২৬-এর নির্ঘুম, জমজমাট গ্রীষ্ম

আপনি কি ভোর চারটায় ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচ দেখার জন্য সারা রাত জেগে থাকবেন? নাকি তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে শেষরাতের আগেই চোখ কচলাতে কচলাতে ঘুম থেকে উঠবেন?

এর চেয়েও বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে ঠিক দুই দিন পর। একজন ফুটবল ভক্তের জন্য রাত ১টায় ফ্রান্সের প্রথম ম্যাচ দেখার ইচ্ছা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই খেলা যখন শেষ হবে, ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ৩টা তো বাজবেই। তাহলে, কীভাবে কেউ সকাল ৭টায় টায় আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচটি ধরবেন? অনেকেই হয়ত ফুটবলের নেশায় পার করে দেবেন পুরোপুরি নির্ঘুম রাত।

এইটুকুতেই শেষ না। একই দিন দিবাগত রাতে খেলবে পর্তুগাল। পরের দিন কাজের অবস্থা কী হবে? মানুষের শরীর কি আদৌ এই টানা ধকল সহ্য করতে পারবে? উপমহাদেশের দর্শকদের জন্য, উত্তর আমেরিকার এই ফুটবল বিশ্বকাপ শরীরের ওপর দিয়ে এক মস্ত বড় পরীক্ষা নিয়ে আসছে।

এই বছর, সুন্দর এই খেলাটি চরম বিসর্জন দাবি করছে: নিখাদ ফুটবল প্রেমের জন্য শরীরের বারোটা বাজানো। উত্তর আমেরিকার সময়ের বিশাল পার্থক্যের কারণে খেলা শুরু হওয়ার আগেই টুর্নামেন্টটি বাংলাদেশি দর্শকদের জন্য যেন এক নিষ্ঠুর গোলকধাঁধা।

বাংলাদেশ সময় রাত ১১টার তুলনামূলক সহজ ম্যাচগুলো তো কেবল শুরুর টুকটাক আয়োজন। আসল পরীক্ষা লুকিয়ে আছে মধ্যরাত আর ভোরের দিকের সেই কঠিন সময়ে, যেখানে যারা সহজে ঘুমাতে পারেন না, তাদের জন্যও এই টানা গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কঠিন হবে। ফুটবল ভক্তরা অবশ্যই বড় বড় ক্লাব ম্যাচ দেখার জন্য গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে অভ্যস্ত, তবে বিশ্বকাপ এমন সব সময়ে ম্যাচ নিয়ে আসছে যা সবচেয়ে পাকা নিশাচর ভক্তদের জন্যও এক বিশাল মানসিক পরীক্ষা হবে।

সময়ের এই অদলবদল আমাদের চেনা ফুটবল সংস্কৃতির চিরাচরিত রূপ বদলে দেওয়ার ভয় দেখাচ্ছে। অতীতে বাংলাদেশে বিশ্বকাপ মানেই ছিল এক হইচই জড়ানো উৎসব—পাড়ায় পাড়ায় আড্ডা, চায়ের দোকানে অবিরাম তর্ক আর ঘরের বাইরে উন্মাদনার জোয়ার। কিন্তু গভীর রাতে পুরো মহল্লাকে জাগিয়ে না তুলে সমর্থকরা তো আর রাস্তার বড় পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে পারবেন না।

ফলে, এই বড় উৎসব তার চেনা রাস্তার আনন্দ হারিয়ে ঘরের কোণে ঢুকে যেতে পারে। মুখরিত পাড়ার উৎসবের জায়গাটি হয়তো দখল করে নেবে একাকী, শান্ত এক নিয়ম। ভক্তরা নিজেদের অন্ধকার শোবার ঘরে গুটিয়ে নেবেন, যা কেবল স্মার্টফোনের ঠান্ডা নীল আলো কিংবা টেলিভিশনের মৃদু আলোয় জ্বলবে, আর তারা মনের মধ্যে চেপে রাখবেন ফুটবলের মস্ত বড় হিসাব-নিকাশ।

তারপর সকালের সূর্য, যা মধ্যরাতের ক্লান্তি দূর করার বদলে চাকরিজীবীদের জন্য এক চরম দুঃস্বপ্ন নিয়ে আসবে: সকালের নাস্তার সময়ের ম্যাচ। যখন সাতসকালে আর্জেন্টিনার মতো জনপ্রিয় কোনো দল মাঠে নামবে, তখন অফিসে যাওয়ার ব্যস্ততা আর ম্যাচ দেখার পরিকল্পনার মধ্যে একটা বড় ধাক্কা লাগবে। পুরো মাস জুড়ে মতিঝিল ও গুলশানের অফিসগুলোতে কাজকর্মে নজিরবিহীন ধস নামলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। রেকর্ড পরিমাণ কফি আর কড়া লিকার চায়ের ওপর ভর করে, শহরের ব্যস্ততম অফিসগুলো এক সম্মিলিত ঘুমহীনতার মধ্য দিয়ে চলবে।

সংসারের ভেতরও এই ক্লান্তি সমানভাবে টের পাওয়ার কথা। দেশের গৃহিণীদের জন্য, এই টুর্নামেন্ট দৈনন্দিন কাজ আর রান্নাঘরের চেনা সময়সূচি ওলটপালট করে দেবে। সকালের ব্যস্ত সময়ে সাধারণত স্কুলের ব্যাগ গোছানো আর সকালের নাস্তা বানানোর এক চেনা ছন্দে কাটে, এখন সেটা অনেক বেশি তাড়াহুড়োর হয়ে উঠবে। সন্তানদের জন্য সকালের টিফিন তৈরি করা বাবা-মায়েরা হয়তো এমন কোনো খাবারের দিকে ঝুঁকবেন—যা দ্রুত সেরে নেওয়া যায়, তাতে যেন ভোর চারটায় ম্যাচের কারণে হারানো এক ঘণ্টার মূল্যবান ঘুম তারা পুষিয়ে নিতে পারেন।

পারিবারিক পরিবেশ অবশ্য চমৎকার উপায়ে এর সঙ্গে মানিয়ে নেয়। মধ্যরাতের ম্যাচ দেখার সুবিধার জন্য চেনা রাতের খাবারে এক বড় পরিবর্তন আসতে পারে। গৃহিণীরা রাতের খাবারকে আরও বেশি ভারী আর জমকালো করার সিদ্ধান্ত নেবেন, যা খাওয়ার টেবিলকে মস্ত বড় প্ল্যাটার আর স্ন্যাক্সের এক প্রাক-ম্যাচ উৎসবে পরিণত করবে, যেন সারা রাতের জাগরণেও পুরো পরিবারের শক্তি বজায় থাকে।

শিক্ষার্থীদের কথাও ভাবুন। ঈদুল আজহার ছুটির আমেজ কাটতে না কাটতেই বিশ্বকাপের অবিরাম ঢাকের আওয়াজ বাজতে শুরু করল। চলতি বছর নানাবিধ কারণে অনেক ছুটি থাকায় বাংলাদেশে এবার সম্ভবত কোনো নির্দিষ্ট গ্রীষ্মকালীন ছুটি নেই। বছরের মাঝখানের পড়াশোনার চাপ আর একের পর এক পরীক্ষা ঘনিয়ে আসায় ফুটবল ভক্তদের সবচেয়ে বড় আর প্রাণবন্ত অংশটি টুর্নামেন্টে কতটা ডুবে যেতে পারবে, তা নিয়ে এক বিশাল প্রশ্ন থেকে যায়। ক্লাসরুমের পড়া আর নিজের প্রিয় দলের বাঁচা-মরার লড়াইয়ের মাঝে পড়ে, তাদের চব্বিশ ঘণ্টা এক অসামান্য ভারসাম্য রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হবে।

তবুও, এই ক্লান্তির মাঝেও একটি অদ্ভুত সুন্দর দিক রয়েছে। নিউ ইয়র্ক বা লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো আয়োজক শহরের বাসিন্দারা যখন এই ম্যাচগুলো সন্ধ্যার এক অনায়াস আরাম হিসেবে উপভোগ করবেন, তখন বাংলাদেশি ভক্তদের জন্য খেলা দেখা হয়ে উঠবে এক কঠিন নিয়মের বিষয়। জুন ও জুলাইয়ের গরমের সকালগুলোতে ভারী চোখের পাতা আর চোখের নিচের কালো দাগ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এই দেশে এক গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

এই এত কষ্ট সহ্য করাই উপমহাদেশের আলাদা ফুটবল সংস্কৃতির আসল পরিচয়। ঢাকায় যখন ভোর হবে আর লাখ লাখ ঘুমহীন ভক্ত তাদের কর্মস্থল ও ক্লাসরুমের দিকে রওনা হবেন, তখন ফুটবল বিশ্বের কাছে একটি বড় বার্তা পৌঁছাবে: উত্তর আমেরিকার কাছে স্টেডিয়ামের চাবি থাকতে পারে, তবে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে সজাগ হৃদয়টি নিঃশর্ত ভালোবাসার জোরে দক্ষিণ এশিয়ার অন্ধকারেই জেগে থাকে।

 

Related Articles

Latest Posts