বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো আলোঝলমলে এক ক্যারিয়ার, কিন্তু ভেতরে ছিল জীবন্ত নরক। দরজায় তালা নেই, পায়ে নেই লোহার শেকল। তবুও সেখান থেকে পালানোর কোনো পথ ছিল না। কুখ্যাত যৌন অপরাধী মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টিনের তৈরি করা এক ভয়ানক ‘কাল্ট’ বা অন্ধকার সাম্রাজ্যের অদৃশ্য খাঁচায় কীভাবে বছরের পর বছর বন্দি ছিলেন একঝাঁক তরুণী?
উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রলোভন, মানসিক নিপীড়ন আর জোরপূর্বক বিকৃত অস্ত্রোপচারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই নারকীয় চক্রের ভেতরের গল্প কতটা রুদ্ধশ্বাস হতে পারে? সংবাদমাধ্যম বিবিসির সঙ্গে এক বিশেষ ও বিরল সাক্ষাৎকারে জেফরি এপস্টিনের সেই বন্দিজীবনের এমনই এক রোমহর্ষক ও গা শিউরে ওঠা বর্ণনা দিয়েছেন তারই সাবেক সহকারী ‘আনিয়া’ (ছদ্মনাম)।
২০১৯ সালে জেফরি এপস্টিন মারা যাওয়ার পরের সপ্তাহে নিউইয়র্কে নিজের অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খুলে স্তম্ভিত হয়ে যান আনিয়া। বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন এপস্টিনের ভাই মার্ক এপস্টিন। আনিয়ার দাবি, মার্ক অবিলম্বে তাকে বাসা ছেড়ে চলে যেতে বলেন।
বহু বছর ধরে আনিয়া ম্যানহাটনের ইস্ট ৬৬তম স্ট্রিটে অবস্থিত এপস্টিনের মালিকানাধীন কয়েকটি অ্যাপার্টমেন্টের একটিতে থাকতেন। তিনি যৌন নির্যাতনের শিকার নারীদের এসব ফ্ল্যাটে রাখতেন।
অথচ এক মুহূর্তেই তিনি আশ্রয় হারান। কিন্তু একইসঙ্গে বহু বছরের এক দুঃস্বপ্ন থেকেও মুক্তি পান।
বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মার্ক এপস্টিন তার ভাইয়ের অপরাধ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না বলে দাবি করেছেন।
আনিয়া বলেন, ‘এখনো মেনে নিতে কষ্ট হয় যে, আমি বছরের পর বছর নির্যাতনের শিকার হয়েছি। আমাকে তো শেকল দিয়ে কোনো দরজায় বেঁধে রাখা হয়নি, কোনো বেজমেন্টেও আটকে রাখা হয়নি। কিন্তু অদৃশ্য এক শেকল ছিল।’
তার ভাষ্য, জেফরি এপস্টিন প্রায়ই বলতেন, তার পুরো কার্যক্রম ‘একটি কাল্টের মতো, আর সেই কাল্টের নেতা তিনি নিজেই।’
আনিয়া বলেন, এপস্টিনের প্রায় এক ডজন নারী ‘সহকারী’ ছিল। তার দেওয়া বাসাতেই তারা থাকতেন, দিন-রাত তার নির্দেশে কাজ করতেন এবং নিয়মিত যৌন নির্যাতনের শিকার হতেন।
তিনি বলেন, চাকরি ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ফাঁদে ফেলা হতো। এরপর ধীরে ধীরে জীবনের প্রায় প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেওয়া হতো এবং তাদের দুর্বলতাগুলোকে কাজে লাগিয়ে আটকে রাখা হতো।
আনিয়ার দাবি, এপস্টিন তাদের আর্থিক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতেন, কার সঙ্গে দেখা করবেন তা ঠিক করে দিতেন, মানসিকভাবে অপমান করতেন, শরীর নিয়ে অস্বাভাবিক মাত্রায় নজরদারি করতেন এবং তাকে অপ্রয়োজনীয় বিকৃতিমূলক অস্ত্রোপচার করাতেও বাধ্য করেছিলেন।
