রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আজ শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে বঙ্গভবনের দরবার হলে তাকে শপথবাক্য পাঠ করান স্পিকারের দায়িত্বে থাকা ব্যরিস্টার কায়সার কামাল।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির সভাপতিত্বে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের সময় মঞ্চে ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
শপথ অনুষ্ঠান শুরুর আগে বঙ্গভনের দরবার হলে রাষ্ট্রপতি প্রবেশ করার সময় উচ্চস্বরে আগমন বার্তা দেওয়া হয়। এর সঙ্গে সঙ্গে অর্কেস্ট্রার ঝংকারে বেজে ওঠে জাতীয় সংগীতের সুর। সেসময় প্রধানমন্ত্রীসহ অতিথিরা জাতীয় সংগীত শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে সম্মান জানান।
এরপর অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি রাষ্ট্রপতির কাছে অনুমতি চান। অনুমতি পাওয়ার পর পবিত্র কোরআন থেকে তিলওয়াত হয়।
এরপর শপথবাক্য পাঠ শেষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার হাতে থাকা ফোল্ডারের দুই পাশে দুটি কাগজে সই করেন। এর মধ্যে একটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সংরক্ষণ করবে অন্যটি রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সংগ্রহের জন্য।
এর মাধ্যমেই রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠান শেষ হয়। এরপর সবাইকে আপ্যায়ন পর্বে অংশ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
এর আগে, গতকাল বিকেলে জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন ক্ষমতাসীন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট এবং কর্নেল (অব.) অলি আহমদ ৮৮ ভোট পান।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবন বৃত্তান্ত
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলার কালীবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার বাবা ছিলেন তৎকালীন মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সাবেক সদস্য মির্জা রুহুল আমিন।
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে স্বৈরাচারী শাসক ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন তিনি বিএনপিতে যোগ দেন।
এক প্রতিবেদনে বাসস জানায়, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনীতিতে হাতেখড়ি ছাত্রজীবনে। মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকা পালন এবং এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন প্রবীণ এই রাজনীতিক।
৭৮ বছর বয়সী এই রাজনীতিক বর্তমান বিএনপি সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিবের দায়িত্বেও ছিলেন।
বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার আগে সিভিল সার্ভিসের শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য হিসেবে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি দায়িত্বও পালন করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে (ইপিএসইউ) যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় মির্জা ফখরুল সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন।
উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন তিনি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। এর আগে ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন তিনি।
বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় মির্জা ফখরুল কিছু সময়ের জন্য মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সঙ্গে যুক্ত হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে পা রাখেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম। এছাড়া ইউনেসকোর জাতীয় কমিশনেও কাজ করেন।
মূলধারার রাজনীতিতে যোগ দিতে ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। এর দুই বছর পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নিজের জন্মস্থান উত্তরাঞ্চলের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। এর কিছুদিন পর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপিতে যোগ দেন আলমগীর।
২০০১ সালের নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ওই নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।
২০১১ সালে তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া মির্জা ফখরুল ইসলামকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। পরে ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ তাকে মহাসচিবের স্থায়ী দায়িত্ব দেওয়া হয়।
১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর তিনিই সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দলটির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। মির্জা ফখরুলের মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণের সময়টিই ছিল বিএনপির ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনে ব্যাপক দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে পড়েন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
মহাসচিব হওয়ার আগে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। প্রথমে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং পরে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। দীর্ঘদিন দলের অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহ-সভাপতি ও পরে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বগুড়ার একটি আসন থেকে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
তবে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে মির্জা ফখরুল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। যদিও দলের অন্য পাঁচ সংসদ সদস্যকে সংসদে যোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তারা ২০২২ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই বছর দলীয় নির্দেশে তারাও পদত্যাগ করেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। পরে বেসরকারি বীমা কোম্পানিতে কাজ করেছেন। এই দম্পতির দুই মেয়ে। তারা দুজন শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত।
বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। ছোট মেয়ে ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।

