বিশ্বকাপ ফুটবলে যেভাবে এলো লাল-হলুদ কার্ড

খেলা তখন অতিরিক্ত সময়ে গড়িয়েছে। ঘড়ির কাঁটায় ১১০ মিনিট। বার্লিনের অলিম্পিক স্টেডিয়ামজুড়ে উত্তেজনার বারুদ। বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষে ফ্রান্স ও ইতালি ১-১ গোলে সমতায়।

খেলোয়াড়রা সব ক্লান্ত হলেও মাথার মধ্যে বিশ্বকাপ জয়ের নেশা। ঠিক সেই মুহূর্তে ফুটবল বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে দেখল ইতিহাসের সবচেয়ে আকস্মিক ঘটনটি।

ইতালির ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জির সঙ্গে হঠাৎ উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে জড়িয়ে পড়েন ফরাসি মিডফিল্ডার জিনেদিন জিদান। মাতেরাজ্জি একটা উসকানিমূলক কথা বলতেই থমকে দাঁড়ান জিদান। ঘুরে মাতেরাজ্জির দিকে ফিরে মাথা নিচু করে সজোরে এক ঢুস (হেডবাট) মেরে বসলেন ইতালি ডিফেন্ডারের বুকে। ঘাসের ওপর ছিটকে পড়লেন মাতেরাজ্জি।

ছুটে এলেন আর্জেন্টাইন রেফারি হোরাসিও এলিজোন্দো। এরপরই শূন্যে ভেসে উঠল সেই নিষ্ঠুর লাল কার্ড। জাদুকরের শেষ জাদুর পরিণতি হলো এক মর্মান্তিক পতন।

বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফির পাশ দিয়ে মাথা নিচু করে বিদায় নিলেন ফুটবলের এক মহান সম্রাট, যা ইতিহাসে এক স্মরণীয় মুহূর্ত।

এক ঢুস ও একটি লাল কার্ডে শেষ হয় ব্যালন ডি’অর জয়ী জিদানের বর্ণাঢ্য ফুটবল ক্যারিয়ার।

একটি লাল কার্ড কীভাবে মুহূর্তেই ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে, ২০০৬ বিশ্বকাপে জিদানের ঘটনা তার বড় উদাহরণ। এই ঘটনা প্রতি চার বছর পরপর ফুটবল বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয় একটি লাল কার্ডের ক্ষমতা কতখানি।

ফুটবল বিশ্বকাপে লাল ও হলুদ কার্ডের প্রচলন শুরুর পেছনের ঘটনাটা কিন্তু এত মর্মান্তিক বা দুঃখজনক নয়।

আজ থেকে ৬০ বছর আগে ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা।

ম্যাচের ৩৫ মিনিটে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে মাঠ থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন রেফারি রুডলফ ক্রেইটলিন। কারণ হিসেবে বলা হয়, রেফারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বারবার প্রতিবাদ করছিলেন রাতিন।

কিন্তু সমস্যা হলো রেফারি ক্রেইটলিন জার্মান ভাষায় নির্দেশ দিচ্ছিলেন আর রাতিন জার্মান ভাষা জানতেন না, তিনি স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলছিলেন।

ভাষা না বোঝার কারণে রাতিন বুঝতেই পারছিলেন না কেন তাকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। তিনি মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান এবং প্রায় ১০ মিনিট খেলা বন্ধ থাকে। মাঠে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত পুলিশ ডেকে রাতিনকে মাঠ থেকে সরাতে হয়।

এই ঘটনা ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। আর্জেন্টিনা অভিযোগ করে রেফারি পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন, আর ইংল্যান্ডের গণমাধ্যম আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের আচরণের সমালোচনা করে।

এই ঘটনার পর জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রেইটলিন ও ইংরেজ রেফারি কেন অ্যাস্টন ভাবতে শুরু করেন—ভাষাগত বিভ্রান্তি দূর করার সহজ উপায় কী?