আনিয়ার এই বর্ণনার সঙ্গে মিল রয়েছে এপস্টিনের আরেক সাবেক সহকারী সারাহ কেলেনের বক্তব্যের। চলতি বছর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটিকে বলেন, নিজেকে তাদের ‘উদ্ধারকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করতেন এপস্টিন।
কেলেন বলেন, ‘তিনি এমনভাবে মানুষের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও স্বাধীনতা ধ্বংস করে দিতেন যে, ধীরে ধীরে আপনি পুরোপুরি তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন।’
জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী ড. তারা কুইন-সিরিলো বিবিসিকে বলেন, অনেকেই মনে করেন, শুধু শিশুরাই এ ধরনের নিয়ন্ত্রণের শিকার হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে প্রাপ্তবয়স্কদেরও একইভাবে ‘গ্রুমিং’ করা সম্ভব।
তার ভাষ্য, ‘আপনিও এর শিকার হতে পারেন।’
সাক্ষাৎকারে আনিয়া বলেন, ২০০৮ সালে এক কিশোরীকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যৌন নির্যাতনের দায়ে দণ্ডিত হওয়ার পর এপস্টিন তার কৌশল বদলে ফেলেন। এরপর তিনি মূলত রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের টার্গেট করতে শুরু করেন।
তবে আনিয়ার দাবি, তাদের অনেককেই তখনো দেখতে কিশোরীর মতো লাগত। সেই সময়কার নিজের কয়েকটি ছবিও তিনি বিবিসিকে দেখিয়েছেন।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন পরবর্তী রাশিয়ায় কঠোর বাবা-মায়ের কাছে বড় হন আনিয়া। ছোটবেলা থেকেই তাকে শেখানো হয়েছিল, ‘শিক্ষাই তোমার সাফল্যের চাবিকাঠি।’
কিন্তু দেশে সুযোগ কম থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি শেষ করে তিনি মডেলিং করতে ইউরোপে চলে যান।
ফেন্ডি ও শ্যানেলের মতো বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের হয়ে কাজও করতেন তিনি। বন্ধু, সহকর্মী ও পরিবারের একটি শক্ত সমর্থনব্যবস্থাও তার ছিল।
বিশের কোঠার শুরুতে প্যারিসের একটি মডেলিং এজেন্সিতে গিয়ে মডেল স্কাউট ড্যানিয়েল সিয়াদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।
আনিয়ার ভাষ্য, সিয়াদ তার বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করে বলেন, ‘মডেলিং জগতে এটা খুব একটা দেখা যায় না।’
এরপর তিনি জানান, ফ্যাশন দুনিয়ায় প্রভাবশালী এক বন্ধুর সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেবেন। সেই ব্যক্তিই ছিলেন জেফরি এপস্টিন।
এখন আনিয়ার বিশ্বাস, সেদিন তিনি ঘটনাচক্রে নয়, পরিকল্পিতভাবেই টার্গেট হয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘সবকিছুই ছিল সাজানো।’
তিনি সিয়াদকে ‘একজন পেশাদার মানবপাচারকারী’ বলেও উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার চলতি বছরের জানুয়ারিতে যে বিপুলসংখ্যক এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ করেছে, সেখানে হাজার হাজারবার ড্যানিয়েল সিয়াদের নাম এসেছে।
