যুদ্ধের ধাক্কায় উধাও ১১৫ কোটি ব্যারেল তেল, হরমুজ খুললে সংকট কাটবে নাকি বাড়বে দাম?

‘আপনি যদি কোনো তেল ব্যবসায়ী হন এবং ইরান যু্দ্ধের সময় একটি তেলের চালান জোগাড় করতে আপনাকে ১০টি ফোন করতে হতো, এখন করতে হচ্ছে ৫ থেকে ৬টি। কয়েক সপ্তাহ পর পরিস্থিতি এমনও হতে পারে যে বিক্রেতারাই উল্টো আপনার কাছে এসে বলবে—“ভাই, আমার কাছে তেল আছে, কিনবেন নাকি?”’—অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক আর্থিক গবেষণা সংস্থা ম্যাককুয়ারি গ্রুপের জ্বালানি বিশ্লেষক বিকাশ দ্বিবেদীর এমন বক্তব্য আসলে কতটা বাস্তব হতে পারে কিংবা ঠিক তার উল্টোটাও ঘটতে পারে, আমরা সেটা এখনো জানি না।

তবে জ্বালানি বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর গত সাড়ে তিন মাস মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এই যুদ্ধকালীন সময়ে বাজার থেকে সব মিলিয়ে ১১৫ কোটি ব্যারেল তেলের সরবরাহ পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছে। আর এই ঘাটতি কাটাতে গিয়ে ইতোমধ্যে বৈশ্বিক মজুত প্রায় ১৯ কোটি ব্যারেল কমে গেছে।

তবে ইতিবাচক খবর হলো, বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হয়েছে। এর জেরে ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করেছে।

প্রশ্ন হলো—হরমুজ খুললেই কি বাজারে তেলের বন্যা বয়ে যাবে কিংবা বিশ্বের সব দেশের তেলের মজুত আবার আগের মতো পূর্ণ হয়ে যাবে? আর গত সাড়ে তিন মাসে বাজার থেকে উধাও হয়ে যাওয়া ১১৫ কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতির কী হবে?

আজ শুক্রবার সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি খুলে দিলেই রাতারাতি বিশ্বের এই বিপুল পরিমাণ তেলের ঘাটতি মিটবে না। হরমুজ খুলে দেওয়া মানে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ মাত্র।

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বিনিয়োগকারী ব্যাংক ‘আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের’ জ্বালানি বিশ্লেষক হেলিমা ক্রফট সিএনএনকে বলেন, ‘সবাই ধরে নিয়েছে সংকট শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে এখনো বড় ধরনের লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।’

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ খুলে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে বাজারে তেল পৌঁছে যাবে না। মাইন অপসারণ, ট্যাঙ্কার ফিরিয়ে আনা, উৎপাদন পুনরায় চালু করা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক করতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা। আর এই সময়টা বিশ্ববাজারকে বিদ্যমান মজুতের ওপরই নির্ভর করতে হবে।

এ কারণেই অনেক বাজার বিশ্লেষক মনে করছেন, তেলের দাম এখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কমে গেছে। তেলের ট্যাঙ্কারগুলো আবার নতুন তেলে ভরে ওঠার আগেই বাজার শূন্য হয়ে যাওয়ার যে ঝুঁকি রয়েছে, তা অনেক ব্যবসায়ী গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন না।

হেলিমা ক্রফট বলেন, ‘প্রণালি খোলার প্রাথমিক আনন্দ কাটলেই তেলের বাজারের মূল বাস্তবতা সামনে আসবে এবং তেলের দাম আবার বাড়তে বাধ্য হবে।’

এ বিষয়ে জ্বালানি খাতের আরেক গবেষণা সংস্থা কেপলারের ম্যাট স্মিথ সিএনএনকে বলেন, ‘আগামী সপ্তাহগুলোতে হরমুজ প্রণালিতে যা-ই ঘটুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষকে এবার গ্রীষ্মে বেশি দামেই তেল কিনতে হবে।’

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্ববাজার যদি ক্রেতাদের চাহিদার চেয়েও দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেল বেশি তেল উৎপাদন শুরু করে, তাও এই হারিয়ে যাওয়া ১১৫ কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতি পূরণ করতে প্রায় এক বছর সময় লেগে যাবে।

গত বুধবার ফ্রান্সে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, ‘আপনারা কি চরম বিপর্যয় দেখতে চান? আমাদের জরুরি তেলের মজুত আর মাত্র চার সপ্তাহের মতো আছে।’

ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেক বিশ্লেষক।

তাদের মতে, হরমুজ খুললেও খুব শিগগির তেলের মজুত পূর্ণ হচ্ছে না। তাই দাম সাময়িকভাবে কমলেও তা আবার লাফিয়ে বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্ববাজারে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি তেল মজুত ছিল। এই বাড়তি মজুতই মূলত যুদ্ধকালীন ধাক্কা থেকে পৃথিবীকে বাঁচিয়েছে। কিন্তু চার মাসে এই বাড়তি তেল শেষ হয়ে এখন বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত কয়েক মাসে বিশ্বের তেলের মজুত প্রায় ১৯ কোটি ব্যারেল কমে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার কুশিংয়ে অবস্থিত প্রধান তেল সরবরাহকারী হাবটির মজুত এখন ঝুঁকিপূর্ণ সীমার নিচে। বিষয়টি হলো—কফি যখন ফ্লাস্কের একদম নিচের দিকে নেমে যায়, তখন শেষ বিন্দুটি কাপে নেওয়ার জন্য ফ্লাস্কটিকে কাত করতে হয়। কুশিংয়ের তেল মজুতের অবস্থাও এখন অনেকটা তেমন।

বাজারে তেলের দাম বাড়ার পেছনে যেমন অনেক যুক্তি আছে, তেমনি দাম কমার পক্ষেও অনেক বিশ্লেষক যুক্তি দিয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক ব্যবসায়ী মনে করছেন সংকটে থাকা অনেক ওপেক দেশ উৎপাদন ও বিক্রি বাড়ানোর জন্য মুখিয়ে আছে। এ কারণে তেলের দামের নিম্নমুখী প্রবণতা ঠেকানো কঠিন হবে।

ম্যাককুয়ারি গ্রুপের জ্বালানি বিশ্লেষক বিকাশ দ্বিবেদী বলেন, ‘যুদ্ধ চলার সময় তেলের মজুতের বাড়তি অংশটাই ব্যবহার করেছি আমরা। এখন মজুত গত বছরের চেয়ে কমলেও, খুব বেশি নিচে নামিনি আমরা।’

উদাহরণস্বরূপ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল ও পেট্রোলের মজুত তুলে ধরে বলেন, ‘২০০৩ সালের পর এখন যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের মজুত সর্বনিম্ন হলেও তা গত ৫ বছরের গড়ের চেয়ে মাত্র ১২ দশমিক ৪ শতাংশ কম। আর পেট্রোলের মজুত গত বছরের এই সময়ের চেয়ে মাত্র ৫ শতাংশ কম।

দ্বিবেদীর মতে, তেলের ঘাটতির ঝুঁকি বাস্তব হলেও বাজারের কিছু অংশ এ সমস্যাকে অতিরঞ্জিত করে দেখছে।

Related Articles

Latest Posts