বছরের পর বছর ধরে ফুটবলের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো দাবি করে এসেছে, প্রযুক্তিই পারে খেলার সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্তগুলোর সমাধান দিতে। গোললাইন প্রযুক্তি, সেমি-অটোমেটেড অফসাইড সিস্টেম কিংবা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)—সবকিছুরই লক্ষ্য ছিল ফুটবলকে আরও নির্ভুল করা, সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা।
তবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ যেন আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রযুক্তি যতই তথ্য-প্রমাণ হাজির করুক না কেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা এখনো মানুষ, অর্থাৎ রেফারিদের হাতেই।
এবারের বিশ্বকাপে বেশ কিছু নতুন নিয়ম-কানুন প্রবর্তন করেছে ফিফা। এগুলোর মধ্যে সম্প্রতি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে যে নিয়মটি সেটি হলো, কোনো খেলোয়াড় যদি প্রতিপক্ষ ফুটবলারের সাথে ‘সংঘাতপূর্ণ’ বা ‘উত্তেজনাপূর্ণ’ বাকবিতণ্ডার সময় মুখ ঢেকে কথা বলেন, তাহলে রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে পারবেন।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফিফার রেফারিং প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা অবশ্য স্পষ্ট করে বলেছিলেন, মুখ ঢেকে কথা বলা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি। খেলোয়াড়েরা স্বাভাবিক আলাপচারিতার সময় এটি করতে পারবেন। অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে তখনই, যখন কোনো সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে এটির আশ্রয় নেওয়া হবে।
এই নিয়মে প্রথম শাস্তির শিকার হয়েছেন প্যারাগুয়ের মিগুয়েল আলমিরন। তুরস্কের বিপক্ষে ম্যাচে এরকম ঘটনায় ভিএআরের পরামর্শে তাকে লাল কার্ড দেখানো হয়। তবে ভিন্ন চিত্রও আছে। মঙ্গলবার ঘানার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের ম্যাচে ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহ্যামও জর্ডান আইয়ুর সঙ্গে মুখ ঢেকেই কথা বলেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কারণ রেফারিরা মনে করেছেন, ওই মুহূর্তে কোনো সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি ছিল না।
প্রশ্ন হলো, বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপ আর সংঘাতপূর্ণ বাকবিতণ্ডার সীমারেখাটি ঠিক কোথায় টানা হবে? যখন কোনো খেলোয়াড় ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ঢেকে কথা বলেন, তখন তিনি ঠিক কী বলেছেন, তা ম্যাচ অফিশিয়ালরা নিশ্চিতভাবে জানবেন কীভাবে? কোনো খেলোয়াড় যদি আক্রমণাত্মক ভঙ্গি ছাড়াই আপত্তিকর মন্তব্য করেন, কিংবা প্রতিপক্ষ অভিযোগই না তোলে, তাহলেও কি সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার ওপর, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ওপর নয়।
একই ম্যাচে আরেকটি ঘটনায়ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঘানার দাবি ছিল, পেনাল্টি বক্সের ভেতরে প্রিন্স কাবেনা আদুকে ইংলিশ ডিফেন্ডার এজরি কনসা ফেলে দিলেও ঘানার পক্ষে পেনাল্টি দেওয়া হয়নি। রিপ্লেতেও দেখা যায়, বল স্পর্শ না করেই আদুর হাঁটুতে আঘাত করেন কনসা। তবু মাঠের রেফারি কিংবা ভিএআর—কেউই এ ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেননি। ঘানাও শেষ পর্যন্ত কোনো পেনাল্টি পায়নি।
ম্যাচ শেষে ঘানার কোচ কার্লোস কুইরোজ ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিমায় ভিএআরের সমালোচনা করতে ছাড়েননি, ‘আরও একবার মনে হলো ভিএআর বোধহয় কফি খেতে গিয়েছিল। আমি নিশ্চিত নই এই বিশ্বকাপে ভিএআর এখনও আছে কি না। ভিএআর কি আসলেই আছে? কাজ করছে ঠিকঠাক?’