তার আইনজীবী বিবিসিকে বলেন, সিয়াদ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চান না। তবে এর আগে তিনি এপস্টিনের অপরাধ সম্পর্কে কোনো ধরনের জ্ঞান থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
প্যারিসে এপস্টিনের ১৮ কক্ষের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে তার সঙ্গে দেখা করেন প্রথমবার দেখা করেন আনিয়া। দেয়ালে বিল ক্লিনটনসহ বিভিন্ন বিশ্বনেতার সঙ্গে তোলা এপস্টিনের ছবিগুলো ঝুলছিল।
সেখানে আরও দুজন নারী উপস্থিত ছিলেন—একজন রুশ নাগরিক এবং অন্যজন পূর্ব ইউরোপের, যিনি তখন এপস্টিনের প্রেমিকা ছিলেন। তাই শুরুতে আনিয়া নিজেকে নিরাপদই মনে করেছিলেন।
তার দাবি, এপস্টিন তাকে কাপড় খুলে শরীর দেখাতে বলেন, যেন তিনি মূল্যায়ন করতে পারেন মডেলিংয়ের জন্য উপযুক্ত কি না।
শুধু অন্তর্বাস পরে দাঁড়িয়ে থাকতেই এপস্টিন তাকে বলেন, তিনি ‘ফিট নন’, আরও ব্যায়াম করতে হবে এবং তাকে ‘অলস’ বলেও মন্তব্য করেন।
মডেলিং জগতে এ ধরনের মন্তব্য খুব সাধারণ হওয়ায় আনিয়া তা স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, কঠোর পরিশ্রম করলে এপস্টিন তাকে সঠিক মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন।
আনিয়ার ভাষ্য, এপস্টিন তার পরিবার, আগ্রহ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন করেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘ফ্যাশন দুনিয়ায় কেউ এসব জানতে চায় না।’
বিবিসির সঙ্গে কথা বলা আরও কয়েকজন নারীও জানিয়েছেন, এপস্টিন মানুষের জীবনে কী গুরুত্বপূর্ণ, তা জেনে পরে সেই তথ্য তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতেন।
একপর্যায়ে তিনি আনিয়াকে বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি, তুমি বুদ্ধিমান, আবার সন্দেহপ্রবণও। কিন্তু আমি তোমার সঙ্গে শোয়ার কোনো ইচ্ছা রাখি না।’
এই কথায় আনিয়া আরও আশ্বস্ত হয়ে পড়েন।
তিনি বলেন, ‘তখন আমার মনে হয়েছিল, মানুষটা অসাধারণ। তিনি যেন আমাকে পুরোপুরি বুঝে ফেলেছেন।’
আনিয়া বলেন, এটিই ছিল দীর্ঘ এক ‘গ্রুমিং’ প্রক্রিয়ার শুরু। পরবর্তী কয়েক মাস ধরে তাকে নানা প্রতিশ্রুতি ও প্রতারণার জালে আটকে রাখা হয়।
প্রায় এক বছর ধরে এপস্টিনের পছন্দমতো শরীর গড়তে তিনি ‘ধর্মীয় নিষ্ঠার মতো’ ব্যায়াম করতেন।
এপস্টিনের নির্বাহী সহকারী, তার সময়সূচি দেখভালের দায়িত্বে থাকা লেসলি গ্রফ নিয়মিত ই-মেইলে আনিয়ার অগ্রগতির খবর চাইতেন। অন্যদিকে এপস্টিন তাকে বারবার শরীরের ছবি পাঠাতে চাপ দিতেন। এমনকি নগ্ন ছবি পাঠানোর সময়ও বলতেন, ‘লজ্জা পেয়ো না।’
একপর্যায়ে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এপস্টিন তার সঙ্গে মডেলিং এজেন্সি নেক্সট ম্যানেজমেন্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা ফেইথ কেটসের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন।
