জুলাইয়ের চেতনা যারা বিক্রি করছে, তাদের পরিণতি ভবিষ্যতে দেখা যাবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, ‘যারা জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক সংগঠন করে, রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য চেতনা বিক্রি করছে, তাদের পরিণতি কিন্তু ভবিষ্যতে দেখা যাবে। ইতিহাস কিন্তু তাই।’
‘যারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করতো, তারা চেতনা বিক্রি করতে করতে আজকে দিল্লি যেয়ে বসে আছে। বাংলাদেশের মানুষ তাদেরকে উৎখাত করেছে। সুতরাং চেতনা বিক্রির ব্যবসা ভালো নয়। রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার উদ্দেশ্য ভালো নয়,’ যোগ করেন তিনি।
আজ শনিবার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলনে’ তিনি এ কথা বলেন।
জুলাই চব্বিশ শহীদ পরিবার সোসাইটি ও আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি এর আয়োজন করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংগঠন দুটির প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে যেন আমরা কেউ ব্যবসা না করি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসকে ধারণ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অনাগতকালে, ভবিষ্যতে আমাদের প্রজন্মরা যেন দেখে স্বৈরাচার-ফ্যাসিবাদের পতন কীভাবে হয়েছিল। ফ্যাসিবাদী-স্বৈরাচারী আচরণ যেন ভবিষ্যতের কোনো সরকার না করে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘একটা ভস্মের ওপরে দাঁড়িয়ে আমরা রাষ্ট্রের দায়িত্ব পেয়েছি, জনগণ দিয়েছে। সেই ভস্মের মধ্যে কিছু নেই! সারা বাংলাদেশের অর্থনীতি ফোকলা অবস্থা। ব্যাংকিং খাত লুটপাট হয়ে গেছে। ৩০ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। দাবি আমাদের অনেক, জাতির প্রত্যাশা অনেক, আকাশ ছোঁয়া কিন্তু আমাদেরকে বাস্তবতায় আসতে হবে। আমাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি কোথায়? আমাদের নেতা যে পরিকল্পনা করেছেন, আমরা যে বাজেট দিয়েছি ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। সেই বাজেট বাস্তবায়নের মধ্যে কী আছে? এই সমস্ত সামাজিক নিরাপত্তা খাতগুলো আছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যে সমস্ত বিষয় সমাধান করতে চাই, সেই বিষয়গুলো যদি আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই, তাহলে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমাদেরকে সহযোগিতা করতে হবে।’
‘আমরা শুধু চাই চাই আর চাই করতে পারবো না। আমাদের পরিকল্পনা আছে, কিন্তু সেই আর্থিক সামর্থ্য অর্জন করার জন্য আমাদেরকে সময় দিতে হবে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নেতৃত্বের হাতকে শক্তিশালী করতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।
জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে ‘পর্দার আড়ালের কথা’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি ও আমার নেতা তারেক রহমান—দুইজনেই আমরা নির্বাসিত ছিলাম। আল্লাহর কী মহিমা! যদি আমরা নির্বাসিত না থাকতাম, হয়তো এই জুলাইয়ের মতো একটা অভ্যুত্থান সফলভাবে সমাপ্ত করা সম্ভব হতো না। এটাই হচ্ছে পর্দা অন্তরালের কথা।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনোদিন আমরা ঘুমাইনি। ২৪টা ঘণ্টা সমন্বয় করে আমাদের নেতাকর্মীদেরকে বিভিন্নভাবে সংগঠিত করে, এই জুলাই যোদ্ধাদের সম্মুখে রেখে অরাজনৈতিক পরিচয়ে এই আন্দোলনের একটা পর্যায় পর্যন্ত আমরা নিয়ে এসেছি।’
