গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট: স্থবির শিল্পকারখানা, চরম ভোগান্তিতে জনজীবন

বাংলাদেশে চলমান গ্যাস সংকট এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। গ্যাসের অভাবে অনেক কারখানায় উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও কোথাও উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এমনকি অনেক বাসাবাড়িতেও রান্নার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।

গ্যাস সংকটের প্রভাবে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও আরও খারাপ হয়েছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সোমবার দিনের বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি ছিল। এতে সারা দেশে লোডশেডিংয়ের সময় ও পরিধি বাড়াতে হয়েছে।

গ্যাসের সংকটের কারণে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও পর্যাপ্ত গ্যাস পৌঁছাচ্ছে না। সারা দেশের স্টেশন মালিকরা জানিয়েছেন, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে গ্যাসের চাপ থাকে সাত থেকে আট পিএসআই, সেখানে এখন তা নেমে এসেছে শূন্য থেকে এক পিএসআইয়ে। ফলে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে, কিন্তু গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে খুবই ধীরগতিতে।

গতকাল দিন-রাতজুড়ে অধিকাংশ সিএনজি স্টেশনেই গাড়ি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। প্রতিবেদকেরা তেজগাঁও এলাকার অন্তত সাতটি স্টেশন ঘুরে প্রতিটিতেই একই চিত্র দেখেছেন।

দুপুরে মগবাজার থেকে মহাখালী পর্যন্ত প্রধান সড়কে যানজট তুলনামূলক কম থাকলেও তেজগাঁওয়ের বিভিন্ন সড়কে দীর্ঘ যানজট ছিল। লাভ রোডের সুপার সিএনজি স্টেশনের গাড়ির লাইন বেগুনবাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

অটোরিকশাচালক আবদুল মান্নান জানান, ভোর চারটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ১৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর তিনি গ্যাস নিতে পেরেছেন। তবে গ্যাসের চাপ কম থাকায় তিনি মাত্র ১২০ টাকার গ্যাস পেয়েছেন।

তিনি বলেন, দুই-তিনটি ট্রিপ দেওয়ার পর আবার একই লাইনে দাঁড়াতে হবে। যদি দিনের বেশির ভাগ সময় লাইনে কাটে, তাহলে আয় করব কীভাবে? এত কম ট্রিপ দিয়ে আবার গাড়ির মালিককে জমার টাকাও দিতে পারব না।

যেসব শিল্পকারখানা উৎপাদন ও নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, সেগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে। কারখানা মালিকেরা বলছেন, গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদনের সময় কমাতে হচ্ছে, উৎপাদন কমাতে হচ্ছে, আবার কোথাও সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

এর সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

গ্যাস কম পাওয়ায় কারখানার ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমে গেলে সাধারণত জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু এখন দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে সেই বিকল্পও নির্ভরযোগ্য থাকছে না বলে জানিয়েছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।

নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. মোরশেদ সারোয়ার বলেন, গ্যাস সংকটে বিশেষ করে ডাইং ও তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি জানান, অন্তত ৮৫টি ডাইং ও ৬৫টি পোশাক কারখানা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক কারখানায় একেবারেই গ্যাস নেই, আবার কোথাও মাত্র দুই থেকে চার পিএসআই চাপ পাওয়া যাচ্ছে। এটা স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার অনেক নিচে।

পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক কারখানাকে বেশি খরচে সিএনজি বা ডিজেলের মতো বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে কোথাও উৎপাদন ৪০ শতাংশ, আবার কোথাও ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

কিছু কারখানা জরুরি রপ্তানি আদেশ পূরণের জন্য সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালিয়ে গেলেও স্বাভাবিক উৎপাদন ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

বিশেষ করে ডাবল ডাইং ও ফিনিশিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় বেশি গ্যাসের চাপ প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেই চাপ না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে এসব কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

এর ফলে আধা-প্রস্তুত পণ্য জমে যাচ্ছে, সরবরাহে দেরি হচ্ছে এবং পুরো বস্ত্র ও পোশাক সরবরাহ ব্যবস্থায় আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে বলে জানান মোরশেদ সারোয়ার।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে বর্তমানে পোশাকশিল্প স্বাভাবিক সক্ষমতার প্রায় ৪০ শতাংশে পরিচালিত হচ্ছে।

কিছু কারখানায় উৎপাদন ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। অন্য অনেক কারখানায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে।

তিনি বলেন, উৎপাদন ব্যয় সাময়িকভাবে বেড়ে যাওয়ার চেয়ে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠাতে না পারা এবং ক্রেতাদের আস্থা হারানোর আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।

তার ভাষ্য, অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয় হয়তো পরে কিছুটা সমন্বয় করা সম্ভব হবে। কিন্তু সময়মতো পণ্য সরবরাহ না করতে পারলে এবং ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা দেশের পোশাক রপ্তানি খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, তাদের অনেক উৎপাদন ইউনিট স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র এক-তৃতীয়াংশে চলছে, আবার কিছু ইউনিট পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

গ্যাস ও বিদ্যুতের এই সংকট নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদনেও প্রভাব ফেলছে।

তিনি বলেন, তাদের সিমেন্ট কারখানার দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ৩০ হাজার টন হলেও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বর্তমানে পাঁচ হাজার টনেরও কম উৎপাদন হচ্ছে।

একইভাবে পর্যাপ্ত চাহিদা ও রপ্তানি আদেশ থাকা সত্ত্বেও তাদের রাসায়নিক কারখানায় পিভিসি ও সোডা উৎপাদনও খুব সীমিত পর্যায়ে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ সিরামিক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতিও (বিসিএমইএ) নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিকে চিঠি দিয়েছে।

সমিতি জানিয়েছে, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও ময়মনসিংহের প্রায় ২০টি সিরামিক কারখানায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

গত ২৯ জুলাই পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, যেসব কারখানায় অন্তত ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন, সেখানে অনেক সময় শূন্য থেকে তিন পিএসআই চাপ পাওয়া যাচ্ছে।

সিরামিক কারখানার চুল্লি সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন। কিন্তু গ্যাসের এই ঘাটতির কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এমনকি পণ্য ও যন্ত্রপাতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

৭০টি কারখানার এই সংগঠন সতর্ক করে বলেছে, সময়মতো পণ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা দিতে না পারায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ইতোমধ্যে কিছু অর্ডার বাতিল করতে শুরু করেছেন।

এই সংকট শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহের কারণে উৎপাদনের সময় কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন এবং বেশি খরচে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করছেন।

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনেও। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ খুব কম, সেখানে অনেক পরিবার রান্না করতে পারছে না।

ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই এলপিজি সিলিন্ডার বা বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। এতে একদিকে জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ভোগান্তিও বাড়ছে।

Related Articles

Latest Posts