চার বছর আগে মালিকানা বদলের পর ইউরোপের সবচেয়ে আগ্রাসী ক্লাবগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছিল চেলসি। কোটি কোটি টাকা খরচ করে একের পর এক তারকা দলে ভেড়ালেও মাঠের সাফল্য খুব একটা ধরা দেয়নি। এরপর ক্লাবটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটে। অভিজ্ঞদের বদলে ভবিষ্যতের কথা ভেবে তরুণ প্রতিভা দলে টানাই হয়ে ওঠে তাদের মূল নীতি। কিন্তু সেই নীতিতেও সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। তাই এবার যেন আবারও নতুন করে হিসাব কষছে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের ক্লাবটি।
সাম্প্রতিক সময়ে চেলসির নজরে রয়েছেন ক্রিস্টাল প্যালেস ও ফ্রান্সের সেন্টারব্যাক ম্যাকসঁস লাখ্রোয়া, ব্রাইটনের অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার ড্যানি ওয়েলবেক এবং ব্রেন্টফোর্ড ও ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার জর্ডান হেন্ডারসন। বয়সের দিক থেকে এই তিনজনই চেলসির সাম্প্রতিক ট্রান্সফার নীতির সঙ্গে একেবারেই ভিন্ন ছবি তুলে ধরছেন।
ছাব্বিশ বছর বয়সী লাখ্রোয়া এখন ক্যারিয়ারের সেরা সময় পার করছেন। তবুও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চেলসি যাদের দলে নিয়েছে, তাদের তুলনায় তিনি অনেকটাই বেশি বয়সী। গত দুই বছরে লাখ্রোয়ার চেয়ে বেশি বয়সী কোনো ফুটবলারকে দলে নেয়নি ব্লুজরা। সর্বশেষ টোসিন আদারাবিওয়োকে নেওয়া হয়েছিল সাতাশে পা দেওয়ার মাত্র তিন মাস আগে।
অন্যদিকে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী ড্যানি ওয়েলবেক স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে যেতে আগ্রহী বলে জানা গেছে। ছত্রিশ বছর বয়সী জর্ডান হেন্ডারসনও রয়েছেন চেলসির তালিকায়। ওয়েলবেক এলে প্রথম একাদশে তার জায়গা করে দিতে হতে পারে মাত্র তেইশ বছর বয়সী লিয়াম ডেলাপকে। অথচ গত বছর ইপসউইচ টাউন থেকে ডেলাপকে দলে নেওয়ার সময় তাকে প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ স্ট্রাইকারদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে অতীতের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা। মালিকানা বদলের পর সাবেক কোচ টমাস টুখেলের সময় বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করে অভিজ্ঞ ফুটবলারদের দলে ভেড়ানো হয়েছিল। সাতাশ বছর বয়সে ম্যানচেস্টার সিটি থেকে রহিম স্টার্লিংকে আনা হয় প্রায় পাঁচ কোটি পাউন্ড ব্যয়ে। চারবারের প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন ও ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের নায়ককে ঘিরে তখন ছিল দারুণ উচ্ছ্বাস।
কিন্তু চেলসিতে স্টার্লিংয়ের সময়টা প্রত্যাশামতো কাটেনি। মাঝেমধ্যে ঝলক দেখালেও ধারাবাহিকতা ছিল না, চোটও ভুগিয়েছে তাকে। দল যখন ২০২২-২৩ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে দ্বাদশ স্থানে শেষ করে, তখন সপ্তাহে তিন লাখ পাউন্ডেরও বেশি বেতন পাওয়া স্টার্লিংয়ের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিনা ট্রান্সফার ফিতেই ক্লাব ছাড়েন তিনি।
সেনেগালের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার কালিদু কুলিবালিকেও নাপোলি থেকে আনা হয়েছিল প্রায় তিন কোটি ত্রিশ লাখ পাউন্ডে। ইউরোপের অন্যতম সেরা সেন্টারব্যাক হিসেবে পরিচিত কুলিবালি মাত্র এক মৌসুম খেলেই সৌদি আরবের আল-হিলালে পাড়ি জমান।
একই পরিণতি হয়েছিল পিয়েরে-এমেরিক অবামেয়াংয়েরও। বার্সেলোনা থেকে দশ মিলিয়নের কিছু বেশি পাউন্ডে দলে এলেও টুখেলের বিদায়ের পর গ্রাহাম পটার ও ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের অধীনে নিজেকে প্রমাণ করতে পারেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত স্টার্লিংয়ের মতো তাকেও বিনা ট্রান্সফার ফিতে বিদায় নিতে হয়।
এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার পরই ট্রান্সফার নীতিতে বড় পরিবর্তন আনে চেলসি। অভিজ্ঞদের বদলে নজর দেওয়া হয় তরুণ প্রতিভার দিকে। সেই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় সফলতার নাম এনজো ফার্নান্দেজ। বিশ্বকাপ জয়ের পর মাত্র বাইশ বছর বয়সে বেনফিকা থেকে রেকর্ড একশ সাত মিলিয়ন পাউন্ডে তাকে দলে আনে চেলসি। পরের দুই মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তার চব্বিশটি অ্যাসিস্ট প্রমাণ করে, বিনিয়োগটি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।
একুশ বছর বয়সী মইসেস কাইসেদোকে আনতেও শত মিলিয়নের বেশি পাউন্ড ব্যয় করেছিল চেলসি। শুরুটা কঠিন হলেও সময়ের সঙ্গে নিজেকে প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ইকুয়েডরের এই ফুটবলার। গত মৌসুমে বল কাড়ার সংখ্যায়ও ছিলেন যৌথভাবে সবার ওপরে।
একইভাবে ম্যানচেস্টার সিটি থেকে প্রায় চার কোটি পাউন্ডে আনা কোল পামারও চেলসির অন্যতম সফল বিনিয়োগে পরিণত হয়েছেন। প্রথম মৌসুমেই দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি। চেলসিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে প্রিমিয়ার লিগে তার চেয়ে বেশি গোল করতে পেরেছেন কেবল আর্লিং হলান্ড, মোহাম্মদ সালাহ ও অলি ওয়াটকিনস।
তবে সব তরুণ ফুটবলার যে প্রত্যাশা পূরণ করেছেন, তা নয়। ইউক্রেনের মিখাইলো মুদ্রিককে বিপুল অর্থে দলে ভেড়ালেও নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে। বর্তমানে চার বছরের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আপিল করেছেন তিনি।
জোয়াও ফেলিক্সও দুই দফায় চেলসিতে এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। প্রথমবার ধারে এসে অভিষেক ম্যাচেই লাল কার্ড দেখেন। পরে স্থায়ী চুক্তিতে যোগ দিলেও প্রিমিয়ার লিগে বারো ম্যাচে মাত্র একটি গোল করে শেষ পর্যন্ত আল-নাসরে বিক্রি হয়ে যান।
একুশ বছর বয়সে প্রায় সাত কোটি পাউন্ডে লেস্টার সিটি থেকে আসা ওয়েসলি ফোফানার ক্যারিয়ারও চোটের কারণে বারবার থমকে গেছে। এমনকি ফ্রান্সের বিশ্বকাপ দলেও জায়গা হয়নি তার। স্কোয়াড ছোট করার পরিকল্পনায় ভবিষ্যতে তাকেও কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

