সরকারি কোনো মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে মানুষ সাধারণত কী আশা করে? সরকারি কাজের তথ্য, বাজেট, ব্যয়, প্রকল্পের অগ্রগতি কিংবা বিভিন্ন কর্মসূচির হালনাগাদ তথ্য। কিন্তু বাস্তবে এসব তথ্য খুঁজতে গিয়ে অনেক সময় খালি হাতেই ফিরতে হয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের কথাই ধরা যাক। সেখানে খাদ্যশস্যের সরকারি মজুত কত, কত শস্য আমদানি ও সংগ্রহ করা হয়েছে, দেশের সাইলো ও গুদামগুলোর ধারণক্ষমতা কত, কিংবা খোলাবাজারে খাদ্যশস্য বিক্রির (ওএমএস) কর্মসূচির তথ্য, এসব থাকার কথা। কিন্তু এসব তথ্য খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন।
সরকারি তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে এমন চিত্রই যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। মন্ত্রণালয়গুলো নিয়মিত বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যন্ত প্রকাশ করছে না, যদিও আইন অনুযায়ী এসব প্রতিবেদন প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক।
বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নে থাকা ৩৭টি মন্ত্রণালয় ও ৯টি বিভাগের ওয়েবসাইট পর্যালোচনা করে দ্য ডেইলি স্টার দেখেছে, বেশির ভাগই নিয়মিত বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে না।
এর ফলে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম, ব্যয় ও কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন ব্যবহারকারী ও বিশেষজ্ঞরা।
অন্তত ২০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ওয়েবসাইটে সর্বশেষ ২০২৩ সাল পর্যন্ত বার্ষিক প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। এরপর আর কোনো বছরের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
একটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বার্ষিক প্রতিবেদন তালিকাভুক্ত থাকলেও সেগুলো খোলা যাচ্ছিল না। আবার কয়েকটি সরকারি ওয়েবসাইটে কোনো বার্ষিক প্রতিবেদনই কখনো প্রকাশ করা হয়নি।
কিছু মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বার্ষিক প্রতিবেদনের জন্য আলাদা কোনো বিভাগও নেই। এতে বোঝা যায়, তথ্য প্রকাশের আইন মানার ক্ষেত্রে আরও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
তথ্য অধিকার আইনের (আরটিআই) ৬ ধারায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশের কথা বলা হয়েছে। এতে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশেরও নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামো, কার্যক্রম, দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তের মতো তথ্য থাকার কথা।
তথ্য কমিশনের ২০১৪ সালের ‘স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ নির্দেশিকাতেও’ মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাগুলোকে নিজেদের ওয়েবসাইটে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে বলা হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, এই নিয়মের মূল উদ্দেশ্য হলো সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, তথ্য অধিকার আইন শুধু নাগরিকদের তথ্য চাওয়ার অধিকারই নিশ্চিত করেনি, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তথ্য প্রকাশের দায়িত্বও দিয়েছে।
তার মতে, বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ না হলে সরকারের কার্যক্রম, বাজেট বাস্তবায়ন, অর্জন, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এতে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নীতি তৈরির কাজও বাধাগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে সরকারের কাজ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের বোঝাপড়াও সীমিত হয়ে যায়। হালনাগাদ তথ্য না থাকার কারণে সাংবাদিকদেরও প্রতিদিন সমস্যায় পড়তে হয়।
দ্য ডেইলি অবজারভারের সাবেক প্রতিবেদক হিমেল হাসনাত রাফি বলেন, সরকারি ওয়েবসাইট নিয়মিত হালনাগাদ না হলে সাংবাদিকদের অনেক সময় অনানুষ্ঠানিক সূত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। আবার তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেও তথ্য চাইতে হয়। এতে সময় লাগে। এতে সংবাদ প্রকাশে দেরি হয় এবং খবরটির তাৎপর্যও কমে যায়।
মন্ত্রণালয়ের বাজেট, বরাদ্দ ও বিভিন্ন কার্যক্রমের হালনাগাদ তথ্য না থাকলে সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতা যাচাই করাও কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কি না, তা অনুসন্ধান করাও কঠিন হয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সাধারণত প্রতি বছর মন্ত্রণালয়গুলোকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরির জন্য চিঠি দেয়। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রতিবেদন তৈরি ও প্রকাশের ব্যবস্থা করে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রাহেদ হোসেন।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, প্রতিবেদন তৈরির কাজ তদারকির জন্য প্রতিটি মন্ত্রণালয় নিজস্ব কমিটি গঠন করে।
তবে কয়েকজন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এ কারণেই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
কেউ কেউ ওয়েবসাইটের কারিগরি সমস্যা এবং তথ্য কমিশনে সদস্য নিয়োগে দেরিকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা ইমদাদুল ইসলাম বলেন, তথ্য অধিকার আইনের আওতায় প্রতি অর্থবছরেই একটি চিঠি দেওয়া হয়। তবে এবার তা দেওয়া হয়নি। রাহেদ হোসেনও একই ধরনের কথা জানিয়েছেন।
নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও প্রতিবেদন প্রকাশ না করার পেছনে বিভিন্ন কারণের কথা বলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়া, এ বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি এবং প্রতিবেদন প্রকাশের দায়িত্ব কার, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আহম্মেদ আলীও তথ্য কমিশনে সদস্য নিয়োগে দেরি এবং তথ্য অধিকার আইন সংশোধনের বিষয়টি ঝুলে থাকাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তথ্য কমিশনে সময়মতো সদস্য নিয়োগ না হওয়ায় মন্ত্রণালয়গুলোর ওপর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়ে জবাবদিহির চাপও কমে গেছে।
সরকারি ওয়েবসাইটে তথ্য না থাকার সমস্যা অবশ্য নতুন নয়। ২০২১ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ১৫৩টি সরকারি ও ৩৯টি বেসরকারি সংস্থার ওয়েবসাইট পর্যালোচনা করে একটি গবেষণা করেছিল। এতে দেখা যায়, ৫৪ শতাংশ সরকারি ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশের মান ছিল ‘অপর্যাপ্ত’।
টিআইবি তখন নিয়মিত বাজেট, প্রতিবেদন এবং কর্মকর্তাদের যোগাযোগের তথ্য প্রকাশের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু দ্য ডেইলি স্টারের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব সুপারিশের অনেকটাই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বছরের পর বছর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করা সরকারি প্রতিষ্ঠানের আইনগত দায়িত্বের প্রতি এক ধরনের অবহেলার উদাহরণ।
তিনি বলেন, নতুন নির্বাচিত বিএনপি সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি ছিল। এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
তার মতে, নতুন সরকার জনগণের যে ম্যান্ডেট পেয়েছে, তার অন্যতম ভিত্তি ছিল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর এই দীর্ঘদিনের গোপনীয়তার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে দ্রুত তথ্য প্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তোলাকে সরকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