একদিন লন্ডনে গাড়ি চালানোর সময় ট্রাফিক সিগন্যাল দেখে অ্যাস্টনের মাথায় ধারণাটি আসে। হলুদ বাতির অর্থ হলো সতর্কতা আর লাল বাতি মানে থামতে হবে।

তিনি ফিফার কাছে লাল-হলুদ কার্ড প্রচলনের প্রস্তাব দেন। যেখানে হলুদ কার্ড দেখানোর অর্থ খেলোয়াড়কে সতর্ক করা এবং লাল কার্ড দেখানোর অর্থ তাকে বহিষ্কার করা।

এতে ভাষা না বুঝলেও খেলোয়াড়, দর্শক ও কোচ সবাই সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারবে রেফারির সিদ্ধান্ত।

ফিফা এই প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং ১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে হলুদ ও লাল কার্ড চালু হয়।

যদিও ওই বিশ্বকাপে একটি লাল কার্ডও দেখানো হয়নি। তবে এরপর থেকে কার্ড ব্যবস্থা ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে।

ফুটবল খেলায় গুরুতর অপরাধের জন্য লাল কার্ড দেখানো হয়। লাল কার্ড দেখানো হলে খেলোয়াড়কে সঙ্গে সঙ্গে মাঠ ছাড়তে হয় এবং তার দলকে বাকি সময় একজন খেলোয়াড় কম নিয়ে খেলতে হয়। সাধারণত পরের ম্যাচেও নিষিদ্ধ থাকেন ওই খেলোয়াড়।

• গুরুতর ফাউল
• সহিংস আচরণ
• প্রতিপক্ষের গোলের সুযোগ নষ্ট করতে ইচ্ছাকৃত ফাউল
• বল হাতে নিয়ে গোল ঠেকানো
• থুতু দেওয়া বা কামড় দেওয়া
• গালাগাল বা অপমানজনক আচরণ
• তর্কের সময় মুখ ঢেকে কটূক্তি করলে 
• রেফারির সিদ্ধান্তের বারবার প্রতিবাদ করলে
• একই ম্যাচে দুটি হলুদ কার্ড পাওয়া

বর্তমানে ফুটবল মাঠের চারপাশে অসংখ্য উন্নত প্রযুক্তির ক্যামেরা বসানো থাকে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে খেলার মাঠে যেকোনো ঘটনা কীভাবে ঘটেছে, কারণ কী এবং কে দোষী, তা খুব দ্রুত শনাক্ত করতে পারে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর। লাল কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে বাস্তবে রেফারির সঙ্গে সঙ্গে ভিএআর প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয় এখন। ভিএআর প্রয়োজনে রেফারিকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার পরামর্শও দিতে পারে।

তুলনামূলক কম গুরুতর অপরাধের জন্য হলুদ কার্ড দেখানো হয়। হলুদ কার্ড মূলত খেলোয়াড়কে সতর্ক করে। ফুটবলের ভাষায় একে বলা হয় ‘বুকিং’। একবার হলুদ কার্ড পেলেও ম্যাচ চালিয়ে যেতে পারেন একজন খেলোয়াড়।

তবে একই ম্যাচে দুটি হলুদ কার্ড পেলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি লাল কার্ড হিসেবে গণ্য হয় এবং খেলোয়াড়কে মাঠ ছাড়তে হয়।

• বেপরোয়া ট্যাকল বা বেপরোয়াভাবে বল কেড়ে নেওয়া
• সময় নষ্ট করা
• গোল করার পর অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস ও উদযাপন
• প্রতিপক্ষের সম্ভাবনাময় আক্রমণ থামানো
• বারবার ফাউল করা
• রেফারির সঙ্গে তর্ক করা
• ডাইভ দিয়ে ফাউল আদায়ের চেষ্টা
• প্রতিপক্ষকে কার্ড পাইয়ে দেওয়ার জন্য ফাউলের অভিনয় করা

শুধু মাঠের ভেতরে নয়, বাইরে বেঞ্চে থাকা বদলি খেলোয়াড় ও দলীয় কর্মকর্তারাও একই ধরনের আচরণের জন্য হলুদ কার্ড পেতে পারেন।

বিশ্বকাপে দুটি আলাদা ম্যাচে দুটি হলুদ কার্ড পেলে পরের ম্যাচে খেলতে পারেন না সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়।

