তীব্র গরমে বাংলাদেশের শ্রমিকেরা বছরে মজুরি হারাচ্ছেন ৭৭ হাজার কোটি টাকার

নির্মাণশ্রমিক আব্দুর রহিমের গরমের হাত থেকে বাঁচার কোনো সুযোগ নেই। ঢাকায় খোলা আকাশের নিচে তাকে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়। গ্রীষ্মের তীব্র গরমে কাজ করতে করতে তিনি ঘামে ভিজে যান, জামা শরীরে লেগে থাকে। ক্লান্ত এই শ্রমিকের মাথার ওপর পাখা তো দূরের কথা, ছাদও নেই।

আব্দুর রহিম কাজ করছেন রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বরের আদর্শনগর এলাকায়। সাপ্তাহিক ছুটি বলতে কিছু নেই। কাজ করলে মজুরি পান। পুরো পরিবার তার একার আয়ের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় যৎসামান্য আয় নিয়মিত রাখতে প্রতিদিনই কাজ করেন। বিশ্রামের জন্য একটি দিন বাড়িতে থাকার অর্থ ওই দিনের মজুরি আর মিলবে না।

তারপরও এমন দিন আসে, যখন অসহনীয় গরমে শরীর আর কাজ করতে চায় না। দারিদ্র্য, ক্ষুধা—কোনো কিছুই মানতে চায় না আর শরীরটা; মনের জোর দিয়েও চালানো যায় না। তখন আর কাজ না করে ঘরে বসে থাকা ছাড়া কিছু করার থাকে না। সেইসঙ্গে বন্ধ থাকে সেদিনের আয়ও।

তীব্র গরমে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের লাখো শ্রমিকের একজন তিনি। প্রতি বছর শ্রমিকদের তাপজনিত মজুরি ক্ষতি অন্তত ৭৭ হাজার কোটি টাকা। যা জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশের সমপরিমাণ। এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে প্রতি বছর প্রায় আড়াইটি মেট্রোরেল প্রকল্পের অর্থায়ন সম্ভব। এর বাইরেও চিকিৎসা ব্যয় ও স্বাস্থ্যজনিত খরচের কারণে আর্থিক ক্ষতি তো রয়েছেই।

‘নো এসকেপিং দ্য হিট: হেলথ অ্যান্ড ইকোনমিক ইমপ্যাক্টস অব হিট স্ট্রেস অন ইনফরমাল ওয়ার্কার্স ইন আরবান বাংলাদেশ’ শীর্ষক সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই তথ্য।

এতে দেখা গেছে, বাইরে তীব্র গরমের মধ্যে কাজ করা শ্রমিকেরা বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭ কর্মদিবস হারান। আর ছাদের নিচে কাজ করা শ্রমিকেরা হারান ১৩ দশমিক ৫ দিন।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইআইইডি) এবং বেসরকারি সংস্থা অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে গবেষণাটি পরিচালনা করে।

গবেষকরা নির্মাণকাজ, রিকশা চালানো ও পোশাক তৈরিসহ বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত ঢাকার ১৭৫টি পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নেন। দেশের মোট শ্রমশক্তির ৮৫ শতাংশই এ ধরনের শ্রমিক।

সাক্ষাৎকার নেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে ১২২টি পরিবার নির্মাণকাজ, সড়ক নির্মাণ ও রিকশা চালানোর মতো বাইরের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। আর ৫৩টি পরিবার মূলত পোশাকশিল্পে ছাদের নিচে বসে করা কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

গবেষকেরা কাজ ও বিশ্রামের সময় শ্রমিকদের পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি দলীয় আলোচনা, সাক্ষাৎকার ও পারিবারিক কেস স্টাডি পরিচালনা করেন। তিনজন চিকিৎসকের একটি প্যানেল স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ফলাফল পর্যালোচনা করে।

জাতীয় অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বের করতে গবেষকেরা গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে জাতীয় শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য এবং বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রার তথ্য সমন্বয় করেন।

আয় ও স্বাস্থ্যে বড় ক্ষতি

গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমেই তীব্রতর তাপপ্রবাহ শুধু শ্রমিকদের আয়ই কমাচ্ছে না, তাদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ জীবিকাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দরিদ্র শ্রমজীবী পরিবারগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে। কারণ, তাদের জীবনযাপন দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল।

তাদের অনেকেই নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক ও পোশাকশ্রমিক। তীব্র গরমে কাজ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তাদের খুবই কম বা নেই বললেই চলে।

বাইরে ও ছাদের নিচে কাজ করা শ্রমিকেরা জানিয়েছেন, তীব্র গরমের কারণে তাদের বছরে যথাক্রমে ২৪ ও ১৪ দিন কাজ থেকে বিরত থাকতে হয়েছে।

জরিপে দেখা গেছে, এর ফলে বাইরে কাজ করা শ্রমিকেরা তাদের বার্ষিক আয়ের প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বা ১৯ হাজার টাকা হারিয়েছেন। আর ছাদের নিচে কাজ করা শ্রমিকেরা হারিয়েছেন ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বা ১২ হাজার টাকা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই আয় হারানো তাদের জীবনযাপনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। কারণ, এমনিতেই তাদের যে আয়, তা দিয়ে ঢাকা শহরে জীবনযাপন করা কঠিন।

তাছাড়া, প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা ২৩ শতাংশ উত্তরদাতা বারবার পানিশূন্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত কিডনি ক্ষতির উপসর্গের কথা জানিয়েছেন। গরমের মৌসুমে মানসিক চাপ দ্বিগুণ হয়েছে। শ্রমিকেরা মন খারাপ, উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজ, ঘুমের সমস্যা ও কাজে বেশি ভুল করার কথাও জানিয়েছেন।