এ ধরনের হতাশা পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই বারবার দেখা গেছে। আলজেরিয়ার ডিফেন্ডার আইসা মান্দির গোড়ালির ওপরে ট্যাকল করার পরও লিওনেল মেসি কোনো কার্ড দেখেননি। অথচ আন্তর্জাতিক ও ক্লাব ফুটবলে একই ধরনের ঘটনায় প্রায়ই লাল কার্ড দেওয়া হয়ে থাকে।
বিভিন্ন ম্যাচে রেফারির সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতার অভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পর্তুগালের বিপক্ষে উজবেকিস্তানের আজিজজন গানিয়েভের অসাধারণ একটি গোল বাতিল করা হয়, কারণ গোলের বিল্ড-আপের সময় পর্তুগালের খেলোয়াড়কে ফাউল করা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, আলজেরিয়া-আর্জেন্টিনার ম্যাচে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের একটি প্রায় একই ধরনের চ্যালেঞ্জ শাস্তি ছাড়াই পার পেয়ে যায় এবং পরবর্তীতে ওই আক্রমণ থেকে গোলও হয়।
অবশ্যই রেফারিং নিয়ে বিতর্ক ফুটবলের জন্য নতুন কিছু নয়। ইতিহাস জুড়েই নানা প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তের উদাহরণ রয়েছে। ১৯৩৪ সালে ইতালিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ এবং ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ঘিরে ওঠা নানা অভিযোগ থেকে শুরু করে ১৯৮৬ সালে বেলজিয়াম ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ম্যাচ, ১৯৯০ সালে ইংল্যান্ড ও ক্যামেরুনের দ্বৈরথ কিংবা ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার অবিশ্বাস্য সেমিফাইনাল যাত্রা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রেফারিং নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছে।
এছাড়াও ২০১০ সালে ইংল্যান্ড-জার্মানি ম্যাচের সেই বহুল আলোচিত ঘটনাও বিশ্বকাপ ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের দূরপাল্লার শট গোললাইন অতিক্রম করলেও ম্যানুয়েল নয়্যার বলটিকে গোললাইনের ভেতর থেকে ফিরিয়ে আনেন এবং দাবি করেন যে শটটি গোল হয়নি। সেই গোল রেফারিরা বাতিলও করে দেন। এই বিতর্কই মূলত পরবর্তীতে গোললাইন প্রযুক্তি চালুর সিদ্ধান্তের পেছনে মূল প্রভাবক হয়ে দাঁড়ায়।
২০১৮ বিশ্বকাপে ভিএআর চালুর মূল উদ্দেশ্যই ছিল এমন বিতর্ক কমিয়ে আনা। অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রযুক্তি সফলও হয়েছে। স্পষ্ট অফসাইড ভুলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, গোললাইন বিতর্ক প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা নিতে হয় মানুষকেই। মাঠের রেফারি হোক কিংবা ভিএআর কক্ষে বসা রেফারি, প্রত্যেকের সিদ্ধান্তই ব্যক্তিগত বিচার-বিবেচনার দ্বারা প্রভাবিত হয়। কখনো কখনো দলগুলোর ঐতিহাসিক মর্যাদা, খেলোয়াড়দের খ্যাতি কিংবা বাইরের নানাবিধ চাপও সেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
অস্বস্তিকর হলেও এটাই হয়তো আধুনিক ফুটবলের বাস্তবতা। প্রযুক্তি ভুল কমাতে সাহায্য করেছে বটে, কিন্তু বিতর্ক দূর করতে পারেনি। কারণ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যতদিন মানুষের হাতে থাকবে, ততদিন ন্যায়বিচার, সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা এবং পক্ষপাতিত্ব নিয়ে বিতর্কও চলতেই থাকবে।

