বাংলা গানের ইতিহাসে কিছু নাম কখনো হারিয়ে যাবে না। সময় চলে যায়, প্রজন্ম বদলে যায়, গানের রুচিতেও আসে পরিবর্তন, তবু কিছু সুর মানুষের মনে থেকে যায়। তেমনই এক অনন্য নাম আলাউদ্দিন আলী। সুরকার, সংগীত পরিচালক ও গীতিকার হিসেবে তিনি বাংলা গানকে দিয়েছেন অসংখ্য কালজয়ী সৃষ্টি। বিশেষ করে বাংলা চলচ্চিত্রের গানে তার অবদান অনস্বীকার্য।
২০২০ সালের ৯ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন এই কিংবদন্তি। তার মৃত্যুর ছয় বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তার সৃষ্ট গানগুলো এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তার সুরে বেঁচে আছে ভালোবাসা, বিরহ, আনন্দ, দেশপ্রেম ও জীবনের নানা গল্প।
আলাউদ্দিন আলীর সুর করা গানের তালিকা যেন বাংলা গানের এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। তার সুরে শ্রোতারা পেয়েছেন, ‘একবার যদি কেউ ভালোবাসতো’, ‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়’, ‘ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয়’, ‘দুঃখ ভালোবেসে প্রেমের খেলা খেলতে হয়’, ‘এমনও তো প্রেম হয় চোখের জলে কথা কয়’ এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গান।
শুধু প্রেম-বিরহের গান নয়, দেশপ্রেমের গানেও তার সুর পেয়েছে অন্যরকম আবেগ। ‘সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি ও আমার বাংলাদেশ’ কিংবা ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ’ এই গানগুলো মানুষের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
আবার লোকজ আবহের গানেও ছিল তার অসাধারণ দক্ষতা। ‘বন্ধু তিন দিন তোর বাড়ি গেলাম দেখা পাইলাম না’, ‘আছেন আমার মোক্তার, আছেন আমার ব্যারিস্টার’, ‘সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী হয়ে কারও ঘরনি’ এ ধরনের গান তার সুরের বৈচিত্র্যেরই পরিচয় দেয়।
তার সুরে আরও জনপ্রিয় হয়েছে ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও’, ‘যেটুকু সময় তুমি থাকো কাছে মনে হয় এ দেহে প্রাণ আছে’, ‘শত জনমের স্বপ্ন তুমি আমার জীবনে এলে’, ‘কেউ কোনো দিন আমারে তো কথা দিল না’, ‘পারি না ভুলে যেতে, স্মৃতিরা মালা গেঁথে’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো’, ‘আমার মনের ভেতর অনেক জ্বালা আগুন হইয়া জ্বলে’, ‘হায়রে কপাল মন্দ চোখ থাকিতে অন্ধ’ এর মতো গান।
গানের কথা, সুর ও মানুষের অনুভূতির মধ্যে যে সেতু তৈরি হয়, আলাউদ্দিন আলী সেই সেতু তৈরির কাজে ছিলেন অসাধারণ দক্ষ।
বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীতে আলাউদ্দিন আলীর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। সত্তর ও আশির দশক থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়েও তার সুর ও সংগীত পরিচালনায় অসংখ্য চলচ্চিত্রের গান দর্শক-শ্রোতার মনে জায়গা করে নেয়।
‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ (১৯৭৯), ‘সুন্দরী’ (১৯৮০), ‘কসাই’ এবং ‘যোগাযোগ’ চলচ্চিত্রের জন্য ১৯৮৮ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
এর আগে ১৯৮৫ সালে শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবেও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি।
সব মিলিয়ে আলাউদ্দিন আলী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন আটবার, যা বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীতে তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি।
আলাউদ্দিন আলীর প্রতিভা শুধু সুর করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি গান লিখেছেন, সুর করেছেন এবং সংগীত পরিচালনাও করেছেন।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বেতার ও টেলিভিশনের জন্যও তিনি তৈরি করেছেন অসংখ্য গান। তার কর্মজীবনের বিস্তার ছিল এতটাই বড় যে বিভিন্ন মাধ্যমে তার গানের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়।
এত বিপুলসংখ্যক গান তৈরি করেও তার সৃষ্টির বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, গানগুলো সহজে মানুষের মনে পৌঁছে যেত।
তিনি কখনো প্রেমের কথা বলেছেন, কখনো বিরহের। কখনো বলেছেন জীবনের কষ্টের কথা, কখনো দেশের কথা। আবার কখনো লোকজ জীবনের সহজ-সরল আবেগকে তুলে এনেছেন সুরে।
আলাউদ্দিন আলী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫২ সালের ২৪ ডিসেম্বর, মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামে।
গ্রামবাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে তার শৈশবের যে সম্পর্ক, পরবর্তী সময়ে সংগীতেও তার নানা ছাপ পাওয়া গেছে। লোকজ সুর ও আধুনিক সংগীতের মেলবন্ধনে তিনি তৈরি করেছিলেন নিজের আলাদা একটি ভাষা।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি নিজেকে কেবল একজন সফল সুরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেননি; হয়ে উঠেছিলেন বাংলা গানের স্বতন্ত্র এক পরিচয়।
একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো এটাই, তিনি চলে যাওয়ার পরও তার সৃষ্টি মানুষের জীবনের অংশ হয়ে থাকে। তার সুরে মানুষ আজও ভালোবাসে, কাঁদে, স্মৃতি মনে করে, দেশকে অনুভব করে। ২০২০ সালের ৯ আগস্ট তিনি চলে গেছেন। কিন্তু তার সুরের মৃত্যু হয়নি।
রেডিওতে কোনো পুরোনো গান বেজে উঠলে, টেলিভিশনে পুরোনো কোনো চলচ্চিত্রের দৃশ্য এলে কিংবা হঠাৎ কারও মুখে তার সুর করা কোনো গান শুনলে আলাউদ্দিন আলীর নাম আবার ফিরে আসে।
সময়ের স্রোতে মানুষ হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ তাদের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সময়কে অতিক্রম করেন। আলাউদ্দিন আলী তেমনই একজন।

