ধান তলিয়েছে বন্যায়, হাওরের কৃষকদের ভরসা এখন মাছ

বোরো ধান কাটার ভরা মৌসুমে হঠাৎ পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে মৌলভীবাজারের কাউয়াদিঘি হাওরের শত শত হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। পাকা ধান ঘরে তোলার আগেই ফসল হারিয়ে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় এখন মাছ ধরেই সংসারের খরচ জোগাচ্ছেন তারা।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের হাওরপারের খইশাউড়া গ্রামের বাসিন্দা সাদিক মিয়া জানান, বোরো আবাদের জন্য তিনি ছয় কিয়ারা (প্রতি কিয়ারা ৩০ শতক) জমি ১২ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছিলেন। ধান বুনতে খরচ করেছিলেন ২৫-৩০ হাজার টাকা। কিন্তু মাত্র এক কিয়ারা জমি থেকে ১২ মণ ধান পেয়েছেন। এর আগেই বন্যার পানিতে বাকি পাঁচ কিয়ারা জমি তলিয়ে যায়।

সাদিক মিয়া বলেন, এই ক্ষতি শুধু তার একার নয়। এলাকার প্রায় প্রতিটি পরিবারই আট থেকে ১০ কিয়ারা জমিতে চাষ করেছিল। তাদের বেশির ভাগেরই অন্তত পাঁচ থেকে সাত কিয়ারা জমির ধান বন্যায় নষ্ট হয়েছে। কিছু পরিবার তো এক মুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারেনি। যারা সারা বছর নিজেদের খেতের চাল খেতেন, তাদেরকেও এখন বাজার থেকে চাল কিনে খেতে হবে।

সাদিক মিয়া আরও জানান, ধান না থাকায় এখন মাছ ধরাই তার সংসারের একমাত্র অবলম্বন। সারা দিন হাওরে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় হয়। এই টাকা দিয়েই তার ছয় জনের পরিবারের খরচ চলছে।

স্থানীয়রা জানান, করমউল্লাহপুর, কালাইপুরা ও খইশাউড়া গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই কৃষিকাজের পাশাপাশি হাওরে মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত। বর্ষাকালে প্রতিদিন এসব গ্রাম থেকে ১৫০ থেকে ২০০টি নৌকা হাওরে মাছ ধরতে যায়। বিকেলে বা সন্ধ্যায় জাল ফেলে ভোরে মাছ নিয়ে ফেরেন।

করমউল্লাহপুর কালভার্টের কাছে প্রতিদিন বিকেলে বসে মাছের পাইকারি বাজার। সেখানে মলা, পুঁটি, টেংরা, কই ও চান্দাসহ নানা প্রজাতির ছোট মাছ বিক্রি হয়। খুচরা বিক্রেতারা এখান থেকে মাছ কিনে মৌলভীবাজার শহরের টিসি মার্কেট ও পশ্চিম বাজারে বিক্রি করেন।

কালভার্টের কাছেই দেখা মেলে খইশাউড়ার মোশাররফ মিয়ার। খইশাউড়া গ্রামের মোশাররফ জানান, তিনি দুপুর দুইটা থেকে হাওরে মাছ ধরে বিকেলে ৫০০-৬০০ টাকার মাছ নিয়ে ফিরেছেন। তার ভাগনে তানজিল হাসানও পেশায় জেলে। তিনি জানান, প্রতিদিন ভোর ৩টায় মাছ ধরতে হাওরে নামতে হয় তাকে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আমির জানান, বন্যায় মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে কৃষকদের জমির পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। যে পানি কৃষকের ফসল কেড়ে নিয়েছে, সেই হাওরের পানিতে মাছ ধরেই এখন এই পরিবারগুলো বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে। 

Related Articles

Latest Posts