৬ বছর ধরে অকেজো প্রায় ৩ কোটি টাকার সেতু, ১১ গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ

পটুয়াখালীর দশমিনা ও বাউফল উপজেলার সীমান্তবর্তী বাঁশবাড়িয়া-বগী খালের ওপর দুই কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতু ছয় বছর ধরে অকেজো পড়ে আছে।

সংযোগ সড়ক নির্মাণ না হওয়ায় আশপাশের অন্তত ১১টি গ্রামের শিক্ষার্থী, কৃষক, নারী ও বৃদ্ধসহ হাজারো মানুষকে ইটের ব্লক দিয়ে তৈরি অস্থায়ী সিঁড়ি বেয়ে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে সেতু পারাপার হতে হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন সকালে স্কুল শুরুর আগে শিক্ষার্থীরা বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সেতুর নিচে এসে জড়ো হয়। প্রায় ২০ ফুট উঁচু এই সেতুতে ওঠার কোনো সংযোগ সড়ক না থাকায় ইটের ব্লক দিয়ে তৈরি অস্থায়ী সিঁড়িই তাদের একমাত্র ভরসা।

কখনো কখনো ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীরা একে অন্যকে হাত ধরে টেনে তোলে। সামান্য অসাবধানতায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলেও দীর্ঘ ছয় বছর ধরে এভাবেই চলছে তাদের যাতায়াত।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৪ মিটার দীর্ঘ ও সাত মিটার প্রশস্ত আরসিসি গার্ডার সেতুটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় দুই কোটি ৮২ লাখ টাকা। নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে পটুয়াখালীর মেসার্স আবুল কালাম আজাদ এন্টারপ্রাইজ।

২০১৯ সালের আগস্ট মাসে সেতুর কাজ শুরু হয়। ২০২০ সালের জুন মাসে মূল সেতুর কাজ  শেষ হয়। ওই বছরের শেষ দিকে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সংযোগ সড়ক নির্মাণের সময় নকশাগত ত্রুটি ধরা পড়ায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কেটে গেছে ছয় বছর। এখনো সেতুটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আবদুল হাই বলেন, সেতু নির্মাণের আগে যদি এলাকাবাসীর সঙ্গে আলোচনা করা হতো, তাহলে হয়তো এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না। কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে সেতু হয়েছে, কিন্তু সংযোগ সড়ক না থাকায় মানুষের কোনো উপকারে আসছে না। ছয় বছর ধরে শুধু আশ্বাসই শুনে যাচ্ছি।

আরেক বাসিন্দা মশিউর রহমান লাবু বলেন, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই সেতু ব্যবহার করেন। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়। বর্ষাকালে ইটের সিঁড়ি পিচ্ছিল হয়ে যায়। ইতোমধ্যে কয়েকটি দুর্ঘটনাও ঘটেছে। তারপরও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।

সংযোগ সড়ক না থাকায় ভোগান্তিতে আছেন কৃষকেরাও। স্থানীয় কৃষক সোহরাব মিয়া বলেন, কালাইয়া দক্ষিণ বাজারে ধান, সবজি বা অন্য কৃষিপণ্য নিতে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। অনেক সময় পণ্যের দাম কম থাকলে লাভ তো হয়ই না, উল্টো লোকসান গুনতে হয়।

ব্যবসায়ীরাও বলছেন, যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক না থাকায় এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কর্পূরকাঠি ইসলামিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তুষার কান্তি ঘোষ বলেন, আমাদের বিদ্যালয়, পাশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাদ্রাসার শত শত শিক্ষার্থী প্রতিদিন এই পথ ব্যবহার করে। সংযোগ সড়ক না থাকায় তাদের ইটের সিঁড়ি ও বাঁশের সাঁকো দিয়ে চলতে হয়। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।

তিনি বলেন, অনেক অভিভাবক নিরাপত্তার কারণে সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠাতে চান না। এতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অভিভাবকদের প্রতিদিন সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।

দশমিনা উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. মকবুল হোসেন বলেন, আমি যোগদানের আগেই সেতুর নকশা করা হয়েছিল। পরে সংযোগ সড়ক নির্মাণের সময় নকশাগত ত্রুটি ধরা পড়ে। এজন্য কাজ বন্ধ রাখতে হয়।

নতুন নকশা অনুমোদন হয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হলেই সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হবে। তবে কবে নাগাদ কাজ শেষ হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি।

দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি আমরা এলজিইডির সঙ্গে আলোচনা করেছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ শুরু করার আশ্বাস দিয়েছে।

Related Articles

Latest Posts