আকরামের টিপস নেওয়া ইরফান এখন নিয়মিত খোঁচান পাকিস্তানকে

একসময় ভারতের ক্রিকেটে ইরফান পাঠানকে বলা হতো ‘ভারতের ওয়াসিম আকরাম’। বাঁহাতি পেসার, প্রায় একই রকম বোলিং অ্যাকশন, বলের গতি আর রিভার্স সুইং মিলিয়ে তরুণ পাঠানের মধ্যে পাকিস্তানের কিংবদন্তি পেসারের ছায়া খুঁজে পেয়েছিলেন অনেকেই। শুধু তুলনাই নয়, একসময় খোদ আকরামের কাছ থেকেই বোলিংয়ের পরামর্শও নিয়েছিলেন পাঠান। অথচ সময় বদলেছে। সেই ইরফানই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাকিস্তানকে নিয়ে নিয়মিত সরব।

ইরফানের সঙ্গে নিজের প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতি মনে করে সেই গল্পই নতুন করে সামনে এনেছেন আকরাম। ২০০৪ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে ইরফানের সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল তার। তখন ধারাভাষ্যকার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক।

‘ইরফান আমার বড় ভক্ত ছিল। আমাদের খেলা দেখে বড় হয়েছে। আমি তাকে এখানে-সেখানে কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছিলাম। তবে ক্যারিয়ারের শুরুতেই সে ভালো করেছিল। শুরু থেকেই তার অ্যাকশনটা আমার মতো ছিল,’ বলেছেন আকরাম।

ইরফানের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকটা ছিল সত্যিই দুর্দান্ত। ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানের বিপক্ষে পারফরম্যান্স দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। সিডনিতে টেস্ট অভিষেকেই স্টিভ ওয়াকে ফেরানোর পর রিভার্স সুইংয়ে দুর্দান্ত এক ইয়র্কারে অ্যাডাম গিলক্রিস্টকে সাজঘরে পাঠান।

অস্ট্রেলিয়ার ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে ১০ ম্যাচে ১৬ উইকেট নেওয়ার পর পাকিস্তান সফরে তিন ম্যাচে শিকার করেন আরও আট উইকেট। জহির খান ও আশিস নেহরার সঙ্গে ভারতের পেস আক্রমণে জায়গা করে নেওয়া পাঠানকে তখন অনেকেই দেখছিলেন ভারতের নিজস্ব ওয়াসিম আকরাম হিসেবে।

তুলনাটা অবশ্য শুধু বাঁহাতি পেসার হওয়ার কারণে ছিল না। পাঠানের বোলিং অ্যাকশনের সঙ্গে আকরামের মিল ছিল চোখে পড়ার মতো। নতুন বলে সুইং করানোর পাশাপাশি পুরোনো বলে রিভার্স সুইং করানোর দক্ষতাও ছিল তার। আর সেই কারণেই অল্প সময়ের মধ্যেই ভারতের ক্রিকেটে তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল বড় প্রত্যাশা।

ক্যারিয়ারের সেই উত্থানের সময়ই আকরামের কাছ থেকে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ পেয়েছিলেন পাঠান। তবে আকরামের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া একজন বোলারকে তিনি মূলত মানসিকতার বিষয়েই বেশি পরামর্শ দিয়েছিলেন।

আকরাম বলেন, ‘খেলোয়াড়েরা যখন কোনো বিষয়ে জানতে চায়, তখন আপনি মূলত মানসিকতার ব্যাপারে বলেন। অ্যাকশন বা এসব ঠিকঠাকই থাকে, কারণ ওই পর্যায়ে আপনি এমনিতেই দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন। কবজির অবস্থান কেমন হবে, কীভাবে ব্যাটারকে বুঝতে হবে, কখন বৈচিত্র্য ব্যবহার করতে হবে, কখন হবে না, এসব নিয়েই কথা হয়।’

মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষেও দারুণ সফল ছিলেন পাঠান। দুই দেশের হয়ে ৩৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে নিয়েছেন ৬৭ উইকেট। এর মধ্যে টেস্টে ২৭টি, ওয়ানডেতে ৩৪টি এবং টি-টোয়েন্টিতে ছয়টি।

২০০৬ সালে করাচি টেস্টে তো এক ওভারেই ইতিহাস গড়ে ফেলেছিলেন তিনি। প্রথম ওভারেই সালমান বাট, ইউনিস খান ও মোহাম্মদ ইউসুফকে ফিরিয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছিলেন পাঠান।

তবে ক্রিকেট থেকে অবসরের পর পাঠানের পাকিস্তানবিরোধী অবস্থানই তাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাকিস্তানের ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের নিয়ে প্রায়ই মন্তব্য করেন তিনি। এমনকি নিজের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে পাকিস্তানের সাবেক তারকা শহীদ আফ্রিদির সঙ্গে একই বিমানে ভ্রমণের সময় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাও পরে পডকাস্টে তুলে ধরেছিলেন পাঠান।

২০২৫ সালের এশিয়া কাপ নিয়েও পাকিস্তানকে নিয়ে সরব ছিলেন ভারতের সাবেক এই অলরাউন্ডার। বিশেষ করে ফাইনালের পর এশিয়া কাপের ট্রফি নিয়ে মহসিন নাকভিকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের সময় তার মন্তব্য আলোচনায় আসে।

পাকিস্তানের বিপক্ষে ভারত জিতলেই পাঠানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খোঁচাও অনেকটা নিয়মিত হয়ে উঠেছে। এশিয়া কাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি কিংবা ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ভারতের জয়ের পর তার ‘রোববার কেমন কাটল, প্রতিবেশীরা?’ ধরনের পোস্ট দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আকরামও বিষয়টি জানেন।

ইরফানকে ‘ভালো ছেলে’ বলার পরই তাই হালকা রসিকতায় পাকিস্তান নিয়ে তার পোস্টের প্রসঙ্গ টেনে আনেন তিনি, ‘ইরফান ভালো ছেলে। এখনো আমার সঙ্গে দেখা করে। তবে ব্যাপারটা আলাদা যে, সে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে টুইট করতেই থাকে। কিন্তু আমাদের সমর্থকরাও প্রস্তুত থাকে। তারাও উপেক্ষা করার মতো নয়। তাদের তো জবাব দিতেই হবে।’

যে মানুষটির কাছ থেকে একসময় বোলিংয়ের খুঁটিনাটি শিখেছিলেন ইরফান, সেই আকরাম অবশ্য ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথকে অন্যভাবে দেখতে চান। নিজের ক্যারিয়ারে অসংখ্যবার এই লড়াইয়ের অংশ হয়েও তার মতে, দুই দেশের ম্যাচকে অতিরিক্ত আবেগ কিংবা পুরোনো প্রতিশোধের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলার কোনো মানে নেই।

‘মানুষের হাতে অনেক বেশি সময়। তারা কেন বুঝতে পারে না? এটা একটা খেলা মাত্র। শেষ পর্যন্ত এটা একটা ম্যাচ। কেউ জিতবে, কেউ হারবে। এরপর পরের ম্যাচে চলে যেতে হবে,’ বলেন তিনি।

আকরামের মতে, বহু বছর আগের ঘটনা আঁকড়ে ধরে বর্তমানের ক্রিকেটকে দেখার প্রবণতাও বন্ধ হওয়া উচিত, ‘কিন্তু না, বহু বছর আগে কী হয়েছিল, সেটাই এখনো মনে ধরে রাখা হয়। প্রতিশোধ আর এসব তো সত্তরের দশকের চিন্তা।’

 

Related Articles

Latest Posts