যে দিনটির কথা কেউ ভাবতে চাননি, শেষ পর্যন্ত সেই দিনই এসে গেল। আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর দেখা যাবে না লিওনেল মেসিকে। হাতে লেখা এক আবেগঘন চিঠি ও সঙ্গে একটি ভিডিও বার্তায় জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা। সঙ্গে শেষ হয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবলের সবচেয়ে গৌরবময় এক অধ্যায়ও, শূন্য হয়ে গেছে সেই বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি।
মেসির বিদায় অবশ্য একেবারে আচমকা নয়। অনেক দিন ধরেই ইঙ্গিত মিলছিল, আর্জেন্টিনার হয়ে শেষ সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তবু ঘোষণাটি আসার পর এর ধাক্কা সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে দেশটির মানুষের জন্য, এমনকি পুরো ফুটবল বিশ্বের কাছেও। কারণ মেসির জাতীয় দলের গল্পটা যে শুধুই সাফল্যের নয়; এতে আছে উত্থান, ব্যর্থতা, হতাশা, বিদায়, প্রত্যাবর্তন আর শেষ পর্যন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়ার এক অবিশ্বাস্য যাত্রা।
ক্যারিয়ারের শুরুতেই দিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা, একের পর এক ফাইনালে হার, ২০১৬ সালে জাতীয় দল থেকে অভিমানে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা, সবকিছু পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত মেসিই হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় নায়ক। কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ ও ফিনালিসিমার শিরোপা জিতে পূর্ণ করেছেন নিজের সাফল্যের মুকুট। কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের পর তো তিনি পৌঁছে যান এমন এক উচ্চতায়, যেখান থেকে আর কোনো প্রমাণ দেওয়ার প্রয়োজনই ছিল না।
তবু কেন বিদায়?
সিদ্ধান্তের সব কারণ একমাত্র মেসি ও তার ঘনিষ্ঠরাই জানেন। তবে নিজের বিদায়ী বার্তার শেষ অংশে তিনি একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছেন। আর সেটি হলো, তার বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যু।
মেসি লিখেছেন, ‘আমি এই কথাগুলো লিখেছিলাম ২১ জুলাই, ফাইনালের দুই দিন পর। আজ, আমার বাবার সঙ্গে যা ঘটেছে, তার পর আমি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত।’
মেসির বাবা হোর্হে ছিলেন শুধু তার বাবা নন, ছিলেন সবচেয়ে কাছের মানুষ, আস্থার জায়গা এবং সবচেয়ে বড় ভক্ত। ছোটবেলায় রোজারিওর ক্লাব গ্রানদোলিতে খেলা সেই কিশোর মেসি থেকে শুরু করে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে আসা পর্যন্ত ছেলের প্রতিটি সাফল্যের সাক্ষী ছিলেন তিনি। মেসি যেমন গোল করার পর প্রয়াত দাদি সেলিয়ার স্মরণে দুই হাতের তর্জনী আকাশের দিকে তোলেন, তেমনি তার ক্যারিয়ারের প্রতিটি ধাপে বাবাকে গর্বিত করাটাও ছিল বড় প্রেরণা।
৮ আগস্ট রোজারিওতে হোর্হের মৃত্যু মেসির জীবনে তাই শুধু একজন অভিভাবককে হারানোর ঘটনা ছিল না; হারিয়েছেন নিজের সবচেয়ে বড় সমর্থক ও বিশ্বাসভাজন একজন মানুষকেও। বিদায়ের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সেই শোক কতটা জড়িয়ে আছে, মেসির নিজের কথাতেই তার আভাস পাওয়া যায়।
তবে কেবল পারিবারিক শোকই নয়, বয়সও মেসির সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রেখেছে। ফুটবলের সময়কে মেসি অন্য অনেকের চেয়ে ভালোভাবেই বুঝতে পারেন। ৩৯ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে ২০৩০ বিশ্বকাপ এখন অনেক দূরের পথ। এমনকি ২০২৮ কোপা আমেরিকাও তার জন্য খুব কাছের কোনো গন্তব্য নয়। শেষ বিশ্বকাপেও অংশ নেওয়া উচিত কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়েও তাকে কঠিন মানসিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল।
মেসি লিখেছেন, ‘এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত ছিল, যা আমাকে ভেতর থেকে কষ্ট দিয়েছে এবং এখনো দিচ্ছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, এটাই সঠিক সময়।’
বর্তমান বাস্তবতাও তিনি অস্বীকার করেননি। যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে এখনো তিনি পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন। সাম্প্রতিক আট ম্যাচে করেছেন আট গোল, যার মধ্যে অভিষেকেই ছিল হ্যাটট্রিক; সঙ্গে রয়েছে চারটি অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ বয়স বাড়লেও বল পায়ে মেসির জাদু এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে খেলার জন্য নিজেকে পুরোপুরি উজাড় করে দিতে হয়। সেখানে শুধু শারীরিক সক্ষমতা কিংবা মাঠের পারফরম্যান্সই নয়, মানসিকভাবেও থাকতে হয় সর্বোচ্চ অবস্থায়। আর মেসি নিজেই স্বীকার করেছেন, সেই জায়গায় তিনি আর নেই।
তার ভাষায়, ‘আমার ভেতরটা শূন্য। আর কিছু দেওয়ার মতো আমার কাছে নেই।’
জাতীয় দল ছাড়ার সময় তাই মেসির হাতে রয়েছে পরিপূর্ণ এক উত্তরাধিকার। বিশ্বকাপজয়ী, দুইবারের কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন এবং ফিনালিসিমাজয়ী হিসেবে বিদায় নিচ্ছেন তিনি। অবশ্য শিরোপার সংখ্যা আরও বাড়তে পারত। ২০০৭, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনাল এবং ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে হারের তিক্ত স্মৃতিও তার ক্যারিয়ারের অংশ হয়ে আছে।
তারপরও শেষটা হয়েছে স্বপ্নের মতোই।
একসময় যে তরুণরা মেসিকে ছোটবেলার আদর্শ মেনে ফুটবলে এসেছিলেন, হুলিয়ান আলভারেজ, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্তারসহ আরও অনেকে, তারাই পরে আর্জেন্টিনার সোনালি প্রজন্মের অংশ হয়েছেন। এখন তাদের পরবর্তী প্রজন্মও জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়ছে। নিকো পাজ, ভ্যালেন্তিন বারকোর মতো তরুণদের সামনে জায়গা করে দিতে চান মেসি।
সেই কারণটিও বিদায়ী বার্তায় স্পষ্ট করেছেন তিনি, ‘আমাদের পেছনে বেশ কিছু দারুণ প্রতিভাবান ছেলে উঠে আসছে, যারা সেখানে থাকার যোগ্য।’
মেসির বিদায় তাই শুধু একজন ফুটবলারের অবসর নয়। এটি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ইতিহাসের এক যুগের সমাপ্তি। যে ১০ নম্বর জার্সি একসময় ম্যারাডোনার গায়ে ছিল, পরে যার সঙ্গে মেসি এমনভাবে মিশে গেছেন যে দুটিকে আলাদা করে ভাবাই কঠিন, সেই জার্সিই এবার নতুন কারও অপেক্ষায়।

