বড় হামলার ছক যুক্তরাষ্ট্রের, পাল্টা আঘাতের পরিকল্পনা আগেই প্রস্তুত বলছে ইরান

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাত নতুন এক জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ বাড়াচ্ছে ইসরায়েল, অন্যদিকে সৌদি আরব সংঘাত দ্রুত কমিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছে।

একই সময়ে ইরান সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় নতুন হামলা চালায়, তবে তারা ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাবে।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে মাত্র এক দিনের ব্যবধানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। প্রথমে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান ওয়াশিংটনে এসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বার্তা পৌঁছে দেন।

তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে জানান, সৌদি আরব মনে করে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। তাই উত্তেজনা কমানো এবং আলোচনায় ফেরাই সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

এর আগের দিনই ওভাল অফিসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বলেন, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনায় কার্যকর ফল আসার সম্ভাবনা খুবই কম।

বৈঠকে ইরানের ওপর সামরিক হামলা আরও জোরদার করা এবং অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধির বিভিন্ন বিকল্প নিয়েও আলোচনা হয়। তবে তিনি ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টই নেবেন।

দুটি বৈঠকের বিপরীত বার্তা ট্রাম্পের সামনে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক ও সামরিক দ্বিধাকেই স্পষ্ট করেছে। একদিকে যুদ্ধ থামানোর জন্য রিপাবলিকান দলীয় নেতাদের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে সংঘাত নতুন নতুন ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা এখন খুবই কম। তাদের আশঙ্কা, ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এখন দেশটির সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে এবং হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত চাপ হিসেবে ব্যবহার করতে বদ্ধপরিকর।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেছেন যে ইরান একটি সমঝোতা চুক্তির জন্য ‘অনুরোধ করছে’, বাস্তবে তেহরান তার শর্তে নতি স্বীকারে রাজি হয়নি। এতে ট্রাম্প ক্রমশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতি না হওয়ায় তিনি ব্যক্তিগত বৈঠক ও ফোনালাপেও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

এদিকে ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু বা অন্যান্য অবকাঠামোয় হামলার হুমকিকে তারা ‘উন্মাদের কাজ’ হিসেবে দেখছেন।

তবে এমন হামলা হলে তার জবাবে ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে আঘাত হানার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা আগে থেকেই প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, ৪০ দিনের যুদ্ধে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এমন সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে।

এরইমধ্যে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসি দাবি করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিরাপত্তা বহরের সঙ্গে চলাচলকারী দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে তারা হামলা চালিয়েছে।

তাদের ভাষ্য, জাহাজ দুটি ঘোষিত নৌপথ ব্যবহার না করে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসুরক্ষার অধীনে প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করছিল। হামলার পর দুটি ট্যাংকার থেমে যায় এবং আরও চারটি জাহাজ আগের অবস্থানে ফিরে যায়। তবে এই দাবির স্বাধীন যাচাইয়ের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের বেশি বেড়ে গেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ছে।

এতে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। একই সময়ে এক্সনমোবিল ও শেভরনের মতো বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলো রেকর্ড মুনাফা করেছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে ট্রাম্প ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার বৈঠক করেছেন। বৈঠকে যুদ্ধের পরবর্তী কৌশল, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা এবং সামরিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসে এক থেকে দুই সপ্তাহব্যাপী ব্যাপক বিমান হামলার একটি পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে।

তবে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সতর্ক করে বলেছেন, শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

এ ছাড়া, বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসার বিষয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন কমছে। সিএনএনের জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনায় সমর্থন জানিয়েছেন মাত্র ২৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক।

অন্যদিকে রয়টার্স-ইপসোসের জরিপে দেখা গেছে, যুদ্ধের পক্ষে রয়েছেন প্রতি তিনজনের মাত্র একজন। সিনেটেও যুদ্ধ নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। যুদ্ধ বন্ধে প্রেসিডেন্টকে আহ্বান জানিয়ে আনা একটি প্রস্তাব অল্প ব্যবধানে নাকচ হয়েছে।

এদিকে সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও পড়ছে। কুয়েত জানিয়েছে, তারা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে আসা ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। একই সময়ে লেবাননে হিজবুল্লাহর অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। লেবাননের কর্মকর্তারা একে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করেছেন।

কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও, যুদ্ধ নাকি আলোচনার পথ, এই দুই বিকল্পের মধ্যে কোনটি ট্রাম্প বেছে নেবেন, সেটিই এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

Related Articles

Latest Posts