সার না পেলে কৃষকের ক্ষতি, ক্ষতি ভোক্তারও। আমন মৌসুমে সময়মতো সার না পৌঁছালে ধানের ফলন কমতে পারে। উৎপাদন কমলে বাড়বে চালের দাম। আর চালের দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় ধাক্কা যাবে দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, চালের দাম মাত্র ১০ শতাংশ বাড়লেও নতুন করে দারিদ্র্যে পড়তে পারেন প্রায় ১৪ লাখ মানুষ।
জরুরি সার আমদানির জন্য দেওয়া ৩০ কোটি ডলারের অর্থায়ন পর্যালোচনা করে বিশ্বব্যাংক বলেছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এবং এর প্রভাবে ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এরই মধ্যে বছরের প্রথম তিন মাসে সারের দাম ১২ শতাংশ বেড়েছে।
গত মাসে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে ৩০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে। এই অর্থ দিয়ে ৩০ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে সময়মতো সার পাওয়ার সুযোগ তৈরির কথা। ঋণটি দেওয়া হয়েছে বিশ্বব্যাংকের খাদ্যনিরাপত্তা জরুরি সহায়তা প্রকল্পের আওতায়।
এই অর্থায়ন মূলত চলতি আমন ও আসন্ন বোরো মৌসুমের জরুরি চাহিদা মেটানোর জন্য। বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার চাহিদা বা নিয়মিত ভর্তুকি দেওয়ার জন্য এই অর্থ নয়।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৬৬ লাখ টন সার প্রয়োজন হয়। এর প্রায় ৭৫ শতাংশই ব্যবহার হয় ধান চাষে। দেশের মোট সারের চাহিদার ৮৫ শতাংশের বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। ফলে বিশ্ববাজারে সরবরাহে কোনো সমস্যা হলে বাংলাদেশও এর প্রভাব পড়ে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতার কারণে এই ঝুঁকি আরও বেশি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শুধু সৌদি আরব থেকেই ডিএপি সারের মোট চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমদানি করেছে বাংলাদেশ।
গ্যাস সংকটের কারণে বাংলাদেশের সাতটি সার কারখানার মধ্যে তিনটি বর্তমানে বন্ধ। ফলে আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সারের ঘাটতি ঠেকাতে গত দুই সপ্তাহে সরকার বিভিন্ন ধরনের ৪ লাখ ৮০ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে।
আমন মৌসুম চলে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। আর বোরো মৌসুম অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত। এই দুই মৌসুমে দেশের মোট ধান উৎপাদনের ৯০ শতাংশের বেশি হয়। এ দুই মৌসুমে ৪৩ লাখ টনের বেশি রাসায়নিক সার প্রয়োজন হয়।
সময়মতো সার না পেলে কৃষকেরা সার ব্যবহার কমিয়ে দিতে পারেন। এতে ধানের ফলন কমে যেতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, মানুষের খাবারের তালিকায় চাল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তাই ধানের উৎপাদন কমলে দ্রুত খাবারের দাম বেড়ে যাবে। এতে দরিদ্র পরিবারগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাবারের পেছনে খরচ হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে কম আয়ের ৪০ শতাংশ পরিবারের খাদ্য ব্যয়ের ২২ শতাংশই যায় চাল কিনতে। চালের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে নতুন করে আরও ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারেন।
ছোট কৃষকদেরই এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। দেশের মোট কৃষক পরিবারের ৯২ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক। তারা মোট আবাদি জমির ৬৫ শতাংশ চাষ করেন। ফলে সময়মতো সার না পাওয়া বা সারের দাম বেড়ে যাওয়ার ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা তাদের সীমিত।
নারীদের কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রও কৃষি। তাদের অনেকে পারিবারিক প্রয়োজন মেটাতে কৃষিকাজ করেন এবং পরিবারের খাবারের জন্য সরাসরি কৃষি উৎপাদনের ওপর নির্ভর করেন।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, অতীতে দারিদ্র্য কমাতে কৃষির প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাই বর্তমান সংকটের সময়ে কৃষি উৎপাদন রক্ষা করা জরুরি।
