যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তির পথে এখন প্রধান বাধা ইরানের ইউরেনিয়ামের বিশাল ভাণ্ডার। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার অন্যতম কারণ ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা। তবে যুদ্ধ শুরুর পর ইতোমধ্যে তিন মাস পার হলেও ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
এমনকি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বেশ কিছু গোপন আস্তানায় হামলা চালিয়েও ধ্বংস করা যায়নি ইউরেনিয়ামের মজুত।
অন্যদিকে, মার্কিন বাহিনীর পক্ষে অভিযান চালিয়ে ওই ইউরেনিয়াম উদ্ধার করাও প্রায় অসম্ভব বা চরম ঝুঁকি রয়েছে। কারণ কোনোভাবে এই তেজস্ক্রিয় পদার্থ লিক হয়ে বাতাসে বা আর্দ্রতার সংস্পর্শে আসলে তা ভয়াবহ বিষাক্ত রূপ নিতে পারে।
এসব কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন এখন সামরিক অভিযানের চেয়ে কূটনৈতিক পথেই বেশি জোর দিচ্ছে। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে ইরানকে এই পারমাণবিক বোমা তৈরির উপাদান হস্তান্তর করতে রাজি করানোর চেষ্টা চালাচ্ছে তারা।
কিন্তু প্রশ্ন ওঠে এতো প্রচেষ্টার পরও কেন এখনো ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত খুঁজে পায়নি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল? কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে ইউরেনিয়ামের এই বিশাল ভাণ্ডার?
আজ বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস স্যাটেলাইটে তোলা ছবি ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণের বরাতে লুকিয়ে রাখা ইউরেনিয়ামের সম্ভাব্য স্থানগুলো নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মাটির গভীরে একাধিক গোপন আস্তানায় মজুত করে রাখা হয়েছে ইউরেনিয়ামের বিশাল ভাণ্ডার।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইউরেনিয়ামের একটি বড় অংশ মাটির এতো গভীরে লুকিয়ে রাখা হয়েছে যে, মার্কিন বাহিনী শক্তিশালী বাঙ্কার-বাস্টার বোমা দিয়েও তা ধ্বংস করতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এর গত ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৩৯ কেজি ইউরেনিয়াম মজুত ছিল। এই ইউরেনিয়াম স্কুবা ডাইভিংয়ের অক্সিজেন ট্যাঙ্কের আকারে সিলিন্ডারে রাখা হয়েছে। ফলে পুরো মজুতটি সহজেই বিভিন্ন জায়গায় ভাগ ভাগ করে লুকিয়ে রাখা সম্ভব।
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ইরানের এই পারমাণবিক উপাদান ঠিক কোথায় আছে তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা অসম্ভব। তবে সম্প্রতি স্যাটেলাইটে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, মূলত তিনটি পারমাণবিক কমপ্লেক্স ও তার আশপাশে লুকিয়ে রাখা হয়েছে ইউরেনিয়ামের মজুত।
আইএইএ-র প্রধান রাফায়েল গ্রসির মতে, ইরানের অধিকাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সম্ভবত ইসফাহান পারমাণবিক কমপ্লেক্সের কাছে মাটির নিচে জমা রাখা আছে। এই উপাদানগুলোকে পারমাণবিক বোমার উপযোগী করতে মাত্র কয়েক সপ্তাহ লাগবে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘জেআইএনএসএর’ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই কমপ্লেক্সটি একটি পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত, যা বাংকার-বাস্টার বোমার নাগালের বাইরে।
গত বছর ও এ বছর পর পর দুটি যুদ্ধের আগে ও পরে স্যাটেলাইটে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, এসব দৃশ্যমান প্রমাণ থেকে ধারণা করা হচ্ছে যে, ইসফাহানেই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় অংশ মজুত করে রেখেছে ইরান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইসফাহানের সুড়ঙ্গের প্রবেশ পথগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, পরবর্তীতে সেই ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা চালিয়েছিল ইরান।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তে সুরক্ষার অংশ হিসেবে আবারও প্রবেশ পথগুলো মাটি দিয়ে ঢেকে দেয় ইরান।