আনিয়া বলেন, বৈঠকটি ৩০ মিনিটেরও কম সময় স্থায়ী হয়েছিল। শেষে তাকে বলা হয়, ফলাফল পরে এপস্টিন জানাবেন।
পরে এপস্টিন তাকে বলেন, নিউইয়র্কের বাজারের জন্য তিনি ‘যথেষ্ট ভালো নন’। পাশাপাশি আগের মতোই দাবি করেন, তিনি এখনো ‘ফিট নন’। এতে আনিয়া ভেঙে পড়েন।
এরপর এপস্টিন তাকে ফ্লোরিডার পাম বিচে যেতে বলেন। সে সময় এক কিশোরীকে যৌন নির্যাতনের দায়ে সাজা ভোগ করলেও দিনের বেলায় সীমিত সময়ের জন্য বাইরে থাকার অনুমতি পেয়েছিলেন তিনি।
আনিয়ার দাবি, এপস্টিন তাকে বলেছিলেন, ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে এক কিশোরী তাকে প্রতারিত করেছিল বলেই তিনি ওই মামলায় জড়িয়েছেন।
এপস্টিনের সঙ্গে দেখা করতে গেলে ইউনিফর্ম পরা এক পুলিশ কর্মকর্তার কাছে রাখা একটি রেজিস্টারে সই করতে হতো।
এরপর এপস্টিন তাকে একটি পেছনের কক্ষে নিয়ে গিয়ে প্রথমবার যৌন নির্যাতন করেন বলে অভিযোগ করেন আনিয়া।
এপস্টিনের সাজা ভোগের সময় আরও অন্তত দুজন নারীও তার বিরুদ্ধে একই ধরনের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন।
আনিয়ার ভাষ্য, নির্যাতনের পর এপস্টিন তাকে আবার বাইরে নিয়ে আসেন এবং অপেক্ষমাণ অন্য সহকারীদের উদ্দেশে হাসতে হাসতে বলেন, ‘আনিয়া খুব লাজুক।’
অন্য নারীরাও হাসতে শুরু করেন।
আনিয়া বলেন, সেই প্রতিক্রিয়ায় তিনি নিজেকেই দোষ দিতে শুরু করেন।
‘আমি ভাবছিলাম, হয়তো এখানে কোনো ভুলই হয়নি। হয়তো ভুলটা আমার অনুভূতিতে। হয়তো এটা আমার রুশ পরিবারে বড় হওয়ার কারণে। হয়তো বাবা–মা খুব কঠোর ছিলেন। সমস্যা হয়তো আমার, তার নয়।’
চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ করার পরই তিনি বুঝতে পারেন, আসলে কী ঘটেছিল।
সেসব ই-মেইলে দেখা যায়, ফেইথ কেটসের সঙ্গে তার মুখোমুখি সাক্ষাতের অনেক আগেই মডেলিং এজেন্সিটি তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
অর্থাৎ, প্রায় এক বছর ধরে এপস্টিন তাকে মিথ্যা আশায় আটকে রেখেছিলেন।
তিনি বলেন, এটি ‘খুব সুচিন্তিত একটি গ্রুমিং প্রক্রিয়া’ ছিল।
যখন তিনি মানসিকভাবে দুর্বল, একা এবং নিজের দেশ থেকে বহু দূরে, ঠিক তখনই এপস্টিন তাকে আঘাত করেন।
ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী ড. তারা কুইন-সিরিলো বলেন, এ ধরনের ধীর, পরিকল্পিত গ্রুমিংয়ের উদ্দেশ্যই হলো ভুক্তভোগীর বিপদের অনুভূতিকে জাগতে না দেওয়া।
ফেইথ কেটসের আইনজীবী বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, তার মক্কেলের বিরুদ্ধে এপস্টিনের মানবপাচার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানার বা তাতে জড়িত থাকার অভিযোগ ‘মিথ্যা ও মানহানিকর’।
তিনি আরও বলেন, এপস্টিন এজেন্সির সিদ্ধান্ত আনিয়াকে জানাবেন—এমন দাবি ‘অস্বাভাবিক, অসত্য এবং কোনো প্রমাণে সমর্থিত নয়।’
তিনি বলেন, ‘এটা অনেকটা স্টেলথ বোমারু বিমানের মতো, যেগুলো রাডারের নিচ দিয়ে উড়ে যায়।’