দেশের মোট আবাদি জমির প্রায় ৭২ শতাংশে ধান চাষ হয়। মানুষের মোট ক্যালরি চাহিদার প্রায় ৬৭ শতাংশ আসে চাল থেকে। গ্রামের ৬৩ শতাংশ মানুষ জীবিকার জন্য কৃষির ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে বড় অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগ এবং কৃষি উপকরণ সরবরাহে বাইরের দেশের ওপর নির্ভরতার কারণে কৃষি খাত এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে।
জুন মাসেই বিশ্বব্যাংক সার আমদানির ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিল। এরপর থেকে দেশের বাজারে সারের দাম ও সরবরাহে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যদিও সরকারি হিসাবে দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে।
দেশের কিছু এলাকার কৃষকেরা জানিয়েছেন, তারা প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না। কয়েক দিন আগে দেশের উত্তরাঞ্চলে কৃষকেরা একটি সার ব্যবসায়ীর গুদাম থেকে সার লুট করে নিয়ে যান। দেশের কয়েকটি এলাকায় কৃষকেরা সার সরবরাহের দাবিতে সড়কও অবরোধ করেছেন।
২৯ আগস্ট ফরিদপুরে এক অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
মন্ত্রী বলেন, বেশি টাকা না দিলে সার পাওয়া যাচ্ছে না, এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, দেশের চাহিদার চেয়ে প্রায় ১৫ লাখ টন বেশি সার আমদানি করা হয়। সরকার প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামজুতও রাখে।
কিছু খুচরা বিক্রেতা সার নেই বলে মিথ্যা প্রচার করছেন এবং বেশি দামে সার বিক্রি করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। মন্ত্রী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সব ধরনের সারের মিলিত নিরাপত্তামজুতের পরিমাণ ১৭ লাখ টন। এই পরিমাণ সার দিয়ে প্রায় তিন মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
চলতি অর্থবছরের শুরুতে দেশে প্রায় ১৮ লাখ টন সার মজুত ছিল। ২৪ আগস্ট তা কমে ১৪ লাখ টনে নেমেছে। ২৫ আগস্ট সরকার কৃষি মন্ত্রণালয়কে সহায়তার জন্য একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে। সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনকে এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে।
দেশজুড়ে সারের বিতরণ ব্যবস্থা ও ডিলার নিয়োগের বিষয়টি পর্যালোচনা করবে এই কমিটি। এরপর তারা কৃষি মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ এম আসাদুজ্জামান বলেন, সরকারি হিসাবে যদি দেশে পর্যাপ্ত সার থাকে, তাহলে সমস্যাটি বিতরণ ব্যবস্থায় হওয়ার কথা। তিনি বলেন, গুদামে সার পড়ে থাকলে কোনো লাভ নেই, যদি তা কৃষকের কাছে না পৌঁছায়। কৃষকেরা কেন সার পাচ্ছেন না, সরকারকে সেটা খুঁজে বের করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক আসাদুজ্জামান বলেন, কৃষকদের যদি সার নিতে ডিলারের গুদামে ঢুকে পড়তে হয় বা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে কোথাও না কোথাও সমস্যা আছে।
তিনি বলেন, আমন ধান এখন দ্রুত বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রয়েছে। এখন প্রয়োজনীয় সার না দিলে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ধানে ফুল আসবে না। এতে ফলন কমে যাবে।
আমানের ফলন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমে গেলে কী হবে, সেটাও ভাবা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি। কারণ পরবর্তী বড় ধানের মৌসুম বোরোর ফসল কৃষকের ঘরে আসবে এপ্রিলের আগে নয়।
আসাদুজ্জামান বলেন, অতীতে বাংলাদেশে ধানের সংকটের প্রধান কারণ ছিল আমন মৌসুমে খরা বা পানির সংকট। তবে এখন পানির চেয়ে সারই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর একটা কারণ হলো উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড ধানের জাত। আগে এসব জাত মূলত বোরো মৌসুমে চাষ করা হতো। এখন আমনেও এসব জাত ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে। ফলে ধানের উৎপাদনের জন্য সার এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকার কমিটি গঠন করায় তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তার মতে, এই কমিটিতে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তা, সার ডিলার এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞদেরও রাখা উচিত।
ডিলার নিয়োগ ও সার বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে কোনো প্রভাব বা অনিয়ম হচ্ছে কি না, তা দ্রুত তদন্তেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই কৃষি অর্থনীতিবিদ।

