দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ট্রান্সকম গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রায় ১২০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। তবে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়ে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে শেয়ার জালিয়াতি ও সম্পদ আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগও নতুন করে সামনে এসেছে।
ভ্যাট ফাঁকির নেপথ্য কৌশল
তদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, দক্ষিণ কমলাপুরের ঠিকানায় ‘ট্রান্সকম লিমিটেড’ নামে ভ্যাট নিবন্ধন নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। ভ্যাট গোয়েন্দাদের একটি দল ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিরীক্ষা করে ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ট্রান্সকম গ্রুপ তাদের হিসাবপত্রে ‘ম্যানেজমেন্ট এক্সপেন্স’ নামে একটি খাত ব্যবহার করেছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, এটি কোনো ব্যয়ের খাত নয়, বরং এখানে আয়ের অর্থ গোপন করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় কারচুপি ধরা পড়েছে ভ্যাট হার পরিবর্তনে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার অজুহাতে প্রতিষ্ঠানটি কৌশলে তাদের ভ্যাট নিবন্ধন সংশোধন করে। এর ফলে যেখানে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দেওয়ার কথা, সেখানে তারা মাত্র ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট জমা দিতে শুরু করে। এই কৌশলের কারণে সরকারের সুদসহ রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এনবিআরের দাবি অনুযায়ী, সঠিক হার (১৫ শতাংশ) অনুসরণ করলে ট্রান্সকমকে ১২০ কোটি ৩০ লাখ টাকার বেশি ভ্যাট প্রদান করতে হতো।
এনবিআরের দীর্ঘসূত্রতা ও গাফিলতি
তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর এক বছর পার হলেও বকেয়া আদায়ে কার্যকর কোনো অগ্রগতি হয়নি। নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল ট্রান্সকমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর থেকে ভ্যাট নীতি বিভাগ ও তদন্ত অধিদপ্তরের মধ্যে দীর্ঘ সাত মাস ধরে কেবল চিঠিপত্র চালাচালি হয়েছে। ভ্যাট নিরীক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুহম্মদ জাকির হোসেন এনবিআরের নীতি বিভাগের কাছে এই ভ্যাট হারের বিষয়ে নির্দেশনা চেয়ে একাধিকবার চিঠি দিলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। এই কালক্ষেপণের ফলে বড় অঙ্কের এই রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ট্রান্সকমের আত্মপক্ষ সমর্থন ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য
ট্রান্সকম গ্রুপ অবশ্য ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, অডিট ফার্মের হিসাবে ‘ম্যানেজমেন্ট এক্সপেন্স’ বলা হলেও এটি মূলত ‘আইটি সাপোর্ট সার্ভিস’, যা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার আওতায় পড়ে। এই যুক্তিতে তারা ৫ শতাংশ হারেই ভ্যাট পরিশোধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এদিকে ভ্যাট ফাঁকির বিষয়ে ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমানের মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো সাড়া দেননি এবং পরিচালক (করপোরেট ফাইন্যান্স) আব্দুল্লাহ আল মামুন মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, এনবিআরের নীতি বিভাগের কর্মকর্তা মো. আজিজুর রহমান জানিয়েছেন, বিষয়টি ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে অন্যান্য গুরুতর অভিযোগ
ভ্যাট ফাঁকির তদন্তের পাশাপাশি ট্রান্সকম গ্রুপের অভ্যন্তরীণ জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর তথ্যও উঠে এসেছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আরজেএসসিতে জমা দেওয়া সিমিন রহমানের শেয়ার সংক্রান্ত নথিপত্র ভুয়া। এমনকি ২০২০ সালে জমা দেওয়া স্ট্যাম্প পেপারটি মূলত ২০২৩ সালে তৈরি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া সরকারি দপ্তরে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে নথিপত্র জমা দেওয়ার মতো অস্বাভাবিক ঘটনাও ঘটেছে।
অভিযোগের তালিকায় আরও রয়েছে ট্রান্সকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা লতিফুর রহমানের একমাত্র ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমানের মৃত্যুর রহস্য এবং শেয়ার জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পদ আত্মসাতের চেষ্টা। যদিও শেয়ার জালিয়াতি মামলায় সিমিন রহমানসহ অন্য আসামিরা আদালত থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন, তবে জালিয়াতির এই বিতর্কগুলো এখনো জনমনে ও সংশ্লিষ্ট মহলে অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
আইনের ফাঁক গলে এই বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকি এবং মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। নতুবা বিশাল অঙ্কের এই রাষ্ট্রীয় রাজস্ব চিরতরে হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

