প্রাণীটি দেখলেই মনে হয় ঘুমকাতুরে, বিরক্ত ও ক্লান্ত

দূর থেকে দেখলে মনে হবে খরগোশ। লম্বা কান, গোলগাল মুখ, নরম লোম—সবকিছুই যেন খরগোশের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, এই প্রাণীটি মোটেও খরগোশ নয়। এমনকি খরগোশের কাছের আত্মীয়ও নয়। এটি হলো দক্ষিণ আমেরিকার এক অদ্ভুত প্রাণী ভিসকাচা।

প্রকৃতি যেন নানা প্রাণীর বৈশিষ্ট্য দিয়ে ভিসকাচাকে তৈরি করেছে। এর কান খরগোশের মতো, লেজ কাঠবিড়ালির মতো, আর লোম অনেকটা চিনচিলার মতো। ফলে প্রথম দেখায় যে কেউ বিভ্রান্ত হতে পারেন।

তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ভিসকাচার দিকে তাকালে মনে হতে পারে প্রাণীটি বোধহয় সারাক্ষণ ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে বসে থাকে। চোখেমুখে এমন এক উদাস, ক্লান্ত অভিব্যক্তি যে, পৃথিবীর কোনো কিছুতেই তার আগ্রহ নেই!
কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ভিসকাচা মোটেও অলস বা ঘুমকাতুরে নয়। তাদের মুখের গঠন এমন যে, স্বাভাবিক অবস্থাতেই ক্লান্ত বা বিরক্ত দেখায়।

একসময় কেবল পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষই ভিসকাচাকে চিনত। কিন্তু এখন তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তারকা। প্রায়ই ভিসকাচার ছবি শেয়ার করে মানুষ মজা করে লেখে, ‘কফি খাওয়ার আগের আমি’ কিংবা ‘মিটিংয়ের সময় আমার চেহারা!’

ভিসকাচা এখন কেবল একটি প্রাণীর নাম নয়, বরং ক্লান্ত অফিসকর্মী ও শিক্ষার্থীদের আবেগের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

এই জনপ্রিয়তার আরেকটি ইতিবাচক দিকও আছে। যারা প্রথমে ভিসকাচার মজার মুখ দেখে মুগ্ধ হন, তাদের অনেকেই পরে প্রাণীটির সংরক্ষণ ও আবাসস্থল রক্ষার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

ভিসকাচা হলো দক্ষিণ আমেরিকায় বসবাসকারী এক ধরনের ইঁদুরজাতীয় প্রাণী। তারা চিনচিলা পরিবারের সদস্য। বর্তমানে ভিসকাচার পাঁচটি প্রজাতি পরিচিত। এর মধ্যে একটি হলো প্লেইনস ভিসকাচা এবং বাকি চারটি হলো পাহাড়ি বা মাউন্টেন ভিসকাচা।

পাহাড়ি ভিসকাচারা বাস করে আন্দিজ পর্বতমালার দুর্গম এলাকায়। পেরু, বলিভিয়া, চিলি ও আর্জেন্টিনার উঁচু পাথুরে অঞ্চলে এদের দেখা মেলে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার মিটার উচ্চতায় এরা বসবাস করে।

অন্যদিকে প্লেইনস ভিসকাচা থাকে আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া ও প্যারাগুয়ের তৃণভূমি এবং শুষ্ক সমতল এলাকায়। তারা মাটির নিচে বিশাল সুড়ঙ্গ ও গর্তের মধ্যে আবাস গড়ে তোলে।

পাহাড়ি ভিসকাচাকে দেখলে মনে হবে লম্বা লেজওয়ালা কোনো খরগোশ। বড় বড় চোখ, লম্বা কান এবং ধূসর বা বাদামি রঙের নরম লোম তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। দৈর্ঘ্যে তারা প্রায় ৪৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

তবে প্লেইনস ভিসকাচা দেখতে একেবারেই আলাদা। আকারে বড়, শরীর মোটা এবং ওজনে প্রায় ৮ কিলোগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। অনেকটা ছোট আকৃতির ক্যাপিবারার মতো দেখতে। তাদের মুখের কালো-সাদা দাগ অনেক সময় গোঁফের মতো দেখায়।

পাহাড়ি ভিসকাচার সবচেয়ে মজার অভ্যাসগুলোর একটি হলো রোদ পোহানো।

সূর্য ওঠার পর কিংবা বিকেলের দিকে এদের প্রায়ই পাথরের ওপর বসে থাকতে দেখা যায়। কখনও শরীর পরিষ্কার করছে, কখনও বিশ্রাম নিচ্ছে, আবার কখনও শুধু রোদ পোহাচ্ছে।

আন্দিজ পর্বতের তীব্র ঠাণ্ডায় রাত কাটানোর পর শরীর গরম রাখতেই তারা এমন করে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।

ভিসকাচা সম্পূর্ণ তৃণভোজী।

পাহাড়ি ভিসকাচা ঘাস, শৈবাল, লাইকেনসহ যা কিছু উদ্ভিদ পাওয়া যায় তাই খায়। আর সমতলের ভিসকাচা ঘাস, বীজ ও বিভিন্ন ধরনের গাছপালা খেয়ে বেঁচে থাকে।

কৃষিজমির আশপাশে বসবাসকারী ভিসকাচারা মাঝে মাঝে ফসল খেয়ে ফেলে। এজন্য কৃষকরা তাদের অপছন্দ করেন।

ভিসকাচারা বেশ সামাজিক প্রাণী।

তারা বড় বড় দলে বসবাস করে এবং কোনো শিকারির উপস্থিতি টের পেলেই শব্দ করে অন্যদের সতর্ক করে দেয়।

বিশেষ করে প্লেইনস ভিসকাচারা মাটির নিচে যে আবাস তৈরি করে, সেখানে কয়েক ডজন প্রাণী একসঙ্গে থাকতে পারে।

আরও মজার বিষয় হলো, তারা গর্তের মুখে কাঠি, পাথর, হাড় এবং নানা বস্তু জমা করে রাখে। কেন এমন করে, তা এখনো বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে জানেন না।

বন্য বিড়াল, শিয়াল ও বিভিন্ন শিকারি পাখি ভিসকাচার প্রধান শত্রু।

বিশেষ করে বিরল আন্দিয়ান মাউন্টেন ক্যাটের খাদ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই হলো পাহাড়ি ভিসকাচা।

শিকারিদের হাত থেকে বাঁচতে তারা দ্রুত দৌড়ায়, উঁচু পাথরের ওপর লাফ দেয় এবং খুবই ক্ষিপ্র গতিতে দৌড়ায়।

Related Articles

Latest Posts