ফ্রিল্যান্সিং খাতে বিটোপিয়ার বাটপারির শেষ কোথায়?

দেশের ফ্রিল্যান্সিং অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত প্রতিষ্ঠানের নাম বিটোপিয়া। আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ফাইবারে ভুয়া অর্ডার দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রিল্যান্সারদের র‍্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত করা, কর্মীদের পাসপোর্ট জমা রেখে তাদের নামে ফাইবার অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, কর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ, মামলা দিয়ে হয়রানি এবং বিভিন্ন অনৈতিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি এসব অভিযোগের বেশিরভাগই অস্বীকার করেছে, তবুও একের পর এক অভিযোগ এবং বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্যের কারণে বিষয়টি এখন দেশের প্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটির অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

পুরো বিতর্কের সূত্রপাত হয় ফ্রিল্যান্সার এম এন নাহিদ প্রকাশিত একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে। ওই ভিডিওতে তিনি অভিযোগ করেন, বিটোপিয়া পরিকল্পিতভাবে তার ফাইবার গিগে ভুয়া অর্ডার দেয় এবং পরবর্তীতে সেই অর্ডারগুলো বাতিল করে। তার দাবি, ফাইবারের অ্যালগরিদম অনুযায়ী একাধিক অর্ডার বাতিল হওয়ায় তার গিগের র‍্যাংক উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে যায় এবং তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েন। নাহিদ আরও দাবি করেন, তাকে দেওয়া অর্ডারের সঙ্গে যুক্ত একটি ফিগমা ফাইলের মালিকানা ও সম্পাদনার তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি বিটোপিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছেন।

অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসার পর বিটোপিয়া তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং বিষয়টি থানায় গড়ায়। পরে বিটোপিয়া একটি ভিডিও প্রকাশ করে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির দাবি ছিল, নাহিদকে দেওয়া ফিগমা ফাইলটি তাদের অন্য এক ক্লায়েন্টের কাজ ছিল, যা ভুলবশত ‘এনিওয়ান ক্যান ভিউ’ অনুমতিতে শেয়ার করা হয়েছিল। একই ক্লায়েন্ট তাদের বিরুদ্ধেও ভুয়া অর্ডার করেছিল বলেও দাবি করে প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীতে এম এন নাহিদও একটি ভিডিওতে জানান, আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হয়েছে এবং ভুল বোঝাবুঝির ব্যাখ্যা তিনি গ্রহণ করেছেন।

তবে দুই পক্ষ সমঝোতার কথা জানালেও বিতর্ক থামেনি। প্রযুক্তি কমিউনিটির অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, যদি বিষয়টি সত্যিই ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকে, তাহলে শুরুতেই বিটোপিয়া তাদের ব্যাখ্যা প্রকাশ করেনি কেন। আবার ভিডিওতে ফাইবারের তথ্য সরাসরি রিফ্রেশ না করে স্থিরভাবে দেখানো হয়েছে কেন, সেটিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকের মতে, ক্লায়েন্টভিত্তিক সীমিত অনুমতির পরিবর্তে ফিগমা ফাইল ‘এনিওয়ান ক্যান ভিউ’ অবস্থায় রাখা কেন হয়েছিল, সেই প্রশ্নেরও সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি। যদিও এসব প্রশ্নের পক্ষে এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।

বিতর্ক আরও গভীর হয়, যখন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটোপিয়ার এক সাবেক কর্মীর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন শাকের আদনান। সেখানে ওই সাবেক কর্মী দাবি করেন, প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রিল্যান্সারদের র‍্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত করতে ভুয়া অর্ডারের কৌশল ব্যবহার করা হতো। এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। তবে এই দাবিরও স্বাধীন বা সরকারি কোনো যাচাই এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

এদিকে নাহিদের অভিযোগ সামনে আসার পর আরও অনেক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিটোপিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ প্রকাশ করতে শুরু করেন। তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি একাধিক ফাইবার অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে, কর্মীদের পাসপোর্ট দিয়ে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে সেই অ্যাকাউন্টের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রাখে, চাকরি শেষে অ্যাকাউন্ট কর্মীদের কাছে হস্তান্তর করে না এবং নতুন চাকরিতে যোগ দিতে চাইলে পুরোনো অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে চাপ দেয়। এছাড়া কম বেতন দেওয়া, সময়মতো বেতন পরিশোধ না করা, কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করা এবং কর্মীদের সঙ্গে অমানবিক আচরণের অভিযোগও বিভিন্ন পোস্টে উঠে এসেছে।