বিবৃতিতে বলা হয়, কোন মডেলকে নেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত নেক্সট ম্যানেজমেন্ট নিজেই নিত। এ বিষয়ে কখনো এপস্টিনের অনুমোদন নেওয়া হতো না।
নেক্সট ম্যানেজমেন্ট আলাদা এক বিবৃতিতে জানায়, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে এপস্টিনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। ফেইথ কেটসের যেসব কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো তার ব্যক্তিগত বিষয়।
এরপরও আনিয়াকে মডেলিং ক্যারিয়ারের আশায় বেঁধে রাখেন এপস্টিন।
তিনি তার পরিচয় করিয়ে দেন এমসি-২ মডেলিং এজেন্সির প্রতিষ্ঠাতা জ্যাঁ-লুক ব্রুনেলের সঙ্গে।
তবে আনিয়া জানতেন না, এপস্টিনই ওই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম অর্থায়নকারী।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, পরে এমসি২-এর মিয়ামি ও নিউইয়র্ক অফিস বন্ধ হয়ে যায়। ইসরায়েলে থাকা তাদের একমাত্র শাখার প্রতিষ্ঠাতা আগে জানিয়েছিলেন, তার সঙ্গে এপস্টিনের কোনো সম্পর্ক ছিল না।
আনিয়ার দাবি, ওই এজেন্সি থেকে তিনি ‘প্রায় কোনো কাজই’ পাননি।
বরং তার এজেন্ট প্রায়ই বলতেন, তিনি ‘ডাইরেক্ট বুকিংয়ের’ জন্য পাম বিচে যাচ্ছেন।
কিন্তু সেখানে কোনো মডেলিংয়ের কাজ থাকত না।
থাকত শুধু এপস্টিনের দ্বারা আরও যৌন নির্যাতন।
একসময় এপস্টিন তাকে বলেন, মডেলিং তার জন্য নয় এবং এই শিল্পের ভবিষ্যৎও নেই।
আনিয়ার ভাষ্য, এপস্টিন তখন তাকে বলেন, ‘এসো, আমার সঙ্গে কাজ করো। আমি তোমাকে সত্যিকারের ব্যবসা শেখাব। তুমি পৃথিবী ঘুরবে, গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সঙ্গে পরিচিত হবে।’
কিন্তু ‘সহকারী’ হিসেবে কাজ শুরু করার পর তিনি বুঝতে পারেন, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আনিয়ার দাবি, এপস্টিন তাকে ব্যবসা সম্পর্কে কিছুই শেখাননি। বেশির ভাগ সময় তাকে এপস্টিনের দেওয়া কাজের অপেক্ষায় বসে থাকতে হতো। আবার কোনো কাজ না থাকলেও এপস্টিন তাকে অলস বলে অপমান করতেন।
মাঝেমধ্যে ফোন ধরা, কাউকে বৈঠককক্ষে পৌঁছে দেওয়া বা অতিথির আগমনের ঘোষণা দেওয়ার মতো ছোটখাটো কাজ দেওয়া হতো।
তবু আনিয়াদের ২৪ ঘণ্টাই প্রস্তুত থাকতে হতো।
একবার তিনি দুপুরের খাবার খেতে একজনের সঙ্গে বাইরে গেলে এপস্টিন প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
তিনি বারবার ফোন করে জানান, তার অনুমতি ছাড়া কখনোই বাড়ির বাইরে যাওয়া যাবে না।
আনিয়া বলেন, তখন তিনি পুরোপুরি এপস্টিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন।
অসুস্থ হলে চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও এপস্টিন বলতেন, ‘আমিই তোমার স্বাস্থ্যবিমা।’
তার নিজের কোনো ব্যাংক হিসাব ছিল না। আলাদা বাসা ভাড়া নেওয়ার মতো কাগজপত্রও ছিল না।
তবু মাঝে মাঝে এপস্টিন তাকে ম্যানহাটনের ফ্ল্যাট থেকে বের করে দিয়ে বলতেন, ‘এখন কোথায় থাকবে, সেটা নিজেই ঠিক করো।’
