সম্প্রতি ইরানে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শোকানুষ্ঠান। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত হামলায় নিহত হওয়ার চার মাসেরও বেশি সময় পর প্রয়াত নেতার ছয় দিনব্যাপী শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়।
এতে অংশ নিয়েছে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহসহ তেহরানের অন্যান্য মিত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
গতকাল বুধবার ইসরায়েলি গণমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, শোকানুষ্ঠানের ফাঁকে ইরানের নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছেন হামাসের প্রতিনিধিরা।
আগামীতে তেহরানের কাছ থেকে আরও বর্ধিত আকারে কূটনৈতিক ও আর্থিক সহযোগিতার দাবি জানিয়েছে হামাস—এমনটাই দাবি করছে গণমাধ্যমটি।
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যস্থতায় ইসরায়েল-হামাসের যুদ্ধবিরতি চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল হামাসের নিরস্ত্রীকরণ।
সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি নিয়ে মধ্যস্থতাকারীরা চাপ বাড়িয়েছেন। যার ফলে হামাস নিজেদের অবস্থানকে আরও বলিষ্ঠ করার জন্য দীর্ঘদিনের মিত্র ইরানের দ্বারস্থ হয়েছে।
তথ্যসূত্র হিসেবে ইসরায়েলি সরকারি গণমাধ্যমের (কান) বরাত দিয়েছে টাইমস অব ইসরায়েল।
গত মঙ্গলবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান মোহাম্মদ ইসমাইল দারবিশের নেতৃত্বে হামাসের প্রতিনিধিদল জ্যেষ্ঠ ইরানি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বৈঠকে ইরানের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের ঘালিবাফ উপস্থিত ছিলেন।
ওই বৈঠকে হামাস বেশ কয়েকটি দাবি তুলে ধরে।
আলোচনার কেন্দ্রে ছিল গাজার যুদ্ধবিরতি চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি শর্তগুলো। এ ক্ষেত্রে ইরানকে ‘কূটনৈতিক সুরক্ষা ঢাল’ হিসেবে ব্যবহারের দাবি জানায় হামাস।
হামাসকে নিরস্ত্র করা ও গাজার শাসনভার থেকে সরিয়ে দেওয়ার যেকোনো প্রস্তাব নাকচ করবে ইরান—এমন দাবিও জানায় সংগঠনটি।
যুক্তরাষ্ট্র ও বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহকে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। তা সত্ত্বেও, বছরের পর বছর এ দুটি সংগঠনকে সমর্থন যুগিয়ে গেছে ইরান। এ কারণে ইরানও বেশ কয়েক ধরনের আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের মুখে পড়েছে।
পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মত, গাজা উপত্যকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেসব প্রস্তাব রেখেছেন, সেগুলো বাস্তবায়নে বড় বাধা হামাসের মনোভাব। মূলত সংগঠনটি গাজার শাসনভার ছাড়তে ও অস্ত্র ত্যাগ করতে অনীহা প্রকাশ করেছে।
হামাস বরাবরই জানিয়েছে, তারা আংশিকভাবে অস্ত্র ত্যাগ করতে রাজি। ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিষয়টির সুরাহা হতে হবে।
কিন্তু এ প্রস্তাব নাকচ করেছে ইসরায়েল।
হামাস দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো ভবিষ্যৎ আলোচনায় গাজা উপত্যকার ভবিষ্যৎকেও যুক্ত করে নিতে। যেমনটি, লেবাননের যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে করেছে তেহরান।
বস্তুত, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ করার শর্ত জুড়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে হামাস।
২০২৫ সালের অক্টোবরে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও প্রায় প্রতিদিনই নানা অজুহাতে গাজায় হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। তাদের দাবি, তারা ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ নির্মূল করতে এসব হামলা চালায়।
ওই যুদ্ধবিরতির পর থেকে গাজার ৫৩ শতাংশ ভূখণ্ড দখলে নিয়েছে ইসরায়েলি সেনা। তাদের পরবর্তী লক্ষ্য ৬০ শতাংশ ভূখণ্ডের দখল নেওয়া।
মে মাসে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানান, তিনি সেনাদের গাজার ৭০ শতাংশ ভূখণ্ড দখলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
ইসরায়েলি সরকারি গণমাধ্যম কান-এর প্রতিবেদন মতে, তেহরানের কাছে বাড়তি আর্থিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ চেয়েছে হামাস।
ইসরায়েলের সঙ্গে দুই বছরের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি পরিপূরণের জন্যই মূলত এ ধরনের সহায়তা চেয়েছে হামাস।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমটির দাবি, হামাসের সকল চাহিদা পূরণের আশ্বাস দিয়েছে ইরানের নেতৃত্ব।
ফিলিস্তিনিরা পূর্ণ বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত হামাসের প্রতি ইরান তাদের সমর্থন অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
পাশাপাশি, ওয়াশিংটনের সঙ্গে দরকষাকষিতে হামাসের দাবিদাওয়া জুড়ে দিতেও রাজি হয়েছে তেহরান।
তবে এ মুহূর্তে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাপাল্টি হামলা চালাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি বাতিল হয়ে গেছে এবং আবারও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছেন তিনি।
এই পরিস্থিতিতে আলোচনার তেমন কোনো সুযোগ নেই বলেই ভাবছেন সংশ্লিষ্টরা।