বিভিন্ন সূত্রের দাবি, বর্তমানে বিটোপিয়া গ্রুপের অধীনে বিটোপিয়া লিমিটেড, সফটভেন্স, স্পার্কটেক এজেন্সি, এসএম টেকনোলজি, জেভিএআই, জেনেক্সক্লাউড, ব্যাকবেঞ্চার স্টুডিও, স্কেলআপ, বিডিকলিং, পালসগ্রিড, বিডিকলিং এন্টারপ্রাইজ, ফায়ার এআই, পিক্সেলোরা স্টুডিও, জেনকোরসহ মোট ২২টি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

কর্মীদের পাসপোর্ট জমা নেওয়ার অভিযোগ নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। অনেকের দাবি, বিটোপিয়ায় চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় কর্মীদের পাসপোর্ট জমা দিতে হয় এবং সেই পাসপোর্ট ব্যবহার করে ফাইবার অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেই অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করলেও কর্মীরা তার ন্যায্য সুবিধা পান না। এ বিষয়ে মোহাব্বত জান লিখেছেন, একটি কোম্পানি যদি কর্মীর পাসপোর্ট ব্যবহার করে ফাইবার অ্যাকাউন্ট খুলে সেটি চাকরি শেষে ফিরিয়ে না দেয় কিংবা নতুন চাকরিতে যোগ দিতে চাইলে আগের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে বাধ্য করে, তাহলে সেটিকে কোনোভাবেই স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ বলা যায় না। অন্যদিকে এমডি ইমরুল ইসলাম প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশের আর কোনো খাতে চাকরি করতে পাসপোর্ট জমা দিতে হয় কি না এবং যদি অভিযোগগুলো সত্য হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন।

এ বিষয়ে ফেসবুকে একটি দীর্ঘ বিশ্লেষণধর্মী পোস্ট লিখেছেন শামসুদ্দিন চৌধুরী দেলওয়ার। তিনি বলেন, এম এন নাহিদের মূল অভিযোগ এবং পরে ওঠা অন্যান্য অভিযোগ একসঙ্গে মিশিয়ে ফেললে প্রকৃত ঘটনা আড়ালে চলে যেতে পারে। তার মতে, নাহিদ ও বিটোপিয়ার মধ্যকার বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে শেষ হলেও কর্মীদের পাসপোর্ট, একাধিক ফাইবার অ্যাকাউন্ট, ভুয়া অর্ডার বা অন্যান্য অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগগুলো আলাদাভাবে প্রমাণসহ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, শুধু ‘ওপেন সিক্রেট’ বলে আলোচনা না করে অভিযোগের পক্ষে শক্ত প্রমাণ সংগ্রহ করে ফাইবার কর্তৃপক্ষ, শ্রম আইন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কিংবা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা উচিত।

বিটোপিয়ার ব্যাখ্যামূলক ভিডিও প্রকাশের পর মাসুম মাহদি নাহিদও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ভিডিওতে ফাইবারের পেজ সরাসরি রিলোড করে দেখানো হয়নি। তার মতে, আগে থেকেই তথ্য পরিবর্তন করে ভিডিও ধারণ করা সম্ভব, ফলে ভিডিওটি অভিযোগ খণ্ডনের জন্য যথেষ্ট নয়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিটোপিয়া গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করার বিষয়টি ইতোমধ্যে সমাধান করা হয়েছে। অন্যদিকে বিটোপিয়া গ্রুপের চেয়ারপারসন সাবিনা আক্তার বলেন, তাদের মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠানেরও কিছু ভুল ছিল। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এমন ভুল আর হবে না। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অন্যান্য অভিযোগ, যেমন ভুয়া অর্ডার, কর্মীদের পাসপোর্ট ব্যবহার করে ফাইবার অ্যাকাউন্ট পরিচালনা বা একাধিক ফাইবার অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তিনি আলাদাভাবে কোনো মন্তব্য করেননি।

ফ্রিল্যান্সিং খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু কয়েকজন ফ্রিল্যান্সারের ক্ষতির বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতের আন্তর্জাতিক সুনাম ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আবার অভিযোগগুলো প্রমাণ ছাড়া প্রচারিত হলে সেটিও একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই পুরো বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন প্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটির অনেকেই।

Related Articles

Latest Posts