দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে আজ রোববার মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখান থেকেই তিনি চীন সফরে যাবেন।
এই সফরের লক্ষ্য হলো বৃহত্তর অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব তৈরি, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো।
গতকাল শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপক্ষীয় দলিল সই হতে পারে—যার মধ্যে রয়েছে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি কর্মপরিকল্পনা এবং একটি প্রোটোকল।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই চুক্তিগুলো শিক্ষা, কৃষি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, গণমাধ্যম, নবায়নযোগ্য জ্বালানি (গ্রিন এনার্জি), মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ এবং চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের মতো বিষয়গুলো নিয়ে হবে।
এ ছাড়া দেশ দুটি তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নিয়েও আলোচনা করবে এবং বাংলাদেশ চীনের ফ্ল্যাগশিপ উদ্যোগ গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে যোগ দিতে পারে।
পররাষ্ট্রসচিব সিয়াম জানান, ২১-২২ জুন মালয়েশিয়া সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একান্ত বৈঠক এবং এরপর দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করবেন।
মালয়েশিয়া সফরের প্রধান দিকগুলো হবে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা ও শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং দুটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল সই করা—যার একটি সাংস্কৃতিক সহযোগিতা এবং অন্যটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সংক্রান্ত।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা আসিয়ানের ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ হতে চাইবে এবং রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করবে।
আলোচনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃষি, শিক্ষা এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২২ জুন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে একটি মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন।
পররাষ্ট্রসচিব বলেন, আমরা বিশ্বাস করি এই সফর মালয়েশিয়ার সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সেদিন সন্ধ্যায় তারেক রহমান ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সভা সামার দাভোসে যোগ দিতে চীনের দালিয়ানে পৌঁছাবেন।
২৩ জুন তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং সম্মেলনের ফাঁকে কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার নেতাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন।
সেদিন তারেক রহমান ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’শীর্ষক অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে ভাষণ দেবেন।
সন্ধ্যায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং আয়োজিত স্বাগত নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী যোগ দেবেন। ২৪ জুন প্রধানমন্ত্রী সামার দাভোসের ১৩তম বার্ষিক সভার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন এবং এরপর ট্রেনে করে বেইজিং যাবেন।
২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী পৃথকভাবে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী এবং চায়না এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
ওই দিনই তিনি ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’-এ ভাষণ দেবেন এবং ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ চীনা প্রিমিয়ার লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। পরে তিনি রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেবেন।
২৬ জুন ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাউ লেজির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎ করবেন। এরপর তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন।
সিয়াম জানান, আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়গুলো স্থান পাবে। ওই দিনই ঢাকা ফেরার আগে প্রধানমন্ত্রী তিয়েনআনমেন স্কয়ারে বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।
মালয়েশিয়া ও চীন সফরে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি দলের সদস্য সংখ্যা হবে যথাক্রমে ২৭ এবং ২৮ জন।
প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের আগে গতকাল মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন, ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক এবং জাপানি রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
এসব সাক্ষাতের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, এগুলো ছিল রুটিন সাক্ষাৎ এবং এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে আমরা ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ যেকোনো দেশ সফর করব। কার সঙ্গে দেখা করব বা কোথায় যাব, তা নিয়ে অন্য দেশের সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজন নেই।
ক্রিস্টেনসেন বলেন, তিনি গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন।
কিছুটা হাস্যরসের ছলে তিনি বলেন, বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের জয় উদ্যাপন করতেই তিনি এসেছেন। তিনি বাংলাদেশিদের যুক্তরাষ্ট্র দলকে সমর্থনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখলে ঠকার সম্ভাবনা নেই।

