২০০৩ সালের পর প্রথমবারের মতো টেস্ট খেলতে গতকাল শুক্রবার রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে দেশ ছেড়েছে বাংলাদেশ দলের প্রথম বহর। তবে অতীতের পরিসংখ্যান খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া (যাদের একত্রে ‘সেনা’ দেশ বলা হয়) মিলিয়ে খেলা ২৫টি টেস্টের মধ্যে টাইগাররা জিতেছে মাত্র একটিতে।
এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, আগামী ১৩ আগস্ট ডারউইনে অজিদের বিপক্ষে শুরু হতে যাওয়া দুই টেস্টের সিরিজে নাজমুল হোসেন শান্তর দলের জন্য কতটা কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।
উপমহাদেশের দলগুলোর জন্য ‘সেনা’ দেশগুলোতে সাফল্য পাওয়াটা দীর্ঘকাল ধরেই টেস্ট ক্রিকেটের চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ঘাসে ঢাকা পিচ, অতিরিক্ত বাউন্স, টানা সিম মুভমেন্ট ও অপরিচিত কন্ডিশন সফরকারী এশিয়ান দলগুলোর পারফরম্যান্সকে প্রায়ই কঠিন করে তোলে। আর সেখানে বাংলাদেশকেই সবচেয়ে বেশি সংগ্রাম করতে হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি টেস্ট খেলেছে। এর দুটিই ছিল ২০০৩ সালে দেশটিতে তাদের প্রথম সফরে এবং দুটি ম্যাচেই তারা ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল। ইংল্যান্ডের মাটিতে চারটি টেস্ট খেললেও টাইগাররা এখনও জয়হীন। এছাড়া, দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলা আটটি ম্যাচের সবকটিতেই হারের তেতো স্বাদ পেয়েছে বাংলাদেশ।
একমাত্র নিউজিল্যান্ড সফরই কিছুটা আলোর দিশা দেখাতে পেরেছে বাংলাদেশকে। ২০২২ সালে মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে বাংলাদেশের সেই স্মরণীয় ৮ উইকেটের জয় কেবল ক্রিকেট বিশ্বকেই চমকে দেয়নি, বরং ‘সেনা’ভুক্ত চারটি দেশ মিলিয়ে এটিই এখন পর্যন্ত টাইগারদের একমাত্র টেস্ট জয়।
উপমহাদেশের অন্যান্য দলগুলোর সাথে তুলনা করলেই বাংলাদেশের এই ভোগান্তি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‘সেনা’ দেশগুলোতে এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সফল ভারত, যারা এই চার দেশে মোট ৩১টি টেস্ট জিতেছে। এরপরই আছে পাকিস্তান (২৮টি জয়) ও শ্রীলঙ্কা (৯টি জয়)। বাংলাদেশের স্রেফ ওই একটি জয় প্রমাণ করে যে, দেশের বাইরে তাদের পথচলা কতটা কঠিন। তবে ভারতও ‘সেনা’ দেশগুলোতে ১৭৯টি টেস্ট খেলে ৯৪টিতে হেরেছে, যা এশিয়ার যেকোনো দলের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী দলটিকেও সেখানে ভীষণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে।
এর মধ্যে বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া সফরই দলগুলোর জন্য সবচেয়ে কঠিন হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। একমাত্র এশিয়ান দল হিসেবে সেখানে টেস্ট সিরিজ জিতেছে ভারত। ২০১৮-১৯ মৌসুমে জয়ের পর ২০২০-২১ মৌসুমেও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফি ধরে রেখেছিল তারা। অস্ট্রেলিয়ায় খেলা ৪০ টেস্টের মধ্যে মাত্র চারটিতে জিতেছে পাকিস্তান। অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ এখনও সেখানে তাদের প্রথম জয়ের সন্ধানে রয়েছে।
এবার অস্ট্রেলিয়ায় চমক দেখানোর যে আশা বাংলাদেশ রাখছিল, তা ইতোমধ্যে বড় ধাক্কা খেয়েছে। সাইড স্ট্রেইনের কারণে সিরিজ থেকে ছিটকে গেছেন দলের সবচেয়ে গতিময় পেসার নাহিদ রানা। এছাড়া, লিটন দাস ও শরিফুল ইসলামও প্রথম টেস্টে খেলতে পারবেন না। বিপরীতে, চলমান আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রের অংশ হওয়ায় এই সিরিজের জন্য পূর্ণ শক্তির দল ঘোষণা করেছে অস্ট্রেলিয়া। ফলে টাইগারদের কাজটা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবুও মাউন্ট মঙ্গানুইয়ের জয় থেকে বাংলাদেশ আত্মবিশ্বাস খুঁজতেই পারে, যেখানে ইতিহাস ও প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে দেশের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সেরা জয়টি ছিনিয়ে এনেছিল টাইগাররা। এটি এই বার্তা দিয়েছিল যে, বিদেশের মাটিতে ভীতিকর রেকর্ডগুলোও ভাঙা অসম্ভব নয়।
অস্ট্রেলিয়ার ফ্লাইটে ওঠার আগে কোনো বড় দাবি করেননি শান্ত। বরং সামনের চ্যালেঞ্জগুলো মেনে নেওয়ার পথই বেছে নিয়েছেন তিনি। কারণ তার দল ভালো করেই জানে যে, তারা বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম কঠিন আস্তানায় প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ যদি বিদেশের মাটিতে তাদের ইতিহাসের নতুন আরেকটি অধ্যায় লিখতে চায়, তবে একটি করে সেশন, একটি করে দিন এবং একটি করে টেস্ট ধরে এগোনোর দিকেই মনোযোগ দিতে হবে। এর মাধ্যমেই হয়তো তারা অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধ কন্ডিশনের এই জটিল রহস্যের সমাধান বের করতে পারে।

