‘২৩ বছর আগের বাংলাদেশ আর এই বাংলাদেশ এক নয়’—ডারউইন টেস্টের আগের দিন নাজমুল হোসেন শান্ত যখন কথাটা বলেছিলেন, তখন হয়তো অনেকে মনে মনে হেসেছিলেন। কারণ, মাত্র মাস দেড়েক আগেই জিম্বাবুয়ের কাছে ইনিংস হারের ক্ষত, আর অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে প্রস্তুতি ম্যাচেই ৫৪ রানে অলআউটের তিক্ত স্মৃতি তখনো টাটকা। নিন্দুকেরা যখন লাল বলের ক্রিকেটে বাংলাদেশের পথচলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছিলেন, তখন ক্রিকেটপ্রেমীদের মনেও শঙ্কা ছিল—অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রথম টেস্টটি বাংলাদেশ কয় দিনে হারবে?
কিন্তু ডারউইন টেস্টের চার দিন শেষে শান্ত দেখিয়ে দিলেন, তার সেই আত্মবিশ্বাস বাতাসে ভেসে আসা কোনো কথা ছিল না। অসামান্য মাঠের লড়াইয়ে অবিস্মরণীয় জয়ে নেতৃত্ব দিয়ে শান্ত প্রমাণ করে দিলেন তার কথাই সত্যি। হ্যাঁ, বিদেশের মাটিতে ধার আর ধারাবাহিকতার ঘাটতি এখনো স্পষ্ট। তার পরও একটা সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই—সব সীমাবদ্ধতা ডিঙিয়ে বাংলাদেশ টেস্ট দল কিন্তু নিঃশব্দে সামনের দিকে এগোচ্ছে।
এই রূপান্তরের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে পেস আক্রমণের অভূতপূর্ব গভীরতা ও দৃষ্টিভঙ্গির বদল। একসময় ঘরের মাঠে স্পিন-ফাঁদ পেতে জয় খোঁজার যে রক্ষণাত্মক মানসিকতা ছিল, সেখান থেকে বের হয়ে বাংলাদেশ এখন ধারালো পেস শক্তির ওপর ভর করছে। বিদেশের মাটিতে বাউন্স ও সুইংকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সামর্থ্য তৈরি হয়েছে। বর্তমান টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের পেস আক্রমণের গভীরতা ও কার্যকারিতা সম্ভবত বিশ্বের সেরাদের কাতারেই জায়গা করে নেবে। সেরা বোলিং অস্ত্র নাহিদ রানা এবং আরেক গুরুত্বপূর্ণ পেসার শরিফুল ইসলামকে ছাড়াই অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়েছে দল; অথচ হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ কিংবা ইবাদত হোসেনদের মতো পেসাররা তাদের অভাব একটুও টের পেতে দেননি। পেসারদের মধ্যে উল্টো চলছে মধুর লড়াই—ফিট হয়ে স্কোয়াডে ফিরলেও পরের টেস্টে শরিফুলের একাদশে ঠাঁই পাওয়া একদম নিশ্চিত নয়।
বাংলাদেশের পেসারদের বৈচিত্র্যও চোখে পড়ার মতো। নাহিদ যেমন গতি আর বাউন্সে নাকাল করেন ব্যাটারদের, হাসান লাল বল হাতে বের করে নিয়ে আসেন সুইংয়ের মায়াবি বিভ্রম। অন্যদিকে ব্যাটার রিড করা, ফাঁদে ফেলা কিংবা যেকোনো সময় ব্রেক-থ্রু এনে দেওয়ায় তাসকিন দারুণ পারদর্শী। এই ধারালো পেস আক্রমণই মূলত বিদেশের মাটিতে প্রতিপক্ষের ২০টি উইকেট নেওয়ার আসল বিশ্বাস জোগাচ্ছে।
বোলিংয়ের পাশাপাশি টেস্ট খেলুড়ে দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের লোয়ার-মিডল অর্ডারের অবদানও এখন উপরের দিকেই থাকবে। শেষ সাড়ে তিন বছরে জেতা টেস্টগুলোতে ৬ থেকে ৮ নম্বর পজিশন থেকে ইনিংসে গড়ে ৩৫-এর বেশি রান এসেছে। বিশেষ করে মেহেদী হাসান মিরাজ কিংবা লিটন দাসের মতো ব্যাটাররা বিপদের মুখে ধৈর্য ধরে জুটি গড়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছেন। টপ-অর্ডার দ্রুত ভেঙে পড়ার পর একসময় যেখানে ইনিংস গুটিয়ে যাওয়া ছিল নিয়মিত দৃশ্য, সেখানে এখন লোয়ার-মিডল অর্ডার পাল্টা প্রতিরোধের পথ দেখাচ্ছে। গেম রিডিংয়ের দিক থেকেও এখন অনেক পরিণত বাংলাদেশ।
গত দুই বছরে জেতা ম্যাচগুলোতে দলের ৮ ও ৯ নম্বর ব্যাটারদের সম্মিলিত অবদানের হার ছিল মোট রানের প্রায় ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ। বৈশ্বিক টেস্ট ক্রিকেটের শীর্ষ দলগুলোর পরিসংখ্যানের ‘সঙ্গে’ যা রীতিমতো টেক্কা দেওয়ার মতো। প্রতিপক্ষের বোলারদের টেল-এন্ডারদের দ্রুত ছেঁটে ফেলার সুযোগ না দিয়ে রান বাড়িয়ে নেওয়ার এই সামর্থ্য ম্যাচের ফলাফলেও বড় প্রভাব ফেলছে।
অবশ্য এই অর্জনের উজ্জ্বল আলোর পাশাপাশি মুদ্রার অপর পিঠের আঁধারটাও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। টপ অর্ডারের প্রায়শই ব্যর্থতা, ব্যাটারদের মানসিকতার ঘাটতি কিংবা ধারাবাহিকতার অভাব এখনো বড় দুশ্চিন্তার জায়গা। পরের টেস্টেই হয়তো দল আবার বাজে খেলতে পারে, সামনেও পারফরম্যান্সে এমন ওঠা-নামা থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে তাতে এগিয়ে যাওয়ার মূল ছবিটা ভুল প্রমাণ হয় না।
টেস্ট দলের কাঠামোগত পরিবর্তনের গল্পটা শুরু হয়েছিল আরও আগে। মূলত স্পিন-নির্ভরতা কমিয়ে মুমিনুল হকের অধিনায়কত্বের সময়ই একাদশে পেসারদের প্রাধান্য দেওয়া শুরু হয়। যার হাতেনাতে ফল মিলেছিল ২০২২ সালে মাউন্ট মঙ্গানুইতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ে। মুমিনুলের পর টেস্ট দলের ভার এখন শান্তর কাঁধে। টেস্ট সংস্কৃতিকে গভীরভাবে লালন করা শান্ত সেই মানসিকতার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। মুমিনুলের সময়ে টেস্ট সংস্কৃতির যে পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছিল, শান্তর নেতৃত্বে তা পেয়েছে নতুন গতি, আত্মবিশ্বাস ও আধুনিক মাত্রা।
বাংলাদেশ এখনো প্রতিষ্ঠিত টেস্ট শক্তি হয়ে ওঠেনি—তবে ধুঁকতে থাকা সেই দিনগুলো পেছনে ফেলে শান্তরা যে সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সঠিক পথেই এগোচ্ছেন, সাম্প্রতিক জয় আর পেসারদের এই উত্থানই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