রাজধানীর পল্লবী এলাকার পোশাকশ্রমিক রেহানা আক্তারের কথাই ধরা যাক। তিনি জানান, অনেক শ্রমিক কিডনির সমস্যায় ভুগলেও চাকরি হারানোর ভয়ে শারীরিক অসুস্থতার কথা গোপন রাখেন।

রেহানা বলেন, ‘গরমের সময় যে পরিমাণ পানি পান করা দরকার, আমরা ততটা পান করতে পারি না। বিশেষ করে কাজের সময় পানি কম পান করি। কারণ, পর্যাপ্ত পানি পান করলে বারবার টয়লেটে যেতে হয়। এতে কাজে সমস্যা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাসায় এসেও প্রচণ্ড গরমে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না।’

গবেষণায় দেখা গেছে, তাপপ্রবাহ দারিদ্র্যকে আরও গভীর করে তুলছে।

ঢাকায় জীবনযাত্রার উপযোগী মজুরি বছরে প্রায় ২ হাজার ৯৯৭ ডলার। কিন্তু বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের পরিবারগুলোর গড় আয় মাত্র ১ হাজার ৭৫৬ ডলার। ছাদের নিচে কাজ করা শ্রমিকদের গড় আয় ১ হাজার ৯৮৫ ডলার।

অর্থাৎ তাপজনিত ক্ষতি হিসাবের বাইরে রাখলেও তাদের আয় জীবনযাত্রার উপযোগী মজুরির চেয়ে ৩৪ থেকে ৪১ শতাংশ কম।

হারানো আয়ের হিসাব ধরলে তাদের উপার্জন যথাক্রমে ১ হাজার ৬০৭ ও ১ হাজার ৮৯৬ ডলারে নেমে আসে। ফলে ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ ও ৩৬ দশমিক ৮ শতাংশে।

করণীয় কী?

আইআইইডির জলবায়ু সহনশীলতা, অর্থায়ন এবং ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসানবিষয়ক পরিচালক ঋতু ভরদ্বাজ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, এসব শ্রমিকের ক্ষেত্রে কাজের পালা শেষ হলেও তাপের সংস্পর্শ শেষ হয় না।

তিনি বলেন, কর্মস্থলের গরম থেকে বের হয়ে তারা বাসায় ফেরেন। কিন্তু, সেখানেও থাকেন টিনের ছাদের নিচে এবং থামার ওপর থাকে কেবল একটি বৈদ্যুতিক পাখা। তারপরও ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যায়। ফলে সারাদিনের কর্মক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফিরেও যথাযথ বিশ্রামের সুযোগ তারা খুব কমই পান।

ছাদের নিচে কাজ করলেও এই শ্রমিকদের রেহাই মেলে না। পোশাকশ্রমিকেরা বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের প্রায় সমান হারে তাপজনিত অবসাদে ভোগার কথা জানিয়েছেন। এর পরিণতির মধ্যে রয়েছে মজুরি হারানো, কিডনির ক্ষতি ও ঘুমের ঘাটতি। কিন্তু এর প্রায় কিছুই সরকারি নথিতে উঠে আসে না বলে জানান ঋতু।

গবেষকেরা বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে তাপজনিত সহায়তা যুক্ত করার সুপারিশ করেছেন। এর মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরের ভিত্তিতে লক্ষ্যভুক্ত শ্রমিকদের মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে প্রতিদিন সামান্য পরিমাণ নগদ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। এটা করা হলে রেকর্ড ক্ষতির বছরেও ১০ কোটি ডলারের কম খরচ হবে, যা তীব্র গরমের কারণে হওয়া অর্থনৈতিক ক্ষতির তুলনায় অনেক কম।

শহরের অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের কাছে সরকারি স্বাস্থ্য কর্মসূচি পর্যাপ্তভাবে পৌঁছায় না বলে তারা মৌসুমি ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্য শিবিরের প্রস্তাবও করেছেন।

কর্মক্ষেত্রে তাপ থেকে সুরক্ষার জন্য বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে গবেষণাটির সুপারিশমালায়। বাংলাদেশের শ্রম আইনে নিরাপদ তাপমাত্রার কোনো সীমা নির্ধারণ করা হয়নি এবং হিটস্ট্রোক বা কিডনি রোগকে ক্ষতিপূরণ যোগ্য পেশাগত রোগ হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, তাপপ্রবাহ মোকাবিলার সক্ষমতাকে শুধু কল্যাণমূলক বিষয় মনে করা বন্ধ করতে হবে। তীব্র গরমে পানীয় জল, ছায়া, বায়ু চলাচল ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের জন্য শ্রমবিধিতে কার্যকর ও বাধ্যতামূলক মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। একইসঙ্গে তাপজনিত অসুস্থতাকে পেশাগত ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

তিনি বলেন, তীব্র গরমের কারণে অনানুষ্ঠানিক খাতের ও দৈনিক মজুরির শ্রমিকদের জীবিকা ব্যাহত হলে জলবায়ু-সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় তাদের সাময়িক আয় সহায়তা দেওয়া উচিত।

এই গবেষণার সঙ্গে ঋতু ভরদ্বাজ ছাড়াও যুক্ত ছিলেন এন কার্তিকেয়ান, স্বাতী চালিহা, শাকিরুল ইসলাম ও উর্মি জাহান তান্নি। গবেষণার ফলাফল আজ বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার কথা রয়েছে।

Related Articles

Latest Posts