৪ দফা সময় বাড়িয়েও আয়কর রিটার্ন জমা পড়েছে মাত্র ৩৮ শতাংশ

আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময়সীমা ৪ দফা বাড়িয়ে মার্চ পর্যন্ত করার পরও আশানুরূপ হয়নি ফলাফল।

কোভিড মহামারির পরে যখন দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, সেই ২০২১-২২ অর্থবছর বাদ দিলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রিটার্ন জমা পড়েছে গত প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।

ব্যক্তি ও কোম্পানি মিলিয়ে মাত্র ৩৮ শতাংশ নিবন্ধিত করদাতা আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন। করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) সনদ নেওয়ার সংখ্যা বাড়লেও কর পরিপালনে (ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স) স্থায়ী ব্যবধানের চিত্র সামনে এসেছে।

কর বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়িক নেতারা মনে করছেন, দুটি কারণে অনেক যোগ্য করদাতা করজালের বাইরে রয়ে গেছেন। কারণগুলো হলো—অসংখ্য নিষ্ক্রিয় নিবন্ধন থাকা পুরোনো ও স্ফীত টিআইএন তথ্যভাণ্ডার এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগ।

কর পরিপালন বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নতুন আয়কর আইনের আওতায় সারা বছর রিটার্ন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু, আইন প্রয়োগ জোরদার ও আগেভাগে রিটার্ন জমাদানকারীদের জন্য সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ কর রেয়াত ঘোষণা করেছে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, এসব পদক্ষেপ কর-অনুগত্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনবে কি না, তা সময়ই বলে।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত টিআইএন নেওয়া ব্যক্তি ও কোম্পানির সংখ্যা ১১ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছেছে, এক বছর আগে ছিল ১ কোটি ১৭ লাখ। কিন্তু রিটার্ন জমা পড়েছে মাত্র ৪৯ লাখ ৫৫ হাজার।

তবে আয়কর আদায় আগের বছরের ১৩ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা আয়কর আদায় হয়েছে। আগের অর্থবছরে ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা।

এই প্রবণতাকে বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করছেন, রাজস্ব আহরণ এখনো মূলত উৎসে কর কর্তন বা আদায় ও আগাম করের ওপর নির্ভরশীল; স্বতঃস্ফূর্ত কর-অনুগত্যের ওপর নয়।

করপোরেট ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ১ লাখ ৬০ হাজার করপোরেট টিআইএন সনদের বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র ৪২ হাজার প্রতিষ্ঠান রিটার্ন জমা দিয়েছে। আগের বছরে এই সংখ্যা ছিল ৩৯ হাজার ৬৫৯।

সূত্র অনুসারে, মোট কর রাজস্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে করপোরেট আয়কর থেকে। তবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) তথ্য বলছে, এই খাত থেকে আদায় জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৮ শতাংশ, যা সমমানের অর্থনীতির প্রায় অর্ধেক এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের কয়েকটি ছোট দেশের তুলনায় কম।

এই ঘাটতির কারণে সরকারকে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), শুল্ক ও ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। আর শেষ পর্যন্ত এই চাপ এসে পড়ে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে।

এই অসামঞ্জস্যের বড় কারণ হিসেবে পুরোনো তথ্যভাণ্ডারকে দায়ী করেছেন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া।

কামরান বলেন, করযোগ্য আয় থাকার কারণে নয়, বরং জমি কেনা, সম্পত্তি নিবন্ধন, ব্যাংক হিসাব খোলা, ক্রেডিট কার্ড নেওয়া বা ঋণ পাওয়ার জন্য অনেককে টিআইএন নিতে হয়েছে। আবার অনেক টিআইএন এমন ব্যক্তিদের নামে রয়েছে, যারা মারা গেছেন, দেশ ছেড়েছেন বা নিষ্ক্রিয়। কিন্তু তথ্যভাণ্ডারে এখনো তাদের নাম রয়ে গেছে।

‘তথ্যভাণ্ডার নিয়মিত হালনাগাদ করে নিষ্ক্রিয় টিআইএন বাদ দেওয়া উচিত। তাহলে দেশের সক্রিয় করদাতার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে,’ শনিবার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন তিনি।

তবে কোনটি অগ্রাধিকার পাবে তা নিয়ে কামরান ও স্নেহাশীষের মতপার্থক্য রয়েছে।

কামরান বলেন, রিটার্ন জমা দেওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও প্রকৃত কর পরিপালনের চিত্র পুরোপুরি তুলে ধরে না। কারণ অনেক রিটার্নে কর পরিশোধের দায় থাকে না।

তার মতে, সক্রিয় করদাতার সংখ্যা বাড়ানোই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তাছাড়া ‘কর-অনুগত বিদ্যমান করদাতাদের ওপরই চাপ বাড়তে থাকবে।’

স্নেহাশীষ মনে করেন, শুধু তথ্যভাণ্ডার হালনাগাদ করে বিপুল সংখ্যক যোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে করজালের আওতায় আনা যাবে না। প্রকৃত সমাধান হলো বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা। বিশেষ করে আয়কর আইনের ২৬৪ ধারায় বাধ্যতামূলক রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (পিএসআর) সংক্রান্ত বিধান বাস্তবায়ন করা।

যেখানে আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক, সেখানে ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সময় সিটি করপোরেশন, বড় অঙ্কের মেয়াদি আমানত গ্রহণ বা ঋণপত্র (এলসি) খোলার সময় ব্যাংক এবং সদস্যপদ দেওয়ার ক্ষেত্রে চেম্বারগুলোকে পিএসআর জমা নিশ্চিত করতে হবে।

‘এনবিআরকে প্রথমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। এরপর বিদ্যমান বিধান কার্যকরে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে,’ বলেন তিনি।

সারা বছর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ এবং আগেভাগে রিটার্ন জমা দিলে প্রণোদনা কর-অনুগত্যে বড় পরিবর্তন আনবে কি না—সে ব্যাপারে কামরান ও স্নেহাশীষ দুজনই সন্দিহান।

স্নেহাশীষের ভাষ্য, ‘যারা আগে থেকেই রিটার্ন দেন, তারা ভবিষ্যতেও দেবেন।’

‘প্রণোদনা কিছু ক্ষুদ্র করদাতাকে উৎসাহিত করতে পারে, তবে নিয়মিত রিটার্ন না দেওয়া ব্যক্তি বা বড় করদাতাদের উৎসাহিত হওয়ার সম্ভাবনা কম।’

কামরানও এতে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, পুরোপুরি ডিজিটাল কর প্রশাসন এবং আরও কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া করজাল সম্প্রসারিত হলেও ধীরগতি থাকবে।

এনবিআরের কর জরিপ ও পরিদর্শন বিভাগের সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, রিটার্ন জমার নিম্নমুখী হারকে ব্যাপক কর ফাঁকির প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। টিআইএন তথ্যভাণ্ডারের দুর্বলতা নিয়ে স্নেহাশীষ ও কামরানের উদ্বেগের সঙ্গেও তিনি একমত পোষণ করেন।

তিনি বলেন, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক টিআইএন এমন ব্যক্তিদের নামে রয়েছে, যারা মারা গেছেন। কিন্তু তাদের তথ্য এখনো বাদ দেওয়া হয়নি। আবার অনেকে শুধু ক্রেডিট কার্ড বা ব্যাংক ঋণের জন্য টিআইএন নিয়েছেন, যাদের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতাই ছিল না।

রফিকুল বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু করদাতা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন, রিটার্ন জমার হার কমে যাওয়ার এটি আরেকটি কারণ।

তিনি আরও বলেন, প্রশাসনিক অভিযানের মাধ্যমে হাজারো শিক্ষক ও অন্যান্য পেশাজীবীকে করজালের আওতায় আনা হয়েছিল। তবে তাদের অনেকেই এখন আর রিটার্ন জমা দিচ্ছেন না।

নতুন আয়কর আইনের আওতায় এখন কর অফিসগুলো একইসঙ্গে রিটার্ন জমার নোটিশ দেওয়ার পাশাপাশি রিটার্ন জমা না দিলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করতে পারবে।

রফিকুল আশা প্রকাশ করেন, এনবিআরের নতুন উদ্যোগে আগামী বছরগুলোতে নিবন্ধিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রিটার্ন দিতে উৎসাহিত হবে।

Related Articles

Latest Posts