ময়মনসিংহ শহরের জুবিলী রোড এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত প্রায় দুই শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘গৌরীপুর লজ’ দীর্ঘদিন ধরে সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের গেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ঐতিহ্যবাহী এই ভবনটির যথাযথ সংরক্ষণ না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
দোতলা ভবনটি কাঠ ও ঢেউটিন দিয়ে নির্মিত। কাঠের দেয়াল, দরজা-জানালা, চীনা কারিগরদের নির্মাণশৈলীর ছাপ, পাথর বসানো মেঝে, মজবুত স্তম্ভ এবং বারান্দার নান্দনিক খিলান আজও ভবনটির স্থাপত্য ঐতিহ্য বহন করছে। অনন্য এই নির্মাণশৈলী এখনও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
ইতিহাসবিদদের তথ্য অনুযায়ী, গৌরীপুর জমিদার পরিবারের সদস্য ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ১৮২৮ সালে ভবনটি নির্মাণ করেন। তবে এখনও এটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়নি।
১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর ভবনটি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের শাখা হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত এখানে সোনালী ব্যাংকের শাখা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরে ব্যাংকের নতুন ভবন নির্মাণ হলে গৌরীপুর লজ প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে বলে ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে।
বর্তমানে ভবনটির নিচতলার চারটি কক্ষ গুদামঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কাঠের তৈরি দোতলার পাঁচটি কক্ষ ব্যবহৃত হচ্ছে ব্যাংক কর্মকর্তাদের গেস্ট হাউস হিসেবে। সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী রান্নার ব্যবস্থাও রয়েছে।
বিশিষ্ট সমাজকর্মী আলী ইউসুফ ঐতিহাসিক এই স্থাপনাকে গেস্ট হাউস ও রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহারের সমালোচনা করে একে ‘অপ্রয়োজনীয়, অনভিপ্রেত ও ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, ‘গৌরীপুর লজ এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও স্থাপত্য সৌন্দর্য ক্ষুণ্ন হচ্ছে। একইসঙ্গে ভবনটি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতেও রয়েছে।’
তার অভিযোগ, দেশ-বিদেশের দর্শনার্থী, গবেষক ও ইতিহাস-অনুরাগীরা অনেক সময়ই ভবনটিতে প্রবেশের সুযোগ পান না।
আলী ইউসুফ বলেন, ‘সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জন্য বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করে গৌরীপুর লজ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা উচিত। অতীত ঐতিহ্য ও স্থাপত্য ইতিহাসের অংশ হিসেবে ভবনটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।’
প্রত্নতত্ত্ব অনুরাগী সজল কোরাইশী বলেন, ‘ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের বিশিষ্ট একজন পৃষ্ঠপোষক। তার আমন্ত্রণে উপমহাদেশের বহু খ্যাতনামা শিল্পী গৌরীপুর লজে পরিবেশনা করেছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ওস্তাদ এনায়েত খান, ওস্তাদ মোহাম্মদ আলী খান, ওস্তাদ ওয়াজির খান, ওস্তাদ হাফিজ আলী খান ও ওস্তাদ মোহাম্মদ দবির খানসহ আরও অনেকে।’
পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটি, ময়মনসিংহ অঞ্চলের সদস্য সচিব ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন জানান, গৌরীপুর লজকে গেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহার বন্ধের দাবিতে গত ৯ জুন সোনালী ব্যাংকের ময়মনসিংহ অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের কাছে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ভবনটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে।’
এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘গৌরীপুর লজ সোনালী ব্যাংকের নিজস্ব সম্পত্তি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চেয়েও ভালোভাবে ব্যাংক এটি সংরক্ষণ করছে।’
ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন ভবনটি এখন কোন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভবনটি গেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রয়োজনে সেখানে রান্নাও করা হয়।’
তার দাবি, এতে ভবনটির কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই। বর্তমানে সেখানে কোনো আনসার সদস্যও বসবাস করেন না।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের (ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগ) ফিল্ড অফিসার সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘গৌরীপুর লজ এখনও অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত হয়নি। তবে এ বছর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলোর জরিপ প্রতিবেদনে এটি অন্তর্ভুক্ত করে অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।’
এ বিষয়ে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, ‘গৌরীপুর লজের স্বার্থে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’

