স্বাস্থ্য খাতে এডিপি বরাদ্দ দ্বিগুণ, বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা

আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন বাজেট প্রায় দ্বিগুণ করার সরকারি সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলোর বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগও রয়েছে।

নতুন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। মোট এডিপির ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ এ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরিবহন ও যোগাযোগ এবং শিক্ষা খাতের পর এটিই তৃতীয় সর্বোচ্চ খাতভিত্তিক বরাদ্দ।

তবে এই বরাদ্দ বৃদ্ধির পটভূমিতে রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের দুর্বল ব্যয় সক্ষমতা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বিভাগ দুটি তাদের মোট বরাদ্দের এক-দশমাংশেরও কম, প্রায় ৯৩৩ কোটি টাকা ব্যয় করতে পেরেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতা, জটিল ক্রয় ও অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং পুরোনো বাজেট ব্যবস্থাপনার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাদের ভাষ্য, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, কার্যকর অর্থ ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও জরুরি।

দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছেন স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীরা ও বিশেষজ্ঞরা। এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় জিডিপির ১ শতাংশের নিচে রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার সুপারিশ করেছিল। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও একই লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়।

এ মাসেই বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট উপস্থাপনের কথা রয়েছে। এর আগে গত ১৯ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন দেয়।

স্বাস্থ্য খাতের মোট ৩৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকার মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ পাবে ২৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ পাবে ৮ হাজার ২২১ কোটি টাকা। বাকি ৫০৩ কোটি টাকা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে ব্যয় হবে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পনাহীনভাবে কাজ করেছে এবং উন্নয়ন ব্যয়কে অগ্রাধিকার দেয়নি।

বাড়তি বরাদ্দ ব্যয় করতে পারবে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব… কাজের মাধ্যমেই তা প্রমাণ করব।

দুর্বল বাস্তবায়নের রেকর্ড

বিদায়ী অর্থবছরে এডিপির আওতায় স্বাস্থ্য খাতে মোট ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে দুই বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ১২ হাজার ৮৮৪ কোটির বেশি।

বাকি অর্থ ব্লক বরাদ্দ এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য রাখা হয়েছিল।

কিন্তু আগের বছরের মতো এবারও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগ উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে ছিল। ফলে সংশোধিত এডিপিতে তাদের মূল বরাদ্দের ৬৫ শতাংশের বেশি কমিয়ে দেওয়া হয়।

চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বিভাগ দুটি ব্যয় করতে পেরেছে মাত্র ৯৩৩ কোটি টাকা, যা সংশোধিত এডিপির প্রায় ২০ শতাংশ।

মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন ডিভিশনের (আইএমইডি) নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দুই ভাগে বিভক্ত করার পর থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর ছাড়া কোনো বছরই বিভাগ দুটি জাতীয় গড় বাস্তবায়ন হার স্পর্শ করতে পারেনি। এমনকি ২০২০-২১ অর্থবছরেও কেবল ‘স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ’ কোনোমতে জাতীয় গড় হারের (৮২ দশমিক ১১ শতাংশ) সামান্য ওপরে যেতে পেরেছিল, তবে অন্য বিভাগটি পারেনি।

কেন এই ব্যর্থতা?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক বলেন, দীর্ঘ ও জটিল ক্রয়প্রক্রিয়া বাজেট বাস্তবায়নে প্রধান বাধাগুলোর একটি।

তার ভাষ্য, যে ক্রয়প্রক্রিয়া শেষ হতে ১২ মাস লাগার কথা, অনেক সময় তা ১৮ মাস পর্যন্ত গড়ায়। এতে ব্যয় প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে পিছিয়ে যায়। দেশে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থা চালু হলেও অনেক কর্মকর্তার এখনো এটি কার্যকরভাবে ব্যবহারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই।

তিনি বলেন, অর্থ ছাড় ও অনুমোদনের জটিল প্রক্রিয়াও বড় সমস্যা। প্রথম দুই প্রান্তিকের অর্থ একসঙ্গে ছাড় করা হলেও পরবর্তী দুই প্রান্তিকের অর্থ পেতে ব্যয়ের হিসাব জমা দিয়ে নতুন করে অনুমোদন নিতে হয়, যা ব্যয়ের গতি কমিয়ে দেয়।

আর্ক ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কাজ করা রুমানা হক আরও বলেন, সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যা এবং পরিকল্পনাকারী ও বাজেট কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্বল সমন্বয়ও বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক প্রকল্প পরিচালক বদলি হওয়াও চলতি অর্থবছরে বাস্তবায়ন ব্যাহত হওয়ার একটি বড় কারণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, অনেক প্রকল্প পরিচালক ও কর্মকর্তার সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

করণীয় কী

স্বাস্থ্য খাতে বাড়তি বরাদ্দকে স্বাগত জানিয়ে অর্থনীতিবিদরা তহবিলের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে কয়েকটি পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন।

রুমানা হক বলেন, নতুন অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর দিকে সরকারকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

তার মতে, রোগীদের ব্যক্তিগত ব্যয়ের চাপ কমাতে ওষুধ, টিকা ও অন্যান্য জরুরি সেবায় সরকারি ব্যয় বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে।

অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্য বাজেটের পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হলে স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, প্রকল্প পরিচালকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে এবং যোগ্য ঠিকাদার নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি বিশেষ সেল গঠন এবং স্বাস্থ্য প্রশাসকদের সহায়তার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একটি সার্বক্ষণিক হেল্পডেস্ক চালু করা যেতে পারে।

 

Related Articles

Latest Posts