ইরানের অর্থনীতি কার্যত অচল করে দিতে দেশটিকে চাপে ফেলতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই পরিকল্পনা সফল করতে হলে ওয়াশিংটনের জন্য চীনের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পর চলতি সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ইরানকে যারা সহায়তা করে যাবে, তাদেরও বিশ্বজুড়ে একঘরে করা হবে।
চীনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সরাসরি বেইজিংকে এই কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন।
তবে চীন উল্টো ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বেইজিং জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বৈধ এবং নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের সম্ভাবনার মধ্যে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দশকের পর দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও ইরান আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার জটিল পথ ব্যবহার করে বাণিজ্য চালিয়ে গেছে।
সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডিলান লো এএফপিকে বলেন, ইরানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে হলে চীনের সহযোগিতা অবশ্যই প্রয়োজন হবে।
এর প্রধান কারণ, ইরানি তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা চীন। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের একটি বড় অংশ চীনা মুদ্রা ইউয়ানে হয়। ফলে এসব লেনদেনের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর আগে ইরান প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করত। এর বড় অংশের ক্রেতা ছিল চীন।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান পলিসি অ্যানালিসিসের গবেষক নিনো লেজহাভা বলেন, ইরানকে চাপে ফেলতে তেলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাতিয়ার।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল অনেকটাই বন্ধ থাকলেও চীন পুরোপুরি ইরানের তেল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। সাংহাইয়ের ফুদান ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সান দেগাং এএফপিকে জানিয়েছেন, মধ্য এশিয়ার সড়ক ও রেলপথ ব্যবহার করেও ইরানের তেল চীনে পৌঁছাতে পারে।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের তুলনায় চীনের ইরানি তেল কেনা কমেছে। তারপরও এই বাণিজ্য ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস।
লেজহাভার মতে, ইরানের জন্য বাণিজ্যের পথ খোলা রাখা এবং বিকল্প অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা চালু রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের কার্যকারিতা অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।
চীনের ভূমিকা যে গুরুত্বপূর্ণ, তা ওয়াশিংটনও জানে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা চীনা ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে কি না। জবাবে তিনি বলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে কেউ নেই।
তবে সোমবার ঘোষিত নতুন নিষেধাজ্ঞায় ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি সংগ্রহে সহায়তার অভিযোগে কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করা হলেও বড় চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এখনো ব্যবস্থা নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র।
ফুদান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সান দেগাং বলেন, চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তাদের কাছ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সহযোগিতা আশা করতে পারে না যুক্তরাষ্ট্র।
তার ভাষ্য, চীন ও ইরানের বাণিজ্য বৈধ এবং চীন তার অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে।
হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার প্রভাব চীনও ইতোমধ্যে অনুভব করছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দেশের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল ভোক্তা চাহিদা।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে চীনের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে। একইসঙ্গে এমন একটি জটিল সংঘাতে বেইজিং জড়িয়ে পড়বে, যেটিতে যুক্তরাষ্ট্রও ইতোমধ্যে কৌশলগতভাবে দুর্বল হয়েছে।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক চং জা ইয়ানের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞায় যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করার খুব বেশি কারণ চীনের নেই।
মঙ্গলবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইরানের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা সবসময় আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে হয়েছে। এতে বাইরের কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ বা বাধা দেওয়া উচিত নয়।
চং জা ইয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাপ সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে বেইজিং বেশ আত্মবিশ্বাসী।
ডিলান লোর মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য চীন নিজেদের সক্ষমতা অনেক বাড়িয়েছে।
তার ভাষ্য, নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় চীনেরও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার মতো নিজস্ব হাতিয়ার রয়েছে। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপেও এর প্রমাণ দেখা গেছে।
এএফপি জানায়, গত বছরজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য বিরোধ ক্রমেই বেড়েছিল। গত অক্টোবরে দুই দেশের প্রেসিডেন্টের বৈঠকের পর সেই বিরোধ কিছুটা কমলেও সম্পর্কের সমঝোতা এখনো ভঙ্গুর।
ইরানকে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে কার্যকরভাবে বিচ্ছিন্ন করতে শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাই যথেষ্ট নাও হতে পারে। চীনের মতো বড় বাণিজ্যিক অংশীদার যদি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যায়, তাহলে সেই অবরোধের কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যেতে পারে।
জাপানের সোকার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও পূর্ব এশিয়া বিশেষজ্ঞ লিম তাই ওয়েই বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে একটি সফল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অভিযান চালাতে হলে চীনকে সহযোগিতায় রাজি করানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কিছু প্রণোদনা দিতে হতে পারে।
তবে কোন পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করবে চীন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
নিনো লেজহাভার মতে, ইরানকে সমর্থন করতে গিয়ে চীনের যদি লাভের চাইতে ক্ষতি বেশি হয়, তখনই শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করার কথা ভাবতে পারে তারা।
অর্থাৎ, ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্র যতই কঠোর হোক, শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করতে পারে চীনের ওপর।
আর এখন পর্যন্ত বেইজিংয়ের অবস্থান স্পষ্ট, *ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়ার কোনো কারণ তারা দেখছে না।

