‘হ্যান্ড অব গড’ কিংবা রাজনীতি নয়, কেবল ফুটবলে মনোযোগ দিতে চান স্কালোনি

মাঠের লড়াই ছাড়িয়ে যেখানে মিশে আছে দশকের পর দশক ধরে চলা রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর অম্ল-মধুর ইতিহাসের উপাখ্যান— ফুটবল বিশ্বে এমন দ্বৈরথ খুব কমই আছে। আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচ মানেই ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে এক অদ্ভুত শিহরণ। তবে আগামী বুধবারের হাইভোল্টেজ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের আগে মাঠের বাইরের সমস্ত আবেগকে পাশ কাটিয়ে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনির মন্ত্র একটাই— ‘মাঠে শুধুই ফুটবল।’

স্কালোনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দুই দেশের চিরবৈরী ফুটবলীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাস যা-ই বলুক না কেন, মাঠের লড়াইয়ে ফুটবলের চেয়ে বেশি কিছু পাওয়ার সুযোগ নেই।

ইতিহাস যখন খেলার মাঠে

এই দুই পরাশক্তির মুখোমুখি হওয়া মানেই স্মৃতির পাতা উল্টে ফিরে যাওয়া কিছু কালজয়ী অধ্যায়ে।

১৯৬৬ বিশ্বকাপ: ইংল্যান্ডের বিতর্কিত জয় যা এই বৈরিতার বীজ বপন করেছিল।

১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ: ফুটবলের ক্যানভাসে যোগ করে রাজনীতির এক কালো অধ্যায়।

১৯৮৬ বিশ্বকাপ: দিয়াগো ম্যারাডোনার হাত দিয়ে গোল দিয়ে বলেছিলেন ‘হ্যান্ড অব গড’। রেফারির নজর না এড়ালে গোল বাতিল হয়ে তিনি পেতে পারতেন লাল কার্ড। ওই গোলের পর আসে তার অবিস্মরণীয় শতাব্দীর সেরা গোল, যা আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছিল প্রতিশোধের আনন্দ।

১৯৯৮:  শেষ ষোলোতে টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার নাটকীয় জয়।  

২০০২ বিশ্বকাপ: ডেভিড বেকহ্যামের পেনাল্টি গোলে আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের ট্র্যাজেডি।

‘ফুটবল ম্যাচ। ব্যস, এটুকুই’

শনিবার অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা। অন্যদিকে নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ চারে পা রাখে থ্রি-লায়ন্সরা। আটলান্টায় বুধবারে এই মহামিলনের আগে স্কালোনি বিষয়টিকে স্রেফ একটি খেলা হিসেবেই দেখছেন।

সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, ‘এটি একটি ফুটবল ম্যাচ। ব্যস, এটুকুই। এর বাইরে আর কিছুই নেই। এর মধ্যে অন্য কিছু খোঁজার চেষ্টা না করাই ভালো। আমরা একটি দুর্দান্ত দলের বিরুদ্ধে খেলতে যাচ্ছি, যাদের একজন দারুণ কোচ আছেন যাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ ও সম্মান করি।’

ছায়া ফেলছে ফকল্যান্ডের স্মৃতি

আর্জেন্টিনায় যা ‘মালভিনাস’ নামে পরিচিত, সেই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দুই দেশের মধ্যকার ক্ষত চার দশক পার হলেও এখনো টাটকা। ১৯৮২ সালের সেই সংক্ষিপ্ত কিন্তু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন ও ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা প্রাণ হারান।

চলতি বিশ্বকাপেও গ্যালারিতে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের কণ্ঠে বারবার ফিরে এসেছে এই দ্বীপপুঞ্জের কথা। ম্যারাডোনা আর লিওনেল মেসির কীর্তির সঙ্গে ফকল্যান্ডের স্মৃতি মিলিয়ে গান গাইছেন সমর্থকেরা।

দলের ফরোয়ার্ড হোসে ম্যানুয়েল লোপেজ এই ঐতিহাসিক আবেগের কথা স্বীকার করলেও পেশাদারিত্বকেই এগিয়ে রাখছেন। তিনি বলেন, ‘মাঠের বাইরে এই ম্যাচের পেছনে বিশাল ইতিহাস, অনেক বেদনা জড়িয়ে আছে। কিন্তু আমরা পেশাদার। আমরা প্রতিটা ম্যাচ যেভাবে খেলি, এটাও সেভাবেই খেলব। শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত মাঠের সবকিছু উজাড় করে দেব।’

লোপেজ আরও যোগ করেন, ‘এটি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। শৈশবে ফুটবলে প্রথম লাথি মারার পর থেকে আমরা সবাই এই দিনটির স্বপ্ন দেখেছি। এর চেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আর হতে পারে না।’

ব্যাক-টু-ব্যাক বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে আর্জেন্টিনার সামনে এখন কঠিন পরীক্ষা। ইতিহাস, আবেগ আর মাঠের লড়াই— সব মিলিয়ে আটলান্টার বুধবারে ফুটবলবিশ্ব এক চরম উত্তেজনার অপেক্ষায়।

 

Related Articles

Latest Posts