ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ৩২ জন নিহত এবং প্রায় ৭০০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ।
তিনি আরও জানান, উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছাবে।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ভূমিকম্প-পরবর্তী সহায়তার প্রস্তাব দেওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন রদ্রিগেজ।
এর আগে রাজধানীতে ভবন ধসে পড়া এবং দেশের প্রধান বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন।
এদিকে, নির্বাসিত বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো দেশবাসীর প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘এই দুঃসময়ে প্রতিটি ভেনেজুয়েলান পরিবারের জন্য আমার আন্তরিক আলিঙ্গন এবং প্রার্থনা রইল। এই কঠিন সময়ে আমাদের মধ্যে শক্তি, স্থিরতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বিজয়ী হোক।’
ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় বহু পরিবারের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে দেশ ছেড়ে যাওয়া ৭৭ লাখের বেশি ভেনেজুয়েলান তাদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার ভেনেজুয়েলার একই এলাকায় ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে রাজধানী কারাকাসে বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত ও ধসে পড়ে এবং দেশের প্রধান বিমানবন্দর বন্ধ করে দিতে হয়।
আজ বৃহস্পতিবার ভোরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রদ্রিগেজ বলেন, ‘এ পর্যন্ত ৩২ জনের মৃত্যুর খবর পেয়েছি এবং ৭০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।’
তবে রাজধানীর কাছের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল লা গুয়াইরা সম্পর্কে তখনও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
রদ্রিগেজ আরও বলেন, মূল ভূমিকম্প দুটির পর অন্তত ২০টি আফটারশক অনুভূত হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির সাংবাদিকরা জানান, ভূমিকম্পের পর রাজধানীজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।
৫৪ বছর বয়সী ব্যাংককর্মী ওদালিস এসকালোনা বলেন, ‘সিঁড়ির অংশ ভেঙে গেছে, পুরো দেয়ালে ফাটল ধরেছে। ছাদ থেকে জিনিসপত্র পড়ে যাচ্ছিল। অভিজ্ঞতাটা ছিল ভয়াবহ।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার রাতে বলেন, ‘ভেনেজুয়েলার মহান জনগণের ওপর আঘাত হানা এই দুটি বড় ভূমিকম্প ভয়াবহ প্রাণহানির কারণ হয়েছে।’
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত, ইচ্ছুক এবং সক্ষম। আমি সরকারের সব সংস্থাকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছি।’
কারাকাসের আলতামিরা এলাকায় ২২ তলা একটি ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে বলে প্রত্যক্ষ করেছেন এএফপির একজন সাংবাদিক। সেখানে স্বেচ্ছাসেবকেরা ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের খুঁজতে গিয়ে আত্মীয়স্বজনদের নাম ধরে ডাকছিলেন। একজন চিৎকার করে বলেন, ‘আমাদের টর্চলাইট দরকার।’
ইউএসজিএস জানায়, প্রথম ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল উপকূলীয় শহর মোরনের ২১ কিলোমিটার পশ্চিমে। এর মাত্র ৩৯ সেকেন্ড পর প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি কম্পন আঘাত হানে।
সংস্থাটি জানায়, এটি ছিল একটি ‘ডাবলেট’ ঘটনা, যেখানে বড় ভূমিকম্পের আগে শক্তিশালী পূর্বকম্পন অনুভূত হয়।
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো নাগরিকদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দুর্ঘটনা এড়াতে কয়েকটি ভবনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘কিছু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্যাসজনিত কোনো দুর্ঘটনা যেন না ঘটে, সেটাই আমরা নিশ্চিত করতে চাই।’
কারাকাসের কাছে অবস্থিত মাইকেতিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অবকাঠামোগত মারাত্মক ক্ষতির কারণে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দেখা গেছে।
‘আমরা বের হতে পারিনি’
দুটি ভূমিকম্পের গভীরতা ছিল যথাক্রমে ২২ কিলোমিটার ও ১০ কিলোমিটার।
রাজধানীর একটি শপিং মলে কম্পনের সময় মানুষ আতঙ্কে চিৎকার করতে থাকেন বলে জানান এএফপির সাংবাদিকরা।
৪২ বছর বয়সী দোকান মালিক হেইদি রোমেরো বলেন, ‘ঘটনাটা অবিশ্বাস্য ছিল। কতক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল, সেটাও বলতে পারব না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা জরুরি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসি। সেভাবেই আমাদের উদ্ধার করা হয়।’
রাজধানীর আরও বহু মানুষ অফিস ও বাসা থেকে বের হয়ে খোলা জায়গায় অবস্থান নিয়েছেন।
৬৯ বছর বয়সী প্রশাসনিক কর্মকর্তা কারমেন গুয়েদেজ জানান, তিনি শয্যাশায়ী বোনের সঙ্গে একই কক্ষে ছিলেন, যখন কম্পন শুরু হয়।
তিনি বলেন, ‘কম্পন ক্রমেই বাড়ছিল। জানালাগুলো কাঁপতে শুরু করে, তারপর পুরো ঘর দুলে ওঠে।’
গুয়েদেজ বলেন, ‘আমি, আমার বোন এবং এক প্রতিবেশী একসঙ্গে জড়ো হয়ে বসে ছিলাম। আমরা বের হতে পারিনি। এখনও অনেক প্রতিবেশী রাস্তায় অবস্থান করছেন।’
কাবেলোর মতে, ত্রুহিয়ো, কারাবোবো, মিরান্দা ও লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রতিবেশী দেশেও কম্পন
ভূমিকম্পের কম্পন প্রতিবেশী কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতাতেও অনুভূত হয়। সতর্কতা সংকেত বেজে ওঠার পর অনেক মানুষ ভবন ছেড়ে বাইরে চলে আসেন।
কলম্বিয়ার জাতীয় ভূকম্পন নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক ফ্রেডি তোভার জানান, দেশজুড়ে ২০০টির বেশি কম্পন অনুভূতির প্রতিবেদন পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, ‘এই ভূমিকম্পের বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় আরও আফটারশক হতে পারে, যা কলম্বিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলেও অনুভূত হতে পারে।’
তবে কলম্বিয়ার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা ইউএনজিআরডি এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সুনামি সতর্কতা কেন্দ্র উভয়ই জানিয়েছে, এ ঘটনায় সুনামির কোনো আশঙ্কা নেই।
ভূমিকম্পপ্রবণ ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ কম্পন হয়েছিল ১৯৯৭ সালে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, যাতে ৭৩ জন নিহত হন। আর ১৯৬৭ সালে কারাকাসে শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রাণ হারিয়েছিলেন ২৩৬ জন।
এদিকে, বুধবার ভেনেজুয়ার ভূমিকম্পের কিছুক্ষণ পরই উত্তর জাপানে ৭ দশমিক ২ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। তবে সেখানে কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