তবে গ্রুপপর্ব শেষে খেলোয়াড়দের একক হলুদ কার্ডের হিসাব মুছে ফেলা হয়। একইভাবে কোয়ার্টার ফাইনালের পরেও নির্দিষ্ট নিয়মে কিছু কার্ডের হিসাব বাতিল করা হয়, যাতে পুরোনো হলুদ কার্ডের কারণে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ মিস না করতে হয়।

২০০৬ বিশ্বকাপে জিনেদিন জিদানের লাল কার্ড পাওয়ার ঘটনা খুব আলোচিত হলেও ফুটবল বিশ্বকাপে আরও কিছু হৃদয়বিদারক ও মজার ঘটনা আছে।

১৯৯০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড ও পশ্চিম জার্মানির খেলা অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। এ সময় জার্মান ডিফেন্ডার থমাস বার্থহোল্ডকে ফাউল করে বসেন ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার পল গ্যাসকোয়েন। রেফারি তাকে হলুদ কার্ড দেখান।

সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। এটি ছিল টুর্নামেন্টে গ্যাসকোয়েনের দ্বিতীয় হলুদ কার্ড। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, দুটি হলুদ কার্ড পেলে পরের ম্যাচ খেলতে পারবেন না ওই খেলোয়াড়।

কার্ড দেখানোর সঙ্গে সঙ্গেই গ্যাসকোয়েন বিষয়টি বুঝে ফেলেন। তিনি জানতেন, ইংল্যান্ড ফাইনালে উঠলেও খেলতে পারবেন না তিনি।

সেই হতাশা, আবেগ ও অসহায়ত্ব ধরে রাখতে পারেননি পল। মাঠের মধ্যেই কেঁদে ফেলেন তিনি। জার্সি দিয়ে তার চোখের পানি মোছার দৃশ্য ক্যামেরায় বন্দি হয় এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক ছবিতে পরিণত হয়।

শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি টাইব্রেকারে হেরে যায় ইংল্যান্ড। ফলে গ্যাসকোয়েনের ফাইনাল মিস করার আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয়নি।

কিন্তু এই ঘটনা ফুটবল বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেয় কখনো কখনো একটি হলুদ কার্ডও অনেক বড় হয়ে উঠতে পারে।

ফুটবল বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্রুততম সময়ে লাল কার্ড পাওয়ার ঘটনা ঘটে ১৯৮৬ সালে। স্কটল্যান্ডের গর্ডন স্ট্রাচানকে ফাউল করার অপরাধে উরুগুয়ের জোসে বাতিস্তা ম্যাচ শুরুর মাত্র ৫৬ সেকেন্ডের মাথায় লাল কার্ড পান।

কার্ড দেখানোর জন্য শুধু খেলোয়াড়ই নয়, ভুল করলে রেফারিকেও যে পস্তাতে হয় তার উদাহরণ—২০০৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ক্রোয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচ।

ম্যাচের ৬১ মিনিটে অস্ট্রেলীয় ফরোয়ার্ড হ্যারি কিউয়েলকে ফাউল করলে ক্রোয়েশিয়ার ডিফেন্ডার জোসিপ সিমুনিচকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি গ্রাহাম পোল।

৯০ মিনিটে বেপরোয়া ট্যাকলের জন্য সিমুনিচকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখান রেফারি।

নিয়ম অনুযায়ী, দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের পরই তাকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু ভুলবশত রেফারি পোল লাল কার্ড বের করেননি।

ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর সিমুনিচ রেফারির সঙ্গে তর্কে জড়ালে রেফারি পোল তাকে তৃতীয় হলুদ কার্ড এবং এরপর লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন।

এ ঘটনা ফিফা ও ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। রেফারি গ্রাহাম পোল নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং সমালোচনার মুখে তাকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ম্যাচ পরিচালনা করা থেকে বিরত রাখা হয়।

২০০৬ বিশ্বকাপে আরও একটি ঘটনা বেশ আলোচিত। শেষ ১৬ এর নকআউট পর্বে পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যকার ম্যাচটি ‘ব্যাটল অব নুরেমবার্গ’ নামে পরিচিত। রুশ রেফারি ভ্যালেন্টিন ইভানোভ সেই ম্যাচে রেকর্ড ২০টি কার্ড দেখিয়েছিলেন—যার মধ্যে ১৬টি হলুদ কার্ড ও ৪টি লাল কার্ড ছিল।

Related Articles

Latest Posts