শুরুটা ছিল হতাশার। ম্যাচের একেবারে শুরুতেই পাওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারেননি লিওনেল মেসি। এরপর অল্প সময়ের ব্যবধানে আরও দুটি সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেন তিনি। দেখে মনে হচ্ছিল, দিনটা বুঝি আর্জেন্টাইন অধিনায়কের নয়। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে গল্পটা শেষ পর্যন্ত তারই হয়ে থাকে। বিরতির আগে একবার, আর ম্যাচের শেষ মুহূর্তে আরেকবার বল জালে জড়িয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজের নাম আরও উঁচুতে নিয়ে গেলেন তিনি। মেসির জোড়া গোলে অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা।
বাংলাদেশ সময় সোমবার রাতে ডালাস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপের ‘জে’ গ্রুপের ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। টানা দ্বিতীয় জয়ে শেষ বত্রিশের টিকিট নিশ্চিত করার পাশাপাশি হেড-টু-হেডের হিসেবে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়াও নিশ্চিত করেছে লিওনেল স্কালোনির দল।
ম্যাচের তৃতীয় মিনিটেই গোলের সুবর্ণ সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা। লাউতারো মার্তিনেজকে বক্সের ভেতর ফাউল করলে ভিএআরের সহায়তায় পেনাল্টির বাঁশি দেন রেফারি। কিন্তু স্পটকিক থেকে লক্ষ্যভেদ করতে পারেননি মেসি। তার শট পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়। হতাশায় মুখ ঢেকে ফেলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। কিছুক্ষণ পর আরও দুটি সুযোগ পেয়েও গোল করতে ব্যর্থ হন তিনি। একবার অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগার দুর্দান্ত সেভ করেন, আরেকবার শেষ মুহূর্তে বাধা হয়ে দাঁড়ান ডেভিড আলাবা।
পেনাল্টি মিসের পর কিছু সময় ম্যাচে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পায় অস্ট্রিয়া। রালফ রাংনিকের দল শারীরিক শক্তি ও আগ্রাসী ফুটবলে আর্জেন্টিনাকে চাপে রাখার চেষ্টা করে। মাঝমাঠে একাধিক লড়াই, ধাক্কাধাক্কি ও উত্তেজনার মধ্যেই এগোতে থাকে ম্যাচ। তবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ধৈর্য। কখন আঘাত করতে হবে, সেটি তারা খুব ভালো করেই জানে।
অবশেষে ৩৮তম মিনিটে আসে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। বাঁ প্রান্ত দিয়ে ফাকুন্দো মেদিনার নিচু ক্রস বক্সে পৌঁছালে অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন থিয়াগো আলমাদা। বল স্পর্শ না করে ছেড়ে দেন তিনি। আর সেই ফাঁকা জায়গায় ঢুকে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে বল জালে পাঠান মেসি। সঙ্গে সঙ্গেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায় রচিত হয়।
এই গোলের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপে মেসির গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৭-তে। তাতে জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসের ১৬ গোলের রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে এককভাবে বসেন তিনি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে ক্লোসের রেকর্ড স্পর্শ করেছিলেন, আর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে সেটিকে পেছনে ফেলে দেন।
বিরতির পরও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্জেন্টিনার হাতেই। ডি পল, এঞ্জো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্তারের মাঝমাঠের দখল, রোমেরো-লিসান্দ্রো মার্তিনেজের দৃঢ় রক্ষণ এবং আলমাদার অবিরাম ছুটে চলা আর্জেন্টিনাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। যদিও দ্বিতীয়ার্ধে গোলের সুযোগ তুলনামূলক কম ছিল, তবুও আক্রমণে ধার বজায় রাখে স্কালোনির দল।
৬৬তম মিনিটে মেসির আরেকটি শট দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন শ্লাগার। অন্যদিকে মার্সেল সাবিৎসার ও গ্রেগোরিচকে সামনে রেখে আক্রমণে কিছুটা চাপ তৈরির চেষ্টা করে অস্ট্রিয়া। তবে আর্জেন্টিনার সংগঠিত রক্ষণ ভাঙার মতো সৃজনশীলতা দেখাতে পারেনি ইউরোপের দলটি।
ম্যাচের শেষ দিকে একটি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে আসে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর চোট। হাঁটুতে অস্বস্তি নিয়ে মাঠ ছাড়েন আর্জেন্টাইন এই ডিফেন্ডার। তার অবস্থা কতটা গুরুতর, তা নিয়ে এখন অপেক্ষা করতে হবে দলটির পরবর্তী ম্যাচ পর্যন্ত।
তবে যোগ করা সময়ে সব আলো আবারও গিয়ে পড়ে মেসির ওপর। ডান প্রান্তে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল ছিনিয়ে নিয়ে হুলিয়ান আলভারেজকে পাস দেন তিনি। আলভারেজের শট গোলরক্ষক ফিরিয়ে দিলেও রিবাউন্ড থেকে তৈরি হওয়া জটলার মধ্যে বল আবার চলে আসে আর্জেন্টাইন অধিনায়কের সামনে। প্রথম চেষ্টায় বাধা পেলেও দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় জালে বল পাঠিয়ে নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করেন তিনি।
সেই গোলের সঙ্গে বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৮-তে। ক্লোসেকে পেছনে ফেলে ব্যবধান আরও বাড়ান তিনি। পেলে, রোনালদো কিংবা অন্য সব কিংবদন্তিকে ছাড়িয়ে এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা শুধুই লিওনেল মেসি।
ম্যাচ শেষে ডালাসের গ্যালারিতে ভেসে ওঠে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের প্রিয় গান। আর মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মেসিকে ঘিরে তৈরি হয় আরেকটি স্মরণীয় দৃশ্য। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি যেন থামার নাম জানেন না। বিশ্বকাপের আরেকটি স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা, আর সেই পথের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো হয়ে জ্বলছেন তাদের অধিনায়ক।