আনিয়ার মতে, এগুলো ছিল তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার শক্তিশালী কৌশল।
তার দাবি, বহু বছর পর শুধু ভিসার নিয়ম মেনে চলার জন্যই এপস্টিন তাকে অল্প কিছু বেতন দেওয়া শুরু করেন।
তবে প্রায়ই বলতেন, ‘চিন্তা করো না, আমি সব সময় তোমার দেখভাল করব।’
এই সময়জুড়েই যৌন নির্যাতন অব্যাহত ছিল বলে অভিযোগ করেন আনিয়া।
এপস্টিনের আরেক সাবেক সহকারী সারাহ কেলেনও মার্কিন আইনপ্রণেতাদের কাছে একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘আমার কোনো টাকা ছিল না, পরিবার ছিল না, উচ্চশিক্ষা ছিল না। এমনকি আমি যে আরও ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য—সেই বিশ্বাসটুকুও ছিল না।’
একই সময়ে এপস্টিন তার ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রদর্শন করতেন।
কেলেনের ভাষায়, ‘জেফরি এমনভাবে সবকিছু সাজিয়েছিল, যাতে আমি বুঝতে পারি, তার অবাধ্য হওয়ার মূল্য হতে পারে আমার জীবন।’
একবার এক নারী সহকারী পালিয়ে যান বলে জানান আনিয়া।
তার ভাষ্য, পালিয়ে যাওয়ার সময় ওই নারী তাকে ফোন করেছিলেন। এতে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কারণ, এপস্টিন তাদের সবার ফোনের মালিক ছিলেন এবং কার সঙ্গে কথা বলছেন, সেটিও নজরদারি করতেন।
আনিয়ার দাবি, ওই নারীকে খুঁজে বের করতে এপস্টিন একজন ব্যক্তিগত গোয়েন্দা নিয়োগ করেন।
পরে তিনি আনিয়াকে একটি ই-মেইল দেখান, যেখানে পালিয়ে যাওয়া ওই নারীর কাছে ৭ লাখ ডলার পাওনা আছে বলে হিসাব করা হয়েছিল।
বার্তাটি স্পষ্ট ছিল, যদি কেউ চলে যায়, তাহলে তার কাছে বিপুল অর্থ দাবি করা হবে এবং সেই টাকা আদায়ের জন্য তাকে খুঁজে বের করা হবে।
তবে এটিই এপস্টেইনের একমাত্র নিয়ন্ত্রণের কৌশল ছিল না।
আনিয়ার দাবি, তিনি নারীদের সম্পর্কে আপত্তিকর নানা তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করে রাখতেন। মাঝেমধ্যে স্বাভাবিকভাবেই মনে করিয়ে দিতেন যে, তার কাছে তাদের নগ্ন ছবি রয়েছে।
একবার তিনি সব নারী সহকারীকে নিয়ে একটি ফটোশুটের আয়োজন করেন।
আনিয়া বলেন, এপস্টিন তাদের টপলেস হয়ে আনন্দের সঙ্গে নাচতে উৎসাহ দেন এবং বলেন, পুরো বিষয়টি ভিডিও করা হচ্ছে।
আনিয়া বলেন, এপস্টিন তখন বলেছিলেন, ‘এভাবে নিশ্চিত হব, তোমরা কখনোই আমার বিরুদ্ধে যাবে না।’
তার ইঙ্গিত ছিল, ভিডিও দেখিয়ে তিনি দাবি করতে পারবেন যে, সবকিছুই নারীদের সম্মতিতেই হয়েছিল।
আনিয়া বলেন, ‘ওটাই ছিল তার প্রমাণের ভাণ্ডার।’
এপস্টিন তার নারী সহকারীদের দিয়ে নিয়মিত ‘কৃতজ্ঞতার চিঠিও’ লিখিয়ে নিতেন।
সেসব চিঠিতে তাকে ধন্যবাদ জানাতে হতো এবং প্রশংসায় ভরিয়ে দিতে হতো।
আনিয়া বলেন, ‘আমি সব সময় ভয় পেতাম, তাকে যথেষ্ট ধন্যবাদ জানাতে পারছি কি না।’
তার বিশ্বাস, এসব চিঠিও ছিল আরেকটি নিয়ন্ত্রণের কৌশল। ‘হয়তো তিনি বলতে চাইতেন, তুমি যদি আমাকে সব সময় ধন্যবাদ দাও, তাহলে পরে আমার বিরুদ্ধে যাবে কীভাবে?’