স্বাধীন গবেষণা সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির’ সিনিয়র গবেষক সারাহ বার্কহার্ড নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, স্যাটেলাইট ছবিতে এ বছর নতুন মাটির দেয়াল এবং সুড়ঙ্গের মুখে সামরিক সরঞ্জাম রাখার জন্য কিছু নতুন অবকাঠামো দেখা গেছে, যা মূলত স্থল অভিযান ঠেকাতে তৈরি করা হয়েছে।
গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধের আগে ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘লে মন্ডে’ প্রকাশিত স্যাটেলাইট ছবিতে এই কমপ্লেক্সের প্রবেশ পথের কাছে একটি কার্গো ট্রাক দেখা গিয়েছিল, যার ওপর পারমাণবিক উপাদান বহনের উপযোগী কনটেইনার রাখা ছিল।
তবে মার্কিন গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের’ (সিএসআইএস) পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ জোসেফ রজার্স বলেন, বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। কনটেইনারগুলো আসলেই ইউরেনিয়াম বহনের জন্য ছিল কি না তা নিশ্চিত নয়।
তার মতে, ওই কনটেইনারগুলো অন্য কোনো রাসায়নিক উপাদান বহনের জন্যও আনা হতে পারে, যা ইরান রক্ষা করতে চাইছে।
আইএইএ প্রধান গ্রসির মতে, অতি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি ছোট অংশ নাতাঞ্জে থাকতে পারে, যা ইরানের সবচেয়ে বড় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র।
২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলেরর হামলায় এই কেন্দ্রটিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর এ বছর যুদ্ধের সময় সেখানে আবারও হামলা চালানো হয়।
পরমাণু বিশেষজ্ঞ জোসেফ রজার্সের মতে, মাটির নিচে থাকা ইউরেনিয়ামকে পুরোপুরি কবর দিতেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
তবে এখানে ইউরেনিয়ামের মজুত এখন কী অবস্থা রয়েছে তা জানা যায়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নাতাঞ্জ কমপ্লেক্স থেকে মাত্র এক মাইল দূরে ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে আরেকটি ভূগর্ভস্থ সাইট রয়েছে। যা ২০২০ সালের পর থেকে তৈরি করে যাচ্ছে ইরান।
ছবিতে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জুনে যুদ্ধের পরও ইরান এর নির্মাণকাজ চালিয়ে গেছে। সম্প্রতি এর চারপাশে একটি নিরাপত্তা প্রাচীর এবং প্রবেশপথগুলোকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে হামলা ঠেকানো যায়।
২০২৫ সালের জুনে মার্কিন বাহিনীর ব্যাপক বাংকার-বাস্টার বোমার আঘাতে মাটির নিচে থাকা এই ফোরদো কেন্দ্রটি কার্যত ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
তবে অতি সম্প্রতি পাওয়া স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ইরান এই কেন্দ্রের প্রবেশ পথে যাওয়ার রাস্তাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। যা সম্ভাব্য স্থল হামলার গতি কমানোর জন্যই করা হয়েছে, বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসফাহান, নাতাঞ্জ ও ফোরদোর বাইরেও সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অজ্ঞাত কোনো স্থানে ইউরেনিয়াম লুকিয়ে রাখতে পারে ইরান। আর এ ক্ষেত্রে তেহরানের সহযোগিতা ছাড়া ওই মজুত কোনোভাবেই উদ্ধার বা ধ্বংস করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তারা।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের’ ভাইস প্রেসিডেন্ট স্কট রোকার নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ইরান যদি আশঙ্কা করে থাকে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তাদের ইউরেনিয়াম চুরি বা ধ্বংস করতে পারে। তবে স্বাভাবিকভাবেই তারা পুরো ভাণ্ডার এক জায়গায় না রেখে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখবে।
আইএইএ-র তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে সব মিলিয়ে ৯ হাজার ৪০ কেজির বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এর মধ্যে ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে ১৮৩ কেজি এবং ৫ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে আরও ৬ হাজার ২৩ কেজি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই বিশাল পরিমাণ ইউরেনিয়ামকে সরাসরি বোমার উপযোগী করতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে যেকোনো একটি পারমাণবিক কেন্দ্র সচল থাকলে, বোমা বানানোর সক্ষমতাও থেকে যাবে ইরানের।

