বাংলাদেশের অভিনয়জগতের অন্যতম নাম রাইসুল ইসলাম আসাদ। একসময় মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে সমান ব্যস্ত ছিলেন এই গুণী অভিনেতা। এখন অভিনয়ে খুব একটা নিয়মিত নন। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা শহরের গেরিলা যোদ্ধা ছিলেন।
জীবনের ৭৩ বছর পেরিয়ে ৭৪ বছরে পা রাখা রাইসুল ইসলাম আসাদ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। সেখান থেকেই কথা বলেছেন দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে।
জীবনকে কীভাবে দেখেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে রাইসুল ইসলাম আসাদ বলেন, ‘জীবনের চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই। বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ। প্রাণভরে শ্বাস নেওয়া, প্রতিদিন নতুন একটি সকাল দেখা—এসবের মধ্যেই জীবনের সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। তাই আমার কাছে জীবনের চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই।’
টাকার প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করলেও তিনি মনে করেন, ভালো থাকার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না।
‘মানুষের জীবনে টাকার দরকার আছে, কিন্তু খুব বেশি টাকার দরকার নেই। কম নিয়েও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা যায়। আমাদের চারপাশেই তার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে,’ বলেন তিনি।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে এই বরেণ্য অভিনেতা বলেন, ‘জীবনে অনেক সম্মান পেয়েছি, মানুষের অগাধ ভালোবাসা পেয়েছি। এগুলোই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
কথা বলতে বলতে ফিরে যান মঞ্চনাটকের সেই দিনগুলোয়। ঢাকা থিয়েটারের হয়ে একসময় নিয়মিত অভিনয় করেছেন। স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে দুই ঘনিষ্ঠ সহযাত্রী—হুমায়ূন ফরীদি ও আফজাল হোসেন।
রাইসুল ইসলাম আসাদের ভাষায়, ‘আমি সবসময়ই বলেছি, হুমায়ূন ফরীদি আমাদের সময়ের সবচেয়ে শক্তিমান অভিনেতা ছিলেন। আজও সেই কথাই বলি। তিনি আমাকে ‘আসাদ’ বলে ডাকতেন, আর আমি তাকে ‘তুই’ বলেই সম্বোধন করতাম।
আমাদের অসংখ্য আনন্দের স্মৃতি রয়েছে। একইভাবে আফজাল হোসেনও আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ। তিনি যেমন মেধাবী শিল্পী, তেমনি অসাধারণ একজন বন্ধু।’
ক্যারিয়ারে ইচ্ছা করলেই আরও অনেক কাজ করতে পারতেন বলে মনে করেন তিনি। কিন্তু সংখ্যার চেয়ে কাজের মানকেই সবসময় বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
‘চাইলেই আরও অনেক সিনেমা করতে পারতাম। কিন্তু কখনোই বেশি কাজ করার লোভ ছিল না। যতটুকু করেছি, ভালো কাজ করার চেষ্টা করেছি। হয়তো সে কারণেই ছয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি,’ বলেন তিনি।
সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী পরিচালিত কালজয়ী চলচ্চিত্র ঘুড্ডি প্রসঙ্গেও কথা বলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ। তার সহশিল্পী ছিলেন সুবর্ণা মুস্তাফা।
তিনি বলেন, ‘এত বছর পরও মানুষ ঘুড্ডির কথা বলে, গানগুলো গেয়ে শোনায়। তখন মনে হয়, ভালো কাজ কখনো পুরোনো হয় না।’
মানুষের ভালোবাসার প্রসঙ্গ উঠতেই স্মৃতির পাতা উল্টে যায় দুই দশকেরও বেশি আগের এক কঠিন সময়ে।
‘একসময় আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। দীর্ঘদিন বারডেম হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। অবস্থার অবনতি হলে আমাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরাও তখন আশাবাদী ছিলেন না। আত্মীয়-স্বজন অনেকেই ভেবেছিলেন, এটাই হয়তো শেষ দেখা।’
কিছুক্ষণ থেমে তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমি ফিরে এসেছিলাম। সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমত ও মানুষের দোয়ায় নতুন জীবন পেয়েছি। তখন দেশের শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই মানুষ আমার জন্য দোয়া করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার পর আমি বিশ্বাস করি, মানুষের ভালোবাসা আর দোয়ার চেয়ে বড় শক্তি পৃথিবীতে খুব কমই আছে।’
কৃতজ্ঞতার সুরে তিনি আরও বলেন, ‘জীবনে এত মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর আন্তরিকতা পেয়েছি, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।’
গত ১৫ জুলাই ছিল রাইসুল ইসলাম আসাদের জন্মদিন। দিনটি উপলক্ষে দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য শুভেচ্ছা পেয়েছেন তিনি।
হাসিমুখে বললেন, ‘ঢাকা থেকে সারাদিন ফোন এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অসংখ্য মানুষ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এত ভালোবাসা পেয়ে আবারও মনে হয়েছে—জীবন সত্যিই খুব সুন্দর।’