এপস্টিন নারী সহকারীদের একে অপরের বিরুদ্ধেও দাঁড় করিয়ে দিতেন।
আনিয়ার ভাষ্য, তিনি এসে বলতেন, অন্য একজন সহকারী তার ওপর খুব রাগ করেছেন, কারণ তিনি ‘অলস’ ও ‘অকাজের’।
কিন্তু একই সঙ্গে বলতেন, ‘আমি তোমার পক্ষেই আছি। আমিই তোমার সবচেয়ে বড় সমর্থক।’
এভাবে তিনি নারীদের মধ্যে প্রকৃত বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে দিতেন না। ফলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা আরও সহজ হয়ে যেত।
কথা বলতে বলতে আনিয়া নিজের পোশাক তুলে পেটের কয়েকটি বড় দাগ দেখান।
এরপর তিনি মডেলিং জীবনের পুরোনো কিছু ছবিও দেখান। সেখানে কৈশোরে করা একটি ছোট ট্যাটু দেখা যায়।
আনিয়ার দাবি, এপস্টিন সেই ট্যাটুটি পছন্দ করতেন না।
তিনি এক চিকিৎসককে নিজের বাসায় ডেকে আনেন। তবে লেজার চিকিৎসায় সময় বেশি লাগবে বলে তিনি চাননি।
বরং চিকিৎসককে ট্যাটু থাকা চামড়ার অংশ কেটে ফেলার পরামর্শ দেন।
আনিয়ার ভাষ্য, তখন এপস্টিন গর্ব করে বলেছিলেন, ‘এমন বুদ্ধি শুধু আমার মাথাতেই আসতে পারে।’
শেষ পর্যন্ত তিনি সেই অস্ত্রোপচার করান। অস্ত্রোপচারের দাগ আজও রয়ে গেছে। কিন্তু এক বছর পর এপস্টিন আবারও একই অস্ত্রোপচার করাতে বাধ্য করেন। কারণ, আগের ফলাফল তার পছন্দ হয়নি।
আনিয়া বলেন, এপস্টেইনের সঙ্গে কাটানো সময়ের সবচেয়ে লজ্জাজনক অংশ ছিল অন্য নারীদের সেখানে নিয়ে আসা।
চোখে জল নিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেক নারী সহকারীকে অন্তত একজন নতুন নারী নিয়ে আসতে হতো।
এপস্টিন বিশেষভাবে বলতেন, যেন আনিয়ার মতোই তরুণীদের খুঁজে আনা হয়।
তার ভাষ্য, ‘একজনকে আনো বা দশজনকে—একবার এটা করলে তুমিও সেই অপরাধের অংশ হয়ে যাও।’
আনিয়া জানান, এখন তিনি কথা বলছেন, কারণ মানুষ যেন বুঝতে পারে, শুধু শিশু নয়, প্রাপ্তবয়স্ক নারীরাও কীভাবে এপস্টিনের মানবপাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘সে নিজের জন্য নির্যাতনের পুরো একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল।’
‘যখন বিল গেটসের মতো মানুষকে তার বাড়িতে নৈশভোজে আসতে দেখেন, তাকে করমর্দন করতে দেখেন, তখন নিজের মনেই প্রশ্ন আসে—আমি কে যে এসব নিয়ে প্রশ্ন তুলব? আমিই বা কেন মুখ খুলব? এসবই তার নির্যাতনকে বৈধতা দিত।’
পরে আনিয়া ও সারাহ কেলেন—দুজনই ‘এপস্টিন ভিকটিমস কম্পেনসেশন ফান্ড’ থেকে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন।
এই তহবিলটি নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা দিতে গঠন করা হয়েছিল। ক্ষতিপূরণ পেতে তাদের নির্যাতনের পক্ষে সমর্থনযোগ্য প্রমাণও জমা দিতে হয়েছিল।
আনিয়া বলেন, ‘এপস্টিন বেঁচে থাকতে আমি এ বিষয়ে একজন মানুষের সঙ্গেও কথা বলিনি।’
এখন তার আশা, তার অভিজ্ঞতা অন্তত একজন নারীকে নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সাহস জোগাবে।
তিনি বলেন, ‘আমি কোনোভাবেই বিশেষ কেউ নই। আমি শুধু কোনোভাবে নিজের ভেতর বেঁচে থাকার শক্তিটা খুঁজে পেয়েছিলাম। আমি যদি পারি, আপনিও পারবেন।’

