একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য জামায়াতে ইসলামীর জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত—বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এমন বক্তব্যের জবাবে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেছেন, স্বাধীনতার পর বিএনপি ক্ষমতায় এসে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া অন্তত ১৪ থেকে ১৫ জন ব্যক্তিকে মন্ত্রী, এমপি, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী করেছিল। তাই এ বিষয়ে জবাব বিএনপিকেই দিতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম মিলনায়তনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ৩৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
গত রোববার জাতীয় সংসদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতার জন্য জামায়াতকে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান।
মির্জা ফখরুলকে উদ্দেশ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আয়নায় নিজের চেহারা দেখুন। ক্ষমা আপনার বাবাকে কবর থেকে চাইতে বলেন। কারণ আমরা অপরাধ করি নাই, ক্ষমা চাইব কেন? আপনার বাবা অপরাধী, এই অভিযোগ আছে। সুতরাং কথা সতর্কভাবে বলা উচিত।’
একাত্তরের প্রসঙ্গ টেনে আনার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘তারা বলে জামায়াতের ওপরে ভূত চেপেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, সরকার আর সরকারি দলের ওপরে ভূত চেপেছে। বিএনপি মহাসচিবের মাথায়ও মাঝে মাঝে ভূত চাপে। কিছুদিন গেলেই ৫০-৬০ বছরের পুরোনো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মীমাংসিত বিষয়কে সামনে এনে জাতির মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেন।’
মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সেই পাকিস্তান আমলে সেই সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক রাজনৈতিক দল ভারতীয় আগ্রাসন থেকে বাঁচার জন্য কী ভূমিকা পালন করেছিল, সেই দলের সে সময়কার নেতৃবৃন্দ তার ব্যাখ্যা, তার বক্তব্য জাতির সামনে তারাই তখন দিয়েছিল। তারা এখন অনেকেই দুনিয়াতে নেই। সেই ব্যাখ্যা কারও পছন্দ হতে পারে, না–ও হতে পারে, সেটা রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হতে পারে।’
বিএনপির সঙ্গে অতীতের জোটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘এখন যে প্রশ্ন বিএনপি তুলছে, জামায়াতের সঙ্গে জোট করার সময় তাদের সেই অবস্থান কোথায় ছিল? খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয়, ১৮-দলীয় ও ২০-দলীয় জোটে প্রায় ২০-২২ বছর বিএনপি ও জামায়াত একসঙ্গে রাজনীতি করেছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় গোলাম আযমের বাসায় বিএনপি নেতারা জামায়াতের সমর্থন চাইতে গিয়েছিলেন। চারদলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা একসঙ্গে বক্তব্য দিয়েছেন, লংমার্চ করেছেন। তখন একাত্তরের প্রশ্ন তাদের মনে ছিল না।’
১৯৯১ সালে বিএনপিকে সরকার গঠনে জামায়াতের সমর্থনের প্রসঙ্গ তুলে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘ক্ষমতায় গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের হত্যা শুরু করেছিল ছাত্রদল। এটাই কি বিএনপিকে সমর্থন দেওয়ার প্রতিদান?’
জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘যখনই জামায়াতকে মোকাবিলা করার যুক্তি ও নৈতিকতা থাকে না, তখন পুরোনো কাসুন্দি টেনে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। জামায়াতের বিরুদ্ধে যৌক্তিক সমালোচনার কিছু না পেয়ে পুরোনো মীমাংসিত বিষয় বারবার সামনে আনা হচ্ছে। তবে তারা যে আশায় এগুলো করছে, সেই আশা পূরণ হবে না।’
সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের ভূমিকারও সমালোচনা করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে দু–একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের সংবাদপত্র সরাসরি রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এমনভাবে প্রতিবেদন তৈরি করছে, যাতে মনে হয় তারা রাজনৈতিক দলের মুখপত্রের ভূমিকা পালন করছে। তারা যদি বিএনপির রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়ে থাকে, তাহলে সেটি ঘোষণা দেওয়া উচিত।’
ফ্যাসিবাদ যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন এসব সংবাদপত্র তাদের প্রতিনিধিত্ব করেছে বলেও দাবি করেন গোলাম পরওয়ার। তার ভাষ্য, সে সময় তারা নির্লজ্জভাবে ফ্যাসিবাদের দালালি করেছে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর হঠাৎ করে তারা রূপ পরিবর্তন করে ফেলেছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘অতীতে বিভাজনের রাজনীতির কারণে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। আবার বর্তমান সরকার নেপথ্যে থেকে বিভাজনের রাজনীতি শুরু করেছে।’

