব্যাংক কর্মকর্তারা অনেকটা উৎসবের আমেজে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিচ্ছিলেন। কোনো কোনো গ্রাহককে ফুল দিয়ে স্বাগতও জানানো হয়।
শাখাটির গ্রাহক সদরুল আমিন ১ সেপ্টেম্বর টাকা তোলার আবেদন করেছিলেন। সোমবার তিনি ব্যাংকে আসেন নিজের আমানতের মুনাফা তুলতে। তবে পুরো আমানত তিনি তোলেননি। কারণ মেয়াদপূর্তির আগে আমানত ভাঙলে তিনি মুনাফা পাবেন না।
সদরুল আমিন বলেন, আমানত ফেরত দেওয়া হবে শুনেও গ্রাহকেরা টাকা তুলতে খুব বেশি ভিড় করেননি। তাই মনে হয়েছে, ব্যাংকের প্রতি আস্থা ফিরবে। সে কারণেই পুরো টাকা তুলিনি।
শাখাটির ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, গত কয়েক দিনে প্রায় ৪০টি আবেদন জমা পড়েছে। এর অনেকগুলোতেই গ্রাহকেরা শুধু মুনাফার টাকা তুলতে চেয়েছেন। তাদের মধ্যে গতকাল মাত্র ছয় থেকে সাতজন টাকা তুলতে এসেছেন।
গতকাল সোমবার বিকেলে এফএসআইবিএলের কাকরাইল শাখাতেও গ্রাহকদের তেমন ভিড় দেখা যায়নি। শাখাটির পরিচালন ব্যবস্থাপক মাসুদ রানা বলেন, শুধু ১ সেপ্টেম্বর টাকা তোলার আবেদন করা গ্রাহকদেরই এখন টাকা দেওয়া হচ্ছে।
গতকাল নয়জন গ্রাহককে মোট প্রায় ৪০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী এভাবেই ধীরে ধীরে টাকা ফেরত দেওয়া হবে। এছাড়া যারা টাকা তোলার আবেদন করেছেন, তাদের ফোন করেও শাখায় আসতে বলা হচ্ছে।
তবে তাদের কেউ কেউ টাকা তুলে আবার সেই টাকা ব্যাংকেই জমা রাখছেন বলেও জানান তিনি।
এফএসআইবিএলের তোপখানা রোড শাখায় গতকাল আমানত থেকে ৫ লাখ টাকা মুনাফা তুলে নিয়েছেন গ্রাহক লুৎফুন নাহার। তিনি বলেন, টাকা তুলতে পেরে খুব স্বস্তি লাগছে। তবে মেয়াদপূর্তির আগে তিনি তার মূল আমানত ভাঙেননি।

