ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে থাকায় সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় থাকা ৮৬ টন সোনা লন্ডনে সরিয়ে নিয়েছে নেদারল্যান্ডস। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, সংকটের সময় দ্রুত ব্যবহার ও লেনদেনের সুবিধার জন্যই এই পদক্ষেপ।
নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ডিএনবি) বুধবার জানায়, গত ছয় মাসে উত্তর আমেরিকায় থাকা তাদের প্রায় ৮৬ মেট্রিক টন সোনা লন্ডনে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে (বিওই) স্থানান্তর করা হয়েছে। নিউইয়র্ক ও অটোয়ায় আগে রাখা সোনার মজুতের এটি প্রায় ২৭ দশমিক পাঁচ শতাংশ।
ডিএনবি বলেছে, ‘ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ডিএনবি তার সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করছে।’
কেন লন্ডনে নেওয়া হলো?
ডিএনবির মূল যুক্তি হলো, লন্ডনে রাখা সোনা সংকটের সময় তুলনামূলকভাবে দ্রুত বিক্রি বা লেনদেন করা যায়। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে সংরক্ষিত সোনাকে বিশ্বের সবচেয়ে সহজে লেনদেনযোগ্য সোনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
রয়টার্স জানিয়েছে, এর একটি বড় কারণ লন্ডনের সোনা বাজার। লন্ডন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওভার-দ্য-কাউন্টার সোনা বাণিজ্যের কেন্দ্র। এই বাজারে কোনো নির্দিষ্ট এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে নয়, বরং সরাসরি ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে লেনদেন হয়।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ড বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনা সংরক্ষণ করে। ব্যাংকটির গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি গত বছর বলেছিলেন, ‘আপনি যদি ওই বাজারে যুক্ত হতে চান এবং আপনার সোনা লেনদেন বা ব্যবহার করতে চান, তাহলে সেটি লন্ডনে রাখা প্রয়োজন।’
সুইজারল্যান্ডের জুরিখের বিখ্যাত বহুজাতিক প্রাইভেট ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান জুলিয়াস বেয়ারের বিশ্লেষক কার্স্টেন মেনকেও মনে করেন, ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাখ্যাটি বিশ্বাসযোগ্য। তার মতে, আর্থিক বাজারে চাপ বা অস্থিরতা দেখা দিলে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে রাখা সোনা তুলনামূলকভাবে দ্রুত লেনদেন করা যায়।
ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিই কি মূল কারণ?
ডিএনবির প্রেসিডেন্ট ওলাফ স্লেইপেন বলেছেন, ‘আমাদের স্থিতিস্থাপকতা ও প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।’ তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সোনার মজুত ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে বলে মনে করছে না।
বিশ্লেষক মেনকের মতে, এই পদক্ষেপ শুধু সোনা সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা নয়, বরং বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কয়েক বছর আগের তুলনায় বেশি বলে মনে করার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো রিজার্ভের স্থিতিস্থাপকতা, দ্রুত ব্যবহারের সক্ষমতা এবং বিভিন্ন দেশে তা ছড়িয়ে রাখার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
কীভাবে সরানো হলো সোনা?
পুরো ৮৬ টন সোনা সরাসরি উত্তর আমেরিকা থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়নি।
ডিএনবি জানিয়েছে, নিউইয়র্কে থাকা প্রায় ৫৯ টন সোনা বিক্রি করে লন্ডনে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের বাজারমান পূরণ করে এমন সোনা কেনা হয়েছে।
এ ছাড়া, উত্তর আমেরিকা থেকে ২৭ টন সোনা নেদারল্যান্ডসে সরিয়ে নেওয়া হয়। একই পরিমাণ ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের মানদণ্ড পূরণ করে এমন সোনা নেদারল্যান্ডসের জেইস্টের ভল্ট থেকে লন্ডনে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এই ব্যবস্থার ফলে সোনার বারগুলো পুনরায় গলিয়ে নতুন করে তৈরির প্রয়োজন হয়নি বলে জানিয়েছে ডিএনবি।
ফ্রান্সও একই পদক্ষেপ নিয়েছে
নেদারল্যান্ডসের এই সিদ্ধান্তের কয়েক মাস আগে ফ্রান্সও নিউইয়র্কে থাকা সোনার বার বদল করেছে।
২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিউইয়র্কে থাকা ১২৯ টন পুরোনো সোনার বার বিক্রি করে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নতুন বার কেনে। নতুন বারগুলো নিউইয়র্কের পরিবর্তে প্যারিসে রাখা হয়।
তবে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফ্রাঁসোয়া ভিলেরয় দ্য গালো মার্চে জানিয়েছিলেন, ওই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক কারণে নেওয়া হয়নি।
নেদারল্যান্ডসের সোনার মজুত কত?
সোনা স্থানান্তর করলেও নেদারল্যান্ডসের মোট সোনার মজুতের পরিমাণে কোনো পরিবর্তন হয়নি। দেশটির মোট সোনার মজুত ৬১২ দশমিক চার টনই রয়েছে।
তবে মজুতের অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে নেদারল্যান্ডসের মোট সোনার ৩২ শতাংশ লন্ডনে, প্রায় ৩১ শতাংশ দেশে এবং বাকি ৩৭ শতাংশ নিউইয়র্ক ও অটোয়ায় সমানভাবে রাখা আছে।

