বিশ্বকাপ থেকে প্যারাগুয়ে বিদায় নেওয়ার পর ফ্রান্সের তারকা স্ট্রাইকার কিলিয়ান এমবাপেকে আপত্তিকর বর্ণবাদী মন্তব্য করেছিলেন দেশটির সিনেটর সেলেস্তে আমারিলা। বিবৃতি দিয়ে তার মন্তব্যের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছেন এমবাপে। ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন (এফএফএফ) বিষয়টি নিয়ে একটি ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
গত শনিবার ফিলাডেলফিয়ায় শেষ ষোলোর উত্তেজনাপূর্ণ ও আগ্রাসী ম্যাচে এমবাপের পেনাল্টি গোলই ব্যবধান গড়ে দেয়। ম্যাচটিতে ফ্রান্স ১-০ গোলে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয়।
সিনেটর সেলেস্তে আমারিলা এক্স-এ (সাবেক টুইটার) একটি দীর্ঘ, বর্ণবাদী পোস্ট লেখেন। সেখানে তিনি এমবাপেকে ‘উপনিবেশিক ক্যামেরুনিয়ান, যিনি নিজেকে ফরাসি হিসেবে জাহির করার জন্য মরিয়া চেষ্টা করছেন’ এবং এবং ‘ভাষাজ্ঞানহীন’ এক ‘বর্বরের’ সঙ্গে তুলনা করেন।
আমারিলা আগ্রাসী মন্তব্যে আরও লেখেন, ম্যাচের পর প্যারাগুয়ের খেলোয়াড়দের উচিত ছিল তাকে থাপ্পড় মারা।
ফ্রান্সের অধিনায়ক এমবাপে একটি কড়া বিবৃতির মাধ্যমে এর জবাব দিয়েছেন, যেখানে তিনি কেবল নিজেরই নয়, বরং প্যারাগুয়ের খেলোয়াড়দেরও পক্ষ নিয়েছেন।
এমবাপে লিখেছেন, ‘ম্যাডাম সেলেস্তে আমারিলা, আপনি একজন নীচ নারী এবং আপনার পদের অযোগ্য। আপনি প্যারাগুয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন না—যে দেশ পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে আবেগ ও সম্মানের সঙ্গে লড়েছে।’
‘আপনার এই অবিবেচনা এবং প্রকাশ্য বর্ণবাদের কারণে পুরো বিশ্ব ইতিমধ্যেই এই বিশ্বকাপে আপনার খেলোয়াড়দের ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা এবং যাত্রার কথা ভুলে গেছে। এর বদলে জায়গা করে নিয়েছে একজন অযোগ্য নারী, যিনি তার দেশের সবচেয়ে খারাপ ভাবমূর্তি তুলে ধরছেন।’
‘আমি কখনই তার মতো মানুষদের বিশ্বজুড়ে ঘৃণা ও বর্ণবাদ ছড়ানোর স্বাধীনতা দেব না।’
ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন (এফএফএফ) বিষয়টি আরও এগিয়ে নিয়ে একটি ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। তারা এই মন্তব্যগুলোকে ‘সম্পূর্ণ ঘৃণ্য এবং অগ্রহণযোগ্য’ বলে বর্ণনা করেছে।
এফএফএফ জানিয়েছে, ‘এই মন্তব্যগুলো অপরাধমূলক এবং নিন্দনীয়। অন্য সব জায়গার মতোই এখানেও এর বিচার হওয়া উচিত। আইনি প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্যে এফএফএফ বিষয়টি সরকারি প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে জানাচ্ছে।’
‘এই মন্তব্যগুলো তাদের জন্য লজ্জাজনক যারা এগুলো করেছেন এবং যারা এগুলো ছড়াচ্ছেন। ফ্রান্সের জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা ফ্রান্সের প্রতিনিধিত্ব করেন; এটি আমাদের দেশকে অপমান করার শামিল।’
এদিকে প্যারাগুয়ে সরকারও আমারিলার মন্তব্যে নিন্দা জানিয়েছে, তারা এই বক্তব্যের জন্য ‘দুঃখ প্রকাশ করছে এবং এটি প্রত্যাখ্যান করছে।’ তারা বলেছে, এগুলো ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং মানব মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধার মূল্যবোধ ও নীতিমালার পরিপন্থী, যা আমাদের দেশ প্রচার করে।’
প্যারাগুয়ে সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘উক্ত আইনপ্রণেতার বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে আইন বিভাগের একজন সদস্য হিসেবে তার ব্যক্তিগত দায়িত্বের বহিঃপ্রকাশ এবং এটি কোনোভাবেই প্যারাগুয়ে প্রজাতন্ত্রের সরকার বা প্যারাগুয়ের জনগণের অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে না।’
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর কার্যালয় জানিয়েছে, প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট তার সঙ্গে যোগাযোগ করে সমর্থন জানিয়েছেন এবং এই মন্তব্যের নিন্দা করেছেন।
গত মঙ্গলবার ম্যাক্রোঁ তার অধিনায়কের প্রতি সমর্থনের বাণী ব্যক্ত করেছেন। এক্স-এ একটি পোস্টে তিনি বলেন, ‘কিলিয়ান এমবাপের আরও একটি গোল। এবার বর্ণবাদের বিরুদ্ধে। আমার সম্পূর্ণ সমর্থন রইল। যখন শব্দ কলঙ্কিত করে, তখন আমাদের মূল্যবোধ জবাব দেয়: মর্যাদা, শ্রদ্ধা, ভ্রাতৃত্ব।’
দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটির আইনসভার নেতা বাসিলিও নুনেজ বলেছেন, এই মন্তব্যগুলো প্যারাগুয়েনদের ‘প্রকৃত মূল্যবোধ’ প্রকাশ করে না।
নুনেজ বলেন, ‘জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে আমি বর্ণবাদী, বিদেশি-বিদ্বেষী এবং যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়া বার্তার তীব্র নিন্দা জানাই।’
‘প্যারাগুয়ে জাতীয় দল বিশ্বকাপে সম্মান ও সাহসের সঙ্গে তাদের উজাড় করে দিয়েছে। রাজনীতি ও খেলাধুলাকে আলাদা রাখা উচিত।’
ফ্রান্সের সহকারী কোচ গাই স্টিফেন বলেছেন, ‘আমরা এখনও কিলিয়ানের সঙ্গে কথা বলিনি, সেই সুযোগ হয়নি। তবে তিন শব্দে বলতে গেলে: এটি লজ্জাজনক, জঘন্য ও আপত্তিকর।’

