এর আগে গালফ অব মেক্সিকোকে গালফ অব আমেরিকা বানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার একই কায়দায় নির্বাহী আদেশে সই করে লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ করার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প।
আজ মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এই তথ্য জানিয়েছে।
কানাডার সঙ্গে চলমান উত্তেজনাপূর্ণ শুল্কযুদ্ধের মধ্যেই এই উদ্যোগ নিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ওভাল অফিসে গ্রেট লেকসের বড় বড় মানচিত্র পরিবেষ্টিত অবস্থায় ট্রাম্প ঘোষণা দেন, নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত ‘অবিলম্বে কার্যকর’ হবে।
তার আশেপাশে থাকা মানচিত্রগুলোর মধ্যে একটির শিরোনাম ছিল ‘মেকিং দ্য গ্রেট লেকস ইভেন গ্রেটার’। এটি ট্রাম্পের নির্বাচনী স্লোগান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (মাগা)’-এর সঙ্গে শব্দের মিল রেখে লেখা হয়েছে।
ওই মানচিত্রে লেক অন্টারিওর ওপর ‘লেক আমেরিকা’ লেখা ছিল।
ট্রাম্প বলেন, ‘লেক অব আমেরিকা’ নামটি নিয়ে তিনি অনেক দিন ধরেই ভাবছিলেন।
তিনি বলেন, ‘(এখন) আমাদের একটি উপসাগর আছে এবং একটি লেকও আছে। এখন শুধু একটি মহাসাগর দরকার। তাই হয়তো আমাদের আটলান্টিক এবং/অথবা প্রশান্ত মহাসাগরের নাম পরিবর্তন করতে হবে। হয়তো দুটিরই নাম বদলে দেব।’
যুক্তরাষ্ট্র সরকার ভৌগোলিক স্থান ও স্থাপনার নাম কীভাবে উল্লেখ করবে, সে বিষয়ে ট্রাম্পের ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে। তবে অন্য দেশগুলোকে একই নাম ব্যবহার করতে তিনি বাধ্য করতে পারেন না।
গত বছর একই ধরনের নির্বাহী আদেশে তিনি মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘গালফ অব আমেরিকা’ করেন। এ পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন মেক্সিকোর কর্মকর্তারা এবং তারা পুরোনো নামই ব্যবহার অব্যাহত রাখবেন বলে স্পষ্ট করেন।
পরে গুগল জানায়, তাদের মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীরা ‘গালফ অব আমেরিকা’ নামটি দেখবেন, আর মেক্সিকোর ব্যবহারকারীদের কাছে নামটি থাকবে গালফ অব মেক্সিকো।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর থেকেই নাম পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে কথা বলছিলেন ট্রাম্প।
সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে তিনি প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারের কানাডীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। জবাবে কানাডাও দ্রুত বিভিন্ন মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। কানাডা পিছু না হটলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।
মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, তিনি লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। কারণ, ‘আমরা আর অন্টারিওর সঙ্গে খুব বেশি ব্যবসা করব বলে আশা করছি না।’ যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষাপটেই তিনি এ মন্তব্য করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মেক্সিকোর পর কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্রের মোট বাণিজ্যের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ কানাডার সঙ্গে।
ট্রাম্পের এই ঘোষণায় বেশিক্ষণ নীরব থাকেননি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি।
সাবেক এই ব্যাংকার অবিলম্বে এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেন।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, লেক অন্টারিও নামটির উৎপত্তি ৪০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা—দুই দেশ প্রতিষ্ঠার আগে এ নামের প্রচলন ছিল।
তিনি বলেন, তার দেশ ‘চিরকাল’ এটিকে লেক অন্টারিও নামেই ডাকবে।
কার্নি লেখেন, ‘লেক অন্টারিও নামটি এসেছে ওয়েনডাট ভাষার “ওন্টারিইও” শব্দ থেকে, যার যথার্থ অর্থ, “হ্রদটি সুন্দর, হ্রদটি বড়।” আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্র বদলাচ্ছে। তাদের বাণিজ্যসম্পর্ক, পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ, জলাশয়ের নাম—সবকিছুই বদলাচ্ছে। কানাডার নারী-পুরুষও জানেন, কোনো কিছুকে তার সঠিক নামেই ডাকতে হয়। আর এই হ্রদের নাম লেক অন্টারিও—আজ এবং চিরকাল।’
ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকির কড়া সমালোচনা করে আলোচনায় এসেছেন অন্টারিও রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী (প্রিমিয়ার) ডগ ফোর্ড।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘কানাডীয়দের এবং বিশ্বের বাকি সবার কাছে এটি লেক অন্টারিও। এখন এবং চিরকাল।’
ট্রাম্পের নতুন নির্বাহী আদেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডাগ বারগাম ও ভৌগোলিক নামবিষয়ক বোর্ডকে ৩০ দিনের মধ্যে লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে ভৌগোলিক নামসংক্রান্ত তথ্যব্যবস্থা হালনাগাদ এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ‘লেক অন্টারিও’ নামের সব উল্লেখ মুছে ফেলার নির্দেশও রয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে নাম পরিবর্তন কীভাবে কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দিতে ভৌগোলিক নামবিষয়ক বোর্ডকে নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প।
ফলে সরকারি সংস্থাগুলোর মানচিত্র, চুক্তি, নথি ও যোগাযোগে ‘লেক অন্টারিও’র পরিবর্তে ‘লেক আমেরিকা’ লেখা হবে।
বৃহস্পতিবার পরে হোয়াইট হাউসের এক্স অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার পরিচালক বলেন, ইউএসজিএসের সব আনুষ্ঠানিক ইলেকট্রনিক নথিতে নাম পরিবর্তন ইতোমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মুদ্রিত নথিতেও এ পরিবর্তন আনা হবে।
নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প দাবি করেন, হ্রদটির ‘সবচেয়ে গভীর অংশ’ এবং এর পানির মোট আয়তনের বেশির ভাগ যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে হওয়ায় নাম পরিবর্তন সেই বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে। কানাডার অন্টারিও ও যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সীমানায় অবস্থিত এই জলাশয়কে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক অসাধারণ সম্পদ এবং জাতির ঐতিহ্যের অংশ’ বলে উল্লেখ করেন।
বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে ট্রাম্প বারবার বলেন, ‘বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কানাডার সঙ্গে আলোচনা করাই সবচেয়ে কঠিন।’
কানাডাকে ‘বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে’ বলে মত দেন ট্রাম্প। এর আগে তিনি বলেছিলেন, ভিন্ন দেশ হয়েও মার্কিন অঙ্গরাজ্যের মতো সুবিধা পেতে চায় কানাডা।
তিনি বলেন, ‘কানাডার কর্মকর্তারা আমাদের সঙ্গে খুব খারাপ আচরণ করেছেন। তারা খুবই নিকৃষ্ট ধরনের মানুষ।’
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাণিজ্য আলোচনা আপাতত স্থগিত রয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বুধবার বলেন, তিনি বর্তমানে কানাডীয় বাণিজ্য প্রতিনিধি ডমিনিক লেব্ল্যাঙ্কের সঙ্গে সক্রিয় কোনো আলোচনায় নেই।
সিবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গ্রিয়ার বলেন, ‘আমি বলব, এই মুহূর্তে আমাদের মধ্যে যোগাযোগের কোনো উন্মুক্ত মাধ্যম নেই। তবে (কানাডার) মন্ত্রী লেব্ল্যাঙ্কের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক অটুট রয়েছে। এখন আমার মনে হচ্ছে, কানাডা তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে।’