‘৩-৪ তারিখে আমরা যখন নৈতিক সমর্থন দেই, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে যেদিন আমরা ১৬ জুলাই পর্যন্ত পৌঁছালাম, সেদিন আমার নেতা বলেছেন—দফা এক, দাবি এক, স্বৈরাচারের পদত্যাগ। অন্য কোনোভাবে এই সমস্যার সমাধান হবে না। আজকে যারা জুলাই যোদ্ধাদের নেতৃত্ব দাবি করেন, তাদের অনেকেই সেদিন বলেছিল, আমাদের কোনো রাজনৈতিক দাবি নাই। আমাদের দাবি বৈষম্যহীন এই ছাত্র আন্দোলনের দাবি, বৈষম্য দূর করতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন বলেন, ‘আমরা জানি, স্বৈরাচারকে গদিতে রেখে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাদেরকে আমরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছি, কিন্তু তাদের সেই সাহস ছিল না। আমরা রাজনৈতিকভাবে সমগ্র বাংলাদেশের সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে শত-সহস্র শহীদের রক্তের স্রোতের মধ্য দিয়ে আমরা এই জায়গায় এসেছি আজকে। এই বাংলাদেশ রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। এই মানচিত্র রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা বিজয় অর্জন করেছি ৫ আগস্ট। সেখানে রাজনৈতিক পরিচয় যদি বিভাজন করি, তাহলে সর্ববৃহৎ অংশটি থাকবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের-যুবদলের-বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের।’
তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের রিপোর্টে এক হাজার ৪০০ (প্রাণহানির) এর কথা বলা আছে, কিন্তু অফিশিয়ালি বিভিন্ন পত্রিকা ও জরিপে ৭০০ থেকে ৮০০ এর মতো খতিয়ান পাওয়া যায়। বাকিগুলো গেল কোথায়? কারণ শহীদের খতিয়ান হসপিটাল রক্ষা করতে পারে নাই। তাদের ডকুমেন্ট পর্যন্ত গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে দাফন করা হয়েছে যেন বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে। আজকে স্বজনরা তার কবরের সন্ধান করে, আমরা দিতে পারি না। এ রকম একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরে, গণহত্যার পরে আজও পর্যন্ত সেই গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার কোনো রকমের অনুশোচনা নাই। তারা জুলাই যোদ্ধাদেরকে অপরাধী হিসেবে তকমা দিচ্ছে। বাংলাদেশের এই গণঅভ্যুত্থানকে তারা একটা জঙ্গি তকমা দিচ্ছে। বাংলাদেশে নাকি জঙ্গিবাদের মধ্য দিয়ে তাদের রাষ্ট্র ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর চেয়ে লজ্জার আর কিছু নেই।’
‘তাদের মধ্যে অনুশোচনাও নেই, দোষ স্বীকারের সেই অবস্থাও তাদের নেই। সেই ইতিহাসই তাদের নেই। তারা উল্টো বিদেশে বসে বাংলাদেশে এখন নাকি গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকমের ষড়যন্ত্র করছে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পতন হয়েছে। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে নিপাত হয়েছে, নির্মূল হয়েছে। দাফন হয়ে গেছে দিল্লিতে। সেই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর কোনোদিন রাজনীতি করতে পারবে না। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করেছি আমরা। আপনারা দাবি করেছেন, তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে, ইনশাআল্লাহ খুব শিগগির রাজনৈতিক দল হিসেবে বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়া হবে,’ যোগ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইন সংশোধন করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আছে, আইসিটি অ্যাক্টে আছে, রাজনৈতিক দলের-সংগঠনের বিচার করা যাবে। সুতরাং অপেক্ষা করুন।’
সালাহউদ্দিন বলেন, ‘শফিউল আলম শফী আমার প্রতিবেশী, আমার গ্রামের…তার সন্তান শহীদ ওয়াসিম আকরাম। তাকে চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ বলা হলেও যদি সময়ের দিক বিবেচনা করা হয়, আবু সাঈদের সাময়িক সময়ে সে শাহাদত বরণ করেছে।’
শিলংয়ে দেখা করার স্মৃতিচারণ করেন সালাহউদ্দিন।

