ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলার মাঝে খামেনির মরদেহ ইরাকে

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মরদেহ ইরাকে এসে পৌঁছিয়েছে। এরপর দেশটির পবিত্র নগরী নাজাফের সড়কে লাখো মানুষ খামেনির কফিনসহ শোকযাত্রায় অংশ নেয়।

আজ বুধবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

গত শনিবার থেকে প্রয়াত খামেনির রাষ্ট্রীয় শোক ও জানাজার আনুষ্ঠানিকতা চলছে।

আজ বুধবার ওই আনুষ্ঠানিকতার পঞ্চম দিনটি শিয়া অধ্যুষিত ইরাকবাসীদের জন্য নিবেদন করা হয়েছে।

ইরানের প্রত্যাশা, প্রয়াত নেতার জানাজাকে ঘিরে এই বিপুল আয়োজন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পর ঐক্য ও শক্তিমত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুগপৎ হামলা চালিয়ে এই যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায় ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র। সেদিনই খামেনি ও তার পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হন।

এমন সময় নাজাফের এই শোকযাত্রা শুরু হলো, যখন আবারও নতুন করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনায় শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর ও দ্রুত যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে তিনটি জাহাজে তেহরান হামলা চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের কয়েক ডজন সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামলা চালানোর দাবি করেছে।

পরবর্তীতে ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সেনাবাহিনীর অধীনে থাকা অন্তত ৮৫টি লক্ষ্যে পাল্টা হামলা চালানোর দাবি করে।

ইরানের পবিত্র শহর কোমে জনাকীর্ণ শোকযাত্রার শেষে মঙ্গলবার রাতে ইরাকের কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদরা নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে খামেনির মরদেহ গ্রহণ করেন।

এ সময় সেখানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও প্রয়াত নেতার একজন সন্তান উপস্থিত ছিলেন।

ইরাক কর্তৃপক্ষ আজকের দিনটিকে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। সকাল ৬টা (বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টা) থেকে নাজাফে শোকযাত্রা শুরু হয়।

কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাঝে একটি ট্রাকে করে খামেনির মরদেহ বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জামাতা হজরত আলী (রা.)-এর মাজারে নিয়ে যাওয়া হয়।

উল্লেখ্য, শিয়া মুসলিমদের কাছে শ্রদ্ধাভাজন হিসেবে বিবেচিত ১২ ইমামের মধ্যে প্রথম ইমাম হজরত আলী (রা.)।

হজরত আলী (রা.)-এর মাজারে খামেনির জন্য দোয়া পড়ানো হয়। তারপর সেখান থেকে তার মরদেহ কারবালা শহরে নিয়ে যাওয়া হয়।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার নিজের জন্মস্থান মাশহাদ শহরে খামেনিকে কবর দেওয়া হবে। শহরটি ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত।

মঙ্গলবার বিমানবন্দরে খামেনির বড় ছেলে মোস্তাফা খামেনি উপস্থিত ছিলেন।

খামেনির মৃত্যুর অল্প সময় পর তার উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচিত হন দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনি। খামেনির ওপর হামলার দিনে তিনিও আহত হন।

নিরাপত্তাজনিত কারণে মোজতবা খামেনি এখনো জনসম্মুখে আসেননি। তবে লিখিত বার্তার মাধ্যমে তিনি সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

শিয়াদের কাছে নাজাফ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর।

ওই শহরে অসংখ্য শিয়া ধর্মগুরু পড়ালেখা করেছেন, শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন এবং বসবাস করেছেন। তাদের মধ্যে খামেনির পূর্বসুরী আয়াতোল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি অন্যতম।

নাজাফ থেকে উড়োজাহাজে করে খামেনির মরদেহ ৬০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত কারবালায় নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে আরেকটি শোকযাত্রার মাধ্যমে তার মরদেহ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসেন ও তার ভাই আব্বাসের মাজারে নেওয়া হবে।

শিয়াদের ইতিহাসে তৃতীয় শিয়া ইমাম হিসেবে বিবেচিত ইমাম হুসেনের মৃত্যু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রতি বছর লাখো মানুষ কারবালা ও নাজাফ সফর করেন।

নাজাফ ও কারবালায় শোকযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের বিনামূল্যে খাবার ও পানীয় দেওয়ার জন্য সড়কের দুই পাশেই স্বেচ্ছাসেবকরা অসংখ্য স্টল বসিয়েছেন।

শিয়া অধ্যুষিত ইরান ও ইরাকের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে বলিষ্ঠ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি বলেন, ‘এই ঐতিহাসিক আয়োজন সফল করতে ইরাকের সরকার ও জনগণের ব্যাপক প্রস্তুতি গোটা বিশ্বের সামনে ইরাক ও ইরান—এই দুই মহান জাতির গভীর আধ্যাত্মিক বন্ধনের পরিচয় তুলে ধরেছে।’

তবে দুই দেশের সম্পর্ক সব সময় এতটা শক্তিশালী ছিল না।

আশির দশকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন ইরাকের প্রয়াত নেতা সাদ্দাম হুসেইন। তিনি শিয়াদের ওপর দমন-পীড়নও চালান।

তবে ২০০৩ সালে সাদ্দামের পতনের পর দুই দেশ ঘনিষ্ঠ মিত্রে রূপান্তরিত হয়।
 

Related Articles

Latest Posts